মুদ্রানীতি প্রবৃদ্ধি সহায়ক তবে বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়

মো. শফিকুল ইসলাম
মো. শফিকুল ইসলাম মো. শফিকুল ইসলাম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:১১ এএম, ৩০ জানুয়ারি ২০১৮

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সামান্য বাড়িয়ে কর্মসংস্থানমুখী প্রবৃদ্ধি সহায়ক সতর্কতামূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি অর্থ বছরের (২০১৭-১৮) দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন, ২০১৮) ঘোষিত এ মুদ্রানীতিকে প্রবৃদ্ধি সহায়ক বললেও তা বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

ঘোষিত মুদ্রানীতিতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক থাকলেও সঠিক ব্যবহার নিয়ে সংশয় রয়েছে বলে মনে করছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম। ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা না পেলে মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ হবে বলছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ।

সোমবার দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তারা এসব কথা বলেন। এর আগে সোমবার দুপুরে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন গভর্নর ফজলে কবির। নতুন মুদ্রানীতিতে জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ ধরা হয়েছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা প্রথমার্ধে ছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। এছাড়া মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ শতাংশ। আগে ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। আর মোট দেশজ উৎপাদনের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৪ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ও মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) লক্ষ্যমাত্রা যা ধরা হয়েছে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ। ঋণ বিতরণের যে টার্গেট নেয়া হয়েছে তা ঠিক আছে। তবে এটি কোথায় ব্যবহার হবে বা হচ্ছে এটা দেখার বিষয়। বেসরকারি খাতের ঋণ উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে।

ঋণ ও আমানতের অনুপাত বা এডিআর সম্পর্কে তিনি বলেন, বর্তমানে আগ্রাসী ঋণ বেড়ে গেছে। ব্যাংকগুলো নিয়মের বেশি ঋণ বিতরণ করছে অর্থাৎ আগ্রাসী ঋণ দিয়েছে। এটি চলতে থাকলে তারল্য সংকট সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, ব্যাংকের ঋণ বেড়েছে কিন্তু আমানত বাড়েনি। তাই এডিআর বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ ঠিক আছে।

মুদ্রানীতির বাস্তবায়ন সম্পর্কে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, মুদ্রানীতির দুটি দিক রয়েছে। একটি মুদ্রা সরবরাহ ঠিক রাখা অন্যটি সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করা। মুদ্রা সরবরাহ ঠিক রাখতে পারলেও সুদহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাই বাস্তবায়ন একটু চ্যালেঞ্জই হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৮ দশমিক ১ শতাংশ হলেও ঋণ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি যেন না বাড়ে সেজন্য ঋণ প্রবৃদ্ধি কমানো হয়েছে। তবে তা আগের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। এটি একটি টার্গেট। ব্যাংকগুলো যেন আগ্রাসী ঋণ বিতরণ থেকে বিরত থাকে সেজন্যই এ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিদেশি ঋণের বিষয়ে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এটি করা যাবে না। কারণ পদ্মা সেতু আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে হচ্ছে ফলে ইতোমধ্যে ডলারের ওপর চাপ বেড়েছে। বিদেশি ঋণ না আসলে ডলারের এ চাপ আরও বেড়ে যাবে।

সাবেক এ গভর্নর বলেন, এডিআর বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান ঠিক আছে। আগ্রাসী ঋণ বেশি বিতরণ হয়েছে। এতে খেলাপি বা মন্দ ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। তাই এটি সতর্ক বার্তা। এটি সময়োপযোগী মনে করছেন তিনি। তবে বাস্তবায়ন কিছুটা চ্যালেঞ্জ হবে। ব্যাংকাররা ও ব্যাংকের পরিচালকরা এটি কীভাবে নেয় এটিই এখন দেখার বিষয়। কারণ তারা সহযোগিতা না করলে মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।

ঘোষিত মুদ্রানীতিতে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ‘সরকারি অর্থায়নে ব্যাংক ঋণের ব্যবহার কমে যাওয়ায়’বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। নতুন মুদ্রানীতিতে সরকারি ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা আগের মতোই ১৫ দশমিক ৮ শতাংশে স্থির রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বর নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ যোগানের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১৬ দশমিক ২ শতাংশ। তবে এ সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ।

তিনি বলেন, ২০১৮ সাল নির্বাচনের বছর। এ বছর ঋণ প্রবাহ বাড়বে। তবে আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের বিষয়ে সতর্ক থাকবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এডিআর রেশিও বাড়ানো হচ্ছে কি না এ বিষয়ে গভর্নর ফজলে কবির বলেন, যেসব ব্যাংকের ঋণ আমানতের রেশিও এডিআর বেশি রয়েছে তাদের আগামী জুনের মধ্যে নির্ধারিত আইনি সীমার মধ্যে আনতে হবে। শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংক এডিআর সংক্রান্ত সার্কুলার জারি করবে। ব্যাংকগুলোকে আমানত সংগ্রহ ও ভালো ঋণ বিতরণের উপর জোর দিতে পরামর্শ দেন গভর্নর। মূল্যস্ফীতি বিষয়ে গভর্নর বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা ও রোহিঙ্গা আসায় খাদ্যের সংকট হয়েছে। এ কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়েছে। তবে খাদ্য ছাড়া অন্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি কম রয়েছে। আগামী বোরো মৌসুমে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে যাবে। আমরা আশা করছি, আমাদের মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বা এর কাছাকাছি থাকবে।

এসআই/ওআর/এমবিআর/জেআইএম