বাবার গড়া মসজিদ ভাঙায় ভাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ
মরহুম বাবার গড়া পাঞ্জাখানা মসজিদ ভেঙে ফেলায় ভাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে বিচার চেয়েছেন বোন। গত রোববার (৩০ জুলাই) জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে মসজিদটি পুনর্নির্মাণের বিষয়ে প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা পশ্চিম মাইজপাড়ার মরহুম বশির আহম্মদ চৌধুরীর মেয়ে লুৎফুন্নেছা কহিনুর। আবেদনের অনুলিপি ধর্ম ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়েছে। মৃত বাবার গড়া মসজিদটি রক্ষায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।
অভিযুক্তরা হলেন, বশির আহম্মদ চৌধুরীর ছেলে আনোয়ারুল হক চৌধুরী, বাগানবাড়ির কেয়ারটেকার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী বান্দরবানের লামার ফাঁশিয়াখালি ইউনিয়নের মৃত নূরুচ্ছবির ছেলে ৬ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। তাদের সঙ্গে আরও অজ্ঞাতপরিচয় ১০-১২ জন জড়িত বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে লুৎফুন্নেছা কহিনুর উল্লেখ করেন, তার বাবা বশির আহমদ চৌধুরী চকরিয়ার রিংভং মৌজার বিএস ৮৬ নম্বর খতিয়ানের ২১ একর ৩০ শতক জমির মালিক। সেই জমিতে চাষাবাদ নিয়ন্ত্রণ করতে বাগানবাড়ি ও বিভিন্ন খামার করা হয়। স্থানীয়ভাবে এটি মালুমঘাট চা-বাগান মৌলভিকাটা বাগানবাড়ি হিসেবে পরিচিত। বাগান, খামার ও চাষাবাদে থাকা কর্মচারী, স্থানীয় এলাকাবাসী ও অন্য জমির চাষিদের নামাজ আদায়ে বাগানবাড়িতে ১৯৭৫ সালে ‘আলী মদন পাঞ্জাখানা মসজিদ’ গড়া হয়। সেখানে আলী মদনের ছেলে হাফেজ আব্দু শুক্কুরের ইমামতিতে শ্রমিক ও স্থানীয়রা পাঁচ ওয়াক্ত এবং রমজানে খতম তারাবিহ জামাতে আদায় করতেন। পাঞ্জাখানা মসজিদটি প্রথমে কাঁচা ও টিনের বেড়া থাকলেও কয়েক যুগ আগে তা সেমিপাকা করা হয়। তার পাশেই নলকূপ ও ওজুখানা নির্মাণ করা হয়।

অভিযোগ থেকে আরও জানা যায়, বাবার মৃত্যুর পর লুৎফুন্নেছার পাঁচ ভাই এবং তারা ৯ বোন ওই জমির ওয়ারিশ হন। বোন তছলিমা বেগম চৌধুরী মারা গেলে তার স্বত্ব স্বামী-ছেলে-মেয়েরা পান। ওয়ারিশদের মাঝে আনোয়ারুল হক চৌধুরী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান থাকাকালে বাগানবাড়িটি মা ওমেদা খাতুন ও বাবা বশিরের নামে ট্রাস্ট গঠনের কথা বলে অন্য ওয়ারিশদের কাছ থেকে কৌশলে তাদের অংশ নিজ নামে লিখে নেন। ১৪ ওয়ারিশের মধ্যে ১২ জনের অংশ তিনি নিতে পারলেও মৃত তছলিমার ওয়ারিশরা এবং লুৎফুন্নেছা তার অংশ লিখে দেননি।
