বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দেশের সার্বিক উন্নয়ন

মেসবাহুল হক
মেসবাহুল হক , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:২৬ এএম, ২৪ জুন ২০১৮

রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে উজাড় হচ্ছে ব্যাংক খাত। অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটে ডুবে থাকা এ খাত নিয়ে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের কপালে ভাঁজ ফেলাচ্ছে। গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতি যতটা এগিয়েছে, ঠিক ততটা পিছিয়েছে ব্যাংক খাত। এ কারণে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম ও উচ্চ আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার জন্য যে পরিমাণ বেসরকারি বিনিয়োগ দরকার, তা জোগান দেয়ার সামর্থ্য হারাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ খাতটি।

অর্থনীতিবিদ, ব্যাংক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, যেকোনো দেশের ব্যবসা-বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানসহ সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাংকগুলোর মূল ভূমিকায় থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর বর্তমান অবস্থা সেই ভার বহনে সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে। ফলে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমনটি জানিয়েছেন খোদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

এজন্য তিনি দায়ী করেছেন হাইকোর্টে বিভিন্ন ধরনের রিট মামলায় আটকে থাকা খেলাপি ঋণের ৬২ হাজার কোটি টাকাকে। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে ব্যাংক খাতে নিয়ে আসতে পারলে সার্বিক অর্থনীতির আরও উন্নয়ন সম্ভব। পাশাপাশি খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি রোধ, আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল ও শক্তিশালীকরণসহ বিনিয়োগ ও উৎপাদনবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হলে দেশের উন্নয়ন আরও বেশি ত্বরান্বিত হবে।’

এ কারণে অর্থমন্ত্রী অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক খাত সংক্রান্ত রিট মামলাসমূহের নিষ্পত্তি ত্বরান্বিতের জন্য হাইকোর্ট বিভাগে দুটি পৃথক বেঞ্চ গঠনের আবেদন জানিয়ে এর আগে দু’দফা আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বরাবর দুটি পত্র প্রেরণ করেন। ওই চিঠিতে কোনো কাজ না হওয়ায় সম্প্রতি এ বিষয়ে আরও একটি পত্র আইনমন্ত্রীর নিকট পাঠান অর্থমন্ত্রী। পত্রে আর্থিক খাত সংশ্লিষ্ট মামলাসমূহ নিষ্পত্তির জন্য দুটি না হলেও হাইকোর্টে অন্তত একটি পৃথক বেঞ্চ গঠনের বিষয়ে আইনমন্ত্রীর বক্তিগত উদ্যোগ কামনা করেন তিনি।

এদিকে বেপরোয়া ঋণ বিতরণে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় অর্থ সংকটে ভুগছে ব্যাংক খাত। ব্যাংকগুলো মূলধন সংকটে পড়ে সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও আগামী ১ জুলাই থেকে ৯ শতাংশের বেশি সুদ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স (বিএবি)। সংগঠনটির সভাপতি নজরুল ইসলাম মজুমদার গত ২০ জুন ঘোষণা দেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের ধারা চাঙা করতে জুলাইয়ের ১ তারিখ থেকে তিন মাস মেয়াদে আমানতের সর্বোচ্চ সুদহার হবে ৬ শতাংশ আর ঋণের সুদহার হবে ৯ শতাংশ। এর চেয়ে কোনো ব্যাংক সুদ বেশি নিতে পারবে না। যেসব ব্যাংক এ সিদ্ধান্ত মানবে না তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অন্যদিকে, ব্যাংকের সুদহার না কমালে কর্পোরেট ট্যাক্স সুবিধা বন্ধ করে দেয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বোর্ড চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া সম্প্রতি এক আলোচনা সভায় ঘোষণা দেন, কর্পোরেট ট্যাক্স নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। বলা হচ্ছে আমরা ব্যাংকারদের সুবিধা দিয়েছি। প্রকৃত অর্থে তারা সৌভাগ্যক্রমে সুবিধা পেয়েছে। তবে সবার ক্ষেত্রে কমানো হলে অনেক রেভিনিউ কম হতো। তাই কমানো সম্ভব হয়নি। আমরা তাদের কর্পোরেট করহার কমিয়েছি, যাতে তারা সুদের হার কমাতে পারে।

তিনি বলেন, ব্যাংকের কর্পোরেট ট্যাক্স কমানোর মূল উদ্দেশ্য ঋণের সুদহার কমানো। এতে বিনিয়োগ বাড়বে। যদিও সুদহার কামানোর শর্ত আরোপ করা হয়নি। আল্টিমেটলি এ শর্ত আরোপ করা হবে যে, ঋণের সুদ না কমালে কর্পোরেট ট্যাক্সের সুবিধা দেয়া হবে না।

ব্যাংকের ঋণের সুদহার বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে হাইকোর্টের বিভিন্ন ধরনের রিট মামলায় খেলাপি ঋণ ৬২ হাজার কোটি টাকা আটকে থাকার বিষয়কে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ ৬২ হাজার কোটি টাকার আমানতকারীদের সুদ দিতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। অন্যদিকে এসব ঋণের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকে ৬২ হাজার কোটি টাকা প্রভিশন হিসেবে রাখতে হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাকংগুলোর সার্বিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা।

ঋণে সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিঘ্নিত হচ্ছে শিল্প উৎপাদন। যার প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। বিশেষজ্ঞরা এ অবস্থাকে দেশের অর্থনীতির জন্য ‘অশনি সংকেত’ বলে মন্তব্য করেছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, দেশের ৫৭টি তফসিলি ব্যাংকের সবগুলোতে বর্তমানে দুই অংকের (ডাবল ডিজিট) সুদ গুণতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এর মধ্যে শিল্পঋণের বিপরীতে বেশ কয়েকটি ব্যাংক ১৫ শতাংশেরও বেশি সুদ নিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, মার্চ মাসে এ হার আরও বেড়েছে। সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় শিল্পসহ সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি মালিকানার আট ব্যাংকের মধ্যে জনতা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক থেকে দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদে দুই ধরনের ঋণে ব্যবসায়ীদের সুদ গুণতে হচ্ছে ১৩ শতাংশ হারে। একই হারে ব্যবসায়ীদের সুদ গুণতে হচ্ছে শিল্পের মেয়াদি, চলতি ও এসএমই ঋণের ক্ষেত্রেও। সোনালী ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সুদ নিচ্ছে ১১ শতাংশ হারে। অগ্রণী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) সুদ নিচ্ছে ১১ থেকে ১২ শতাংশ হারে।

তবে শিল্পঋণের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকের চেয়ে বেশি হারে সুদ আরোপ করেছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। কোনো কোনো ব্যাংক ২০ শতাংশেরও বেশি হারে সুদ আরোপ করেছে। যেসব ব্যবসায়ী ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন তাদের কেউ কেউ সুদ দিচ্ছেন ২২ শতাংশ পর্যন্ত। বেসরকারি অধিকাংশ ব্যাংক এসএমই বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে সুদ নিচ্ছে ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ হারে। দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদে দুই ধরনের ঋণেই বড় উদ্যোক্তাদেরও গুণতে হচ্ছে সর্বোচ্চ ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ হারে সুদ।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুদের হার কমানোর বিষয়ে বৈঠক করেন ব্যাংকমালিকদের সঙ্গে। বৈঠকে সুদের হার কমিয়ে ব্যাংকগুলোকে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা আপনাদের উত্থাপিত সব সমস্যার সমাধান করেছি, এখন আপনাদের অঙ্গীকার পূরণ করতে হবে। তিনি সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার তাগিদ দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুদের হার না কমালে দেশে বিনিয়োগ সম্ভব নয়। সুদহার অবশ্যই সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে হবে।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআই’র প্রেসিডেন্ট সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সুদের হার বাড়লে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। উৎপাদন খরচ বাড়লে মূল্যস্ফীতিও বেড়ে যাবে, দেশের বিনিয়োগও কমে যাবে। সুদের হার এক অংকে নামিয়ে আনা ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। তা এসেছিলও কিন্তু হঠাৎ আবার বাড়তে থাকায় বিপাকে পড়েন ব্যবসায়ীরা। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে দ্রুত সুদহার কমানো দরকার।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এ প্রসঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, ‘নানা অনিয়ম, দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। যাচাই-বাছাই ছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেয়া হচ্ছে। খেলাপিরা বিশেষ সুবিধায় ঋণ পুনর্গঠন করে নিচ্ছে। তাই নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করছে না। ফলে খেলাপি ঋণ বাড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘একদিকে ব্যাংকগুলো সঠিক নিয়মে যাচাই-বাছাই না করেই বেশি মুনাফার আশায় ঋণ দিচ্ছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা ঋণ নিয়ে ফেরত দিচ্ছেন না। ঋণের টাকা ফেরত না দিলে কোনো শাস্তি হচ্ছে না।’ এখন পর্যন্ত অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কারও দৃশ্যমান শাস্তি হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সাবেক এ গভর্নর আরও বলেন, ‘খেলাপি ঋণের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্ত হতে হবে। জবাবদিহিতায় আনতে হবে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপকদের। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে সময়োচিত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।’

এমইউএইচ/এমএআর/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :