দেশের অর্থনীতি মন্থর স্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে: পিআরআই

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৪৭ পিএম, ০৪ জানুয়ারি ২০২৬
এমএমআই প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা/ছবি: সংগৃহীত

বিনিয়োগে স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ধরনের মন্থর স্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)।

‘মান্থলি ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস (এমএমআই)’-এর নভেম্বর সংস্করণ প্রকাশ উপলক্ষে রোববার (৪ জানুয়ারি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সংস্থাটি এ তথ্য জানায়। তারা বলছে, সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেলেও প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারে নীতি-নিশ্চয়তা ও কাঠামোগত সংস্কার এখন অত্যন্ত জরুরি।

অস্ট্রেলিয়ার ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেডের (ডিএফএটি) সহযোগিতায় পিআরআইয়ের সেন্টার ফর ম্যাক্রোইকোনমিক অ্যানালাইসিস (সিএমইএ) এমএমআই প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক ও বেসরকারি খাতের শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রাবিনিময় হারে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির প্রবণতা ও মূল্যস্ফীতির গতি কিছুটা মন্থর হওয়ায় সামষ্টিক অর্থনীতিতে আংশিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। তবে বিনিয়োগ হ্রাস, বেকারত্ব বৃদ্ধি, প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির ফলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির হার নেমে এসেছে প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশে।

খাদ্যপণ্য, বিশেষ করে চালের উচ্চমূল্যের কারণে মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে তীব্র চাপ, রাজস্ব ঘাটতি ও ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান। তিনি বলেন, অনিশ্চিত ও অস্থিতিশীল নীতিপরিবেশে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হন। তার মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার নির্ভর করবে নীতি-নির্ধারণে অনুমানযোগ্যতার ওপর। তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতির পাশাপাশি সরবরাহ-পক্ষের সংস্কার ও কার্যকর বাণিজ্যনীতির ওপর জোর দেন এবং বলেন, অর্থবহ কর সংস্কার ছাড়া সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিতই থাকবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার। তিনি বলেন, নামমাত্র বিনিময় হার প্রায় ১২২ টাকা প্রতি ডলারে স্থিতিশীল থাকলেও প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হার (আরইইআর) গত চার মাসে ৬ থেকে ৭ শতাংশ বেড়েছে, যা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার জন্য উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংক নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাজারে হস্তক্ষেপ পুরোপুরি সে নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ড. সাত্তার আরও বলেন, স্বল্পমেয়াদে বিনিময় হারের মূল্যায়ন ও অবমূল্যায়ন উভয়ই হতে পারে এবং প্রতিটিরই বাণিজ্যিক প্রভাব রয়েছে। অবমূল্যায়ন রপ্তানি উৎসাহিত করলেও মূল্যায়ন আমদানি বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।

তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি সংকুচিত না হলেও প্রবৃদ্ধি কমে গেছে, যার মূল কারণ বিনিয়োগ হ্রাস। ঐতিহাসিকভাবে দেশের অন্তর্নিহিত প্রবৃদ্ধি সম্ভাবনা প্রায় ৬ শতাংশ হলেও বর্তমানে বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়ায় প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন লুটপাটের পরও সামষ্টিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছালেও অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ভারসাম্য এখন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। তবে মূল্যস্ফীতি এখনো প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান মূল উপস্থাপনায় বলেন, ২০২৬ সালে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে- এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। বরং অনিশ্চয়তাকে বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়ে নমনীয় ও দ্রুত অভিযোজনযোগ্য নীতিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, অনিশ্চিত বিশ্বে টিকে থাকতে নীতিনির্ধারকদের হতে হবে সতর্ক ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম।

প্যানেল আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ বলেন, ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি ও সহিংসতা অর্থনৈতিক টেকসইতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ছাড়া প্রবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তিনি এনবিআর পৃথকীকরণের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও রাজস্ব প্রশাসনের দুর্বলতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে স্ট্যাগফ্লেশনের (উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও ধীর প্রবৃদ্ধি) ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে প্রবৃদ্ধি কমছে এবং বেকারত্ব বাড়ছে। তার মতে, কঠোর মুদ্রা ও রাজস্ব নীতি, ব্যাংকিং খাতের সংকট এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ঋণপ্রবাহ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। তিনি দুর্বল ব্যাংককে সহায়তার পরিবর্তে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর মূলধন জোরদারের পরামর্শ দেন।

আইএইচও/একিউএফ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।