ওই জমিতে কিছুদিন ওমেদা-বশির নামে সাইনবোর্ড-ব্যানার থাকলেও চলতি বছরের শুরুতে ডা. আনোয়ারুল হক চৌধুরীর নামে সাইনবোর্ড ওঠে। এরইমধ্যে কোনো ওয়ারিশকে না জানিয়ে বাগানবাড়ি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেন তিনি। এলাকার কাশেম নামে এক ব্যক্তি (বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী) বাগানে বিদ্যমান মসজিদটি তুলে ফেললে জায়গাটি কিনতে রাজি হন। তার শর্তমতে সবার অগোচরে কেয়ারটেকার হেলাল মেম্বার লোক লাগিয়ে মসজিদ, অজুখানাসহ সবকিছু গুঁড়িয়ে মসজিদের কোনো চিহ্নই রাখেননি। তখন এলাকার লোকজনের কাছে প্রচার করা হয়, পুনর্নির্মাণের জন্য তা ভেঙে ফেলা হয়েছে। কিন্তু বাবা-মায়ের সওয়াবের উদ্দেশ্যে নিজর ভাগের জমিতে হলেও মসজিদটি রাখতে চান লুৎফুন্নেছা। তবে তার জমিও নিজের বাউন্ডারির ভেতরে রেখে দিয়েছেন ভাই আনোয়ার চৌধুরী, এমনই অভিযোগ লুৎফুন্নেছার।
গত রমজানেও এখানে খতমে তারাবি আদায় হয়েছে জানিয়ে হাফেজ আব্দু শুক্কুর বলেন, আমার বাবা বশির চৌধুরীর পরিবারে কাজ করা শ্রমিকদের সর্দার ছিলেন। তার নামেই আমার জন্মের আগেই এ পাঞ্জাখানা মসজিদ স্থাপন করা হয়। ধর্মপ্রাণ বশির চৌধুরী স্থানীয় ও কৃষি শ্রমিকদের নামাজের ব্যবস্থা করে গেছেন। কিন্তু আনোয়ারুল হক চৌধুরী মসজিদটি নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন।
ডুলাহাজারা মালুমঘাট চা বাগান ৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ ইসহাক বলেন, কয়েক যুগের পুরোনো পাঞ্জাখানা মসজিদটি ভেঙে ফেলার সময় জিজ্ঞাসা করলে কেয়ারটেকার হেলাল বলেছিল পুনর্নির্মাণ করা হবে। এখন জানছি পুরো বাগানই বিক্রি করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে বাগানবাড়ির কেয়ারটেকার হেলাল উদ্দিন বলেন, একই সীমানায় হলেও আমরা পার্বত্য এলাকা আর ডা. আনোয়ারুল হক চৌধুরীরা সমতলের বাসিন্দা। বাড়ির পাশে হওয়ায় বাগানবাড়িটি ২০ বছরের জন্য আমি লিজ নিয়েছিলাম। বছর দুয়েক আগে এ পাঞ্জাখানা মসজিদ তৈরি করেছি আমি। এখন বাগান বিক্রি করে দেওয়ায় আমার গড়া খামারসহ পাঞ্জাখানা মসজিদও ভেঙে নিয়ে এসেছি।
বাগানবাড়ির মালিক দাবিদার ডা. আনোয়ারুল হক চৌধুরী বলেন, বাবার বন্দোবস্ত জমি বাকি ওয়ারিশদের কাছ থেকে আমি কিনে নিয়েছি। যারা বিক্রি করেনি তাদের জমি অন্যস্থানে আছে। আমার বাবার আমলে নয়, ১৯৮৫ সালে বাগানবাড়ির কর্মচারী, কৃষিশ্রমিক ও পথচারীদের নামাজ আদায়ে পাঞ্জাখানা মসজিদটি করেছিলাম। এখন বাগানবাড়িটি বিক্রি করছি, তাই সব স্থাপনা তুলে নেওয়া হচ্ছে। আমার জমিতে আমি ইবাদতখানা রাখতে না চাইলে কার কি বলার থাকতে পারে?

মালুমঘাট চা বাগান মদিনাতুল উলুম মাদরাসার পরিচালক মুফতি আবদুল্লাহ বলেন, কোনো ঘরে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হলে তা আল্লাহর ঘর হিসেবে পরিগণিত। তা নিচিহ্ন করা ইসলাম সমর্থন করে না। তারা এলাকায় কিন্তু প্রচার করেছিল, পুনর্নির্মাণের জন্য পুরোনো পাঞ্জাখানা ভাঙা হচ্ছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান বলেন, এ বিষয়ে একটি অভিযোগ পেয়েছি। খোঁজ নিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সায়ীদ আলমগীর/এমআরআর/জেআইএম