ভালো থাকতে আয়ের কতটা সঞ্চয় করা উচিত?

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৩৪ এএম, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

সম্প্রতি ডাকঘরে সঞ্চয়ের ওপর সুদের হার কমিয়ে দিয়েছে সরকার। সরকারের সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্তের পর সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে কোনটি বেশি মুনাফা আনবে কিংবা কোন খাতে লাভ কমে যাবে না-এই বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে। ১৯ ফেব্রুয়ারি সরকার আবার জানায় ওই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার কথা।

বাংলাদেশে এখন কোন কোন মাধ্যমে সঞ্চয় করতে পারেন একজন নাগরিক? আর উপার্জন আছে এমন একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের আয়ের ঠিক কত শতাংশ সঞ্চয় করা উচিত-হয়তো বিষয়টি অনেকেরই জানা নেই। বিবিসি বাংলার অনলাইন সংস্করণে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

এতে বলা হয়, সাধারণত একজন মানুষের আয়ের কত শতাংশ সঞ্চয় করা উচিত তা নির্ভর করে তার আয় এবং অবশ্যম্ভাবী ব্যয়ের ওপর। তবে সাধারণ অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে, একজন মানুষের আয়ের এক চতুর্থাংশ অর্থাৎ ২০-২৫ শতাংশ অর্থ যদি কেউ নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস করতে পারেন, তাহলে অবসর পরবর্তী জীবনে অভাবের মধ্যে পড়তে হবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেছেন, ‘সমাজের প্রচলিত প্যাটার্ন হচ্ছে মধ্য আয়ের মানুষেরা বেশি সঞ্চয় করেন। এবং সম্পূর্ণ বিপরীত কারণে নিম্ন ও উচ্চ আয়ের মানুষের সঞ্চয় তুলনামূলক কম হয়। উচ্চ আয়ের মানুষের খরচ ও বিনিয়োগের হার বেশি বলে সঞ্চয় কম, আর নিম্ন আয়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনধারণই একটা চ্যালেঞ্জ।’

তিনি বলেছেন, ব্যক্তির সঞ্চয়ের হার নির্ভর করে মানুষের আয়-ব্যয়ের ওঠানামার ওপর। ফলে বিশেষ কোনো খাতের প্রদেয় সুযোগ-সুবিধার ওপর হুট করে মানুষ সিদ্ধান্ত কম নেয়।

যেসব মাধ্যমে সঞ্চয় করা যায় বাংলাদেশে

যেসব মাধ্যমে বাংলাদেশে একজন নাগরিক সঞ্চয় করতে পারেন তার মধ্যে ব্যাংক, সরকারি বন্ড, পুঁজি বাজার, মিউচুয়াল ফান্ড, স্বর্ণ, জমি এবং অ্যাপার্টমেন্ট বহুল প্রচলিত।

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, এখনও যেসব সঞ্চয় মাধ্যমে সরকার নিজে কাজ করছে, সেসব খাতে মানুষের আস্থা সবচেয়ে বেশি। এজন্য ব্যাংকের পাশাপাশি মানুষ সঞ্চয়পত্র এবং জমি কেনে ভবিষ্যতের নির্ভরতা হিসেবে।

ব্যাংক

বাংলাদেশে সঞ্চয়ের জন্য সবচেয়ে প্রচলিত হচ্ছে ব্যাংক ব্যবস্থা। এর পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ব্যাংকের নেটওয়ার্ক রয়েছে এবং গত এক দশকে বাংলাদেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।

ব্যাংকে কয়েক রকম সঞ্চয় স্কিম আছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ডিপোজিট পেনশন স্কিম বা ডিপিএস, ফিক্সড ডিপোজিট বা এফডিআরের মাধ্যমে টাকা জমা রাখতে পারেন। এর বাইরে সঞ্চয়ী হিসাবে টাকা রাখলেও পেতে পারেন একটি নির্দিষ্ট মুনাফা। কোনো কোনো ব্যাংকে পাঁচ বা ছয় বছরের ব্যবধানে আমানত দ্বিগুণ হওয়ার অর্থাৎ ডাবল রিটার্ন স্কিম চালু আছে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশে গত ৪৮ বছরে কোনো ব্যাংক দেউলিয়া ঘোষণা হয়নি। এটা ব্যাংকের ওপর মানুষের ভরসার বড় কারণ। যদিও বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি ব্যাংক আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে পড়েছে, তবে যখনি কিছু ব্যাংকের অবস্থা খারাপ হয়েছে সরকার অর্থ সহায়তা দিয়ে সেগুলোকে ‘বেইল আউট’ করার চেষ্টা করেছে।

তিনি জানিয়েছেন, এই মূহুর্তে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ডিপিএসে গড়ে আট থেকে নয় শতাংশ সুদ দিয়ে থাকে।

এফডিআর এবং ডাবল রিটার্ন স্কিমের ওপর গড়ে ব্যাংকভেদে ছয় থেকে সাড়ে ছয় শতাংশ সুদ প্রদান করা হয়। দু-একটি ব্যাংক একটু বেশি দিলেও এটাই গড় হিসাব।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো গ্রাহককে প্রদেয় সুদের হার কমিয়ে দিয়েছে। যদিও একে ঝুঁকি মনে করেন না বিশ্লেষকেরা। কিন্তু সুদের হার কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতি এবং অন্যান্য কর পরিশোধের পর সঞ্চয়ের ওপর কতটা লাভ থাকে সে প্রশ্ন রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ-একজন ব্যক্তি ১০০ টাকা এফডিআর করেছেন, মেয়াদপূর্তির পর তার ১০৬ টাকা পাওয়ার কথা। বলা হচ্ছে, পাঁচ বছর পর যে মুনাফাসহ যে অর্থ তিনি পাবেন, মূল্যস্ফীতির কারণে সে অর্থের মূল্য প্রত্যাশিত অবস্থায় না-ও থাকতে পারে।

সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য সরকারি বন্ড

বাংলাদেশে আরেকটি জনপ্রিয় সঞ্চয় মাধ্যম হচ্ছে সঞ্চয়পত্র, প্রাইজবন্ড ও অন্যান্য সরকারি বন্ড। জাতীয় সঞ্চয় ব্যুরো, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ তফসিলি ব্যাংকসমূহ এবং ডাকঘর থেকে সঞ্চয়পত্রসহ অন্যান্য বন্ড কেনা এবং মেয়াদ শেষে ভাঙানো যায়।

চার ধরনের সঞ্চয়পত্র পাওয়া যায় বাজারে-পরিবার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। মেয়াদান্তে সঞ্চয়পত্রের ওপর এখন ১১ শতাংশ থেকে ১১.৭৬ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা পাওয়া যায়। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ব্যাংকে সঞ্চয়ের ওপর সুদের হার কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুকেছে।

পুঁজিবাজার

পৃথিবীর অনেক দেশে মানুষ পুঁজিবাজারে সঞ্চয় করেন। বাংলাদেশেও পুঁজিবাজারে অর্থলগ্নি করেন অনেক মানুষ, কিন্তু তার মধ্যে সঞ্চয় হিসেবে পুঁজিবাজারে অর্থ রাখতে যাবার মানুষের সংখ্যা কম।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে অর্থ লেনদেনের যে ধরন ও ব্যবস্থাপনা তাতে এর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কিছুটা কম। যে কারণে হয়তো সঞ্চয় হিসেবে অর্থ গচ্ছিত রাখতে চান না সেখানে অনেকে।’

এ প্রসঙ্গে গত দুই দশকে বড় বড় দুইটি শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেকে সর্বস্বান্ত হয়েছেন সেসময়, সেটা নেতিবাচক উদাহরণ তৈরি করেছে।’

স্বর্ণ

পৃথিবীর অনেক দেশেই মানুষ স্বর্ণে বিনিয়োগ করেন। বাংলাদেশেও অনেকে স্বর্ণের মুদ্রা বা তাল কিনে রাখেন। তবে এটি খুব প্রচলিত নয় সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে।

এক্ষেত্রে সাধারণ ধারণা হচ্ছে, স্বর্ণের দাম আন্তর্জাতিক বাজার অনুযায়ী নির্ধারণ হয় এবং গত কয়েক বছর ধরে স্বর্ণের দাম বাড়তির দিকে। কিন্তু এক্ষেত্রে ঝুঁকিটা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দর পতন ঘটলে সঞ্চিত স্বর্ণের দাম কমে যাবে।

মিউচুয়াল ফান্ড

বাংলাদেশে মিউচুয়াল ফান্ড খুব অল্প প্রচলিত একটি সঞ্চয় মাধ্যম। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ফান্ড ম্যানেজারের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হয়। অর্থাৎ ফান্ড ম্যানেজার অন্য কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা করে এবং প্রাপ্ত মুনাফা ইউনিট হোল্ডারদের সঙ্গে ভাগাভাগি করবে। মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করলে একজন গ্রাহক বছরে ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত কর রেয়াত পেতে পারেন। বাংলাদেশ এই মূহুর্তে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ড রয়েছে প্রায় ৪০টি।

জমি ও ফ্ল্যাট

জমি সবসময়ই সঞ্চয় ও বিনিয়োগের জনপ্রিয় একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জমির সংকট রয়েছে বাংলাদেশে। যে কারণে জমির দাম ক্রমে বেড়েই চলেছে। তবে অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, দেশে গত কয়েক বছর ধরে জমির দাম সে অর্থে বাড়েনি। মাথা গোঁজার ঠাই হিসেবে নয়, সঞ্চয় হিসেবেও অনেকে অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট কেনেন।

বাড়িতে সঞ্চয়

আপনি যদি কোথাও অর্থ রাখতে ভরসা না পান, তাহলে বাড়িতে রাখতে পারেন। কিন্তু ঝুঁকি হচ্ছে ফি বছর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সঙ্গে আপনার টাকার মূল্য ক্রমে কমতে থাকবে। কোনো কোনো টাকার নোট বা মুদ্রা বাতিলও হয়ে যেতে পারে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে।

এসআর/পিআর