শঙ্কায় চাষাবাদ

বয়সের ভারে ন্যুব্জ গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ, বন্ধ পানি সরবরাহ

মফিজুল সাদিক
মফিজুল সাদিক মফিজুল সাদিক , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:৫৬ পিএম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

বর্তমানে বয়সের ভারে বেহাল অবস্থা দেখা দিয়েছে গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পে। ফলে প্রকল্পের প্রধান পাম্পগুলোর অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল এরই মধ্যে অতিবাহিত হয়েছে। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে পাম্পগুলো মেরামত না করায় প্রকল্পের প্রধান তিনটি পাম্পের মধ্যে দুটির অচল অবস্থা এবং একটি নিয়মিত মেরামতের মাধ্যমে সচল রাখা হয়েছে। অপরদিকে, সাবসিডিয়ারি পাম্পগুলো ২০০৪-০৫ সালে নষ্ট হয়েছে, যা মেরামতযোগ্য নয় এমনকি পুনঃস্থাপন করা হয়নি বিধায় শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সেচের পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

প্রকল্পের আওতায় কুষ্টিয়া খাল, গঙ্গা খাল ও আলমডাঙ্গা খালের মোট দৈর্ঘ্য ১৯৩ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন ধরে মেরামত না করায় প্রধান খাল প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পলিদ্বারা ভরাট ও খালগুলোর ডাইক সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী সেচ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) এ কে এম ফজলুল হক, যুগ্মপ্রধান এনামূল হক এবং উপপ্রধান (সেচ) রত্না শারমিন ঝরা ‘গলা কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প’ শীর্ষক প্রকল্প পরিদর্শন করেন। এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বরাবর প্রতিবেদনের কপি ও সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।

আরও পড়ুন>> গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের পাম্প বিকল, ভোগান্তিতে ৪ জেলার কৃষক

পরিকল্পনা কমিশন জানায়, পিডিসি’র (প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ডিজাইন কনসালটেন্ট) মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী ১২টি সাবসিডিয়ারি পাম্পের জায়গায় ১০টি স্থাপন এবং তিনটি প্রধান পাম্প পুনঃস্থাপন করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলো পুনঃস্থাপন কাজ করা প্রয়োজন। এছাড়া প্রধান খাল, সেকেন্ডারি খাল এবং টারশিয়ারি খালের মোট দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৩১৩ দশমিক ৫১ কিলোমিটার সেচ খাল পুনর্খনন করা প্রয়োজন। জিকে সেচ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত অবকাঠামোগুলো মেরামত-পুনর্বাসন কাজ বাস্তবায়ন করা একান্ত প্রয়োজন। অন্যথায় প্রকল্পটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে না এবং প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য মুখ থুবড়ে পড়বে। প্রকল্পের কার্যকারিতা এবং সেচ সুবিধা দেওয়ার ফলে সেচ এলাকা বাড়বে। ফলস্বরূপ শস্য উৎপাদন, বনায়ন, মৎস্য চাষ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন সম্ভব হবে। সর্বোপরি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। প্রকল্প এলাকায় জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করে টেকসই সেচ ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য প্রকল্পটি নতুনভাবে পরিকল্পনা ও রিডিজাইন প্রয়োজন।

পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) এ কে এম ফজলুল হক জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের কৃষিপ্রধান দেশের প্রেক্ষাপটে গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে প্রকল্পের কার্যকারিতা তেমন নেই। অধিকাংশ খাল ভরাট হয়ে গেছে। এছাড়া পাম্পও নষ্ট। যে উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি নেওয়া তা পূরণ হচ্ছে না। সুতরাং প্রকল্পের আওতায় নতুন পাম্প ও খাল খনন জরুরি। সেই জন্য সংশ্লিষ্টদের সুপারিশ করেছি প্রকল্প নেওয়ার জন্য।’

আরও পড়ুন>> চালকলের দূষিত বর্জ্যে হুমকিতে পরিবেশ

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্যমতে, প্রকল্পের আওতায় দুটি পাম্প হাউজ স্থাপন করা হয়। যার একটি ‘প্রধান পাম্প হাউজ’, যাতে ১০০১ কিউসেক ক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি পাম্প রয়েছে এবং অপরটি ‘সাবসিডিয়ারি পাম্প হাউজ’ যাতে ১২৫ কিউসেক ক্ষমতাসম্পন্ন ১২টি পাম্প রয়েছে। সেচ মৌসুমে প্রধান পাম্প হাউজের দুটি পাম্প দিয়ে ভেড়ামারায় গঙ্গা নদীতে সংযুক্ত ইনটেক চ্যানেল হতে সেচের জন্য পানি উত্তোলন করা হয় এবং একটি প্রধান পাম্প স্ট্যান্ডবাই থাকে। প্রকল্পের আওতায় প্রধান খালের দৈর্ঘ্য ১৯৩, সেকেন্ডারি খালের দৈর্ঘ্য ৪৬৭ ও টারশিয়ারি খালের দৈর্ঘ্য ৯৯৫ কিলোমিটার। শুষ্ক মৌসুমে যখন গঙ্গার পানি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৪ মিটার নিচে চলে যায় তখন প্রধান পাম্প কাজ না করায় সাবসিডিয়ারি পাম্প ব্যবহার করা হয়।

‘আমাদের কৃষিপ্রধান দেশের প্রেক্ষাপটে জিকে সেচ প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে প্রকল্পের কার্যকারিতা তেমন নেই। অধিকাংশ খাল ভরাট হয়ে গেছে। পাম্পও নষ্ট। যে উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি নেওয়া তা পূরণ হচ্ছে না।-সচিব এ কে এম ফজলুল হক

প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের কমান্ড এরিয়া ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ হেক্টর। যার মধ্যে সেচযোগ্য জমির পরিমাণ ১ লাখ ১৬ হাজার হেক্টর। তবে, প্রকল্পের শুরুতে বর্ষা মৌসুমে (খরিপ-২) প্রকল্প এলাকায় ৯৫ হাজার ৬১৬ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া সম্ভব হতো। শুধু খরিফ-২ মৌসুমে আমন ধানের সম্পূরক সেচ দেওয়ার লক্ষ্যে প্রকল্পটি পরিকল্পনা ও ডিজাইন করা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে ৩ লাখ ১১ হাজার লাখ মেট্রিক টন ধান ও ২ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদন করা হতো। পরে তিনটি মৌসুমের (রবি, খরিফ-১, খরিফ-২) জন্য সেচ দেওয়ার সিদ্ধান্তে ৫ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন ধান এবং ৩ লাখ ৬৪ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হচ্ছে, যা আগের তুলনায় ২ লাখ ১৯ হাজার মেট্রিক টন বেড়েছে। তবে, রবি ও খরিপ-১ মৌসুমে গঙ্গা নদীর পানির স্বল্পতার কারণে কখনো লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।

আরও পড়ুন>> কাজেই আসছে না ১১ কোটি টাকার পানি শোধনাগার

সেকেন্ডারি খাল: ৪৯টি সেকেন্ডারি খালের মোট দৈর্ঘ্য ৪৬৭ কিলোমিটার। যার মধ্যে ২৯টি খালের ডাইক আংশিক নষ্ট হওয়ায় সেচ সরবরাহ সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। অবশিষ্ট খালগুলোর ডাইক সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়ায় সেচ সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

টারশিয়ারি খাল: ৪৪৪টি টারশিয়ারি খালের মোট দৈর্ঘ্য ৯৯৫ কিলোমিটার। যার মধ্যে ২০৮টি সেচ খাল পলিদ্বারা ভরাট, বাকিগুলো দীর্ঘদিন পানি না যাওয়ায় জঙ্গল/আগাছা জন্মেছে এবং ডাইক নষ্ট হয়ে সেচ খাল জমির সমতল হয়ে পড়েছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সেচ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো ও অন্যান্য স্থাপনা: প্রকল্পের আওতায় সেচ খালগুলোর পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য পানি-নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো দীর্ঘদিন মেরামত ও পুনর্নির্মাণ না করায় অবকাঠামোগুলোর অধিকাংশ বিকল হয়ে গেছে। এছাড়া সেচের পানি নিয়ন্ত্রণ দুরূহ হয়ে পড়েছে। এছাড়া সেচ নিষ্কাশন খালগুলোর পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। বর্ষাকালে অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং ফসলসহ সম্পদহানি হয়। প্রকল্পের আওতায় পরিদর্শন সড়কগুলো মেরামতের অভাবে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এছাড়া জিকে সেচ প্রকল্পের আওতায় ১৯৬০ এর দশকে নির্মিত অফিস ভবন ও অন্য অবকাঠামোগুলো দীর্ঘদিন ধরে পুনর্নির্মাণ-পুনর্বাসন না করায় জরাজীর্ণ হয়ে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন>> নিষ্কাশনের পথ বন্ধ রেখে মাছ চাষ, পানির নিচে ২০০ একর জমি

সেচ চার্জ: বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে প্রতি মৌসুমে ১ একরে ২০০ টাকা হারে সেচ চার্জ নির্ধারিত থাকলেও কৃষকরা নিয়মিত পরিশোধ করেন না। তবে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে নির্ধারিত সেচ চার্জ অপ্রতুল। তবে, কৃষকরা জানান, নিয়মিত পানি সরবরাহ করা হলে চার্জও সময়মতো পরিশোধ করা হবে।

বর্তমান সেচযোগ্য এলাকা: জিকে সেচ প্রকল্পের বর্তমান সেচযোগ্য এলাকা ৯৫ হাজার ৬১৬ হেক্টর। তবে প্রকল্পের পাম্পগুলোর, সেচ খাল ও অবকাঠামোগুলো পরিপূর্ণভাবে কার্যকর না থাকায় ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫১ হাজার ৫৫৫ হেক্টর, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪০ হাজার ৭৭০ হেক্টর ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে মাত্র ৩৯ হাজার ৮২৯ হেক্টরে দাঁড়ায়। প্রকল্পের আওতায় গঙ্গা নদী থেকে পানি উত্তোলন এবং প্রকল্প এলাকায় সেচ সুবিধা দেওয়ায় গঙ্গা অববাহিকা এবং এতদঞ্চলে জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন হয়েছে।

প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য: কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলায় প্রকল্পটি চলমান। প্রধান পাম্পের পুনর্বাসন এবং নতুন সহায়ক পাম্প নির্মাণের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন সেচের ব্যবস্থা করা, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকা বাড়ানো, জলসম্পদ সুবিধা উন্নত করে খামারের আয় এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ উন্নত করা, বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমানো, খালের ডাইকগুলোতে রাস্তার মাধ্যমে এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি, মৎস্যসম্পদের উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং অন্য অর্থনৈতিক কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা। কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও প্রকল্প এলাকায় দারিদ্র্যের মাত্রা কমানো অন্যতম কাজ।

আরও পড়ুন>> কিশোরগঞ্জে পানির নিচে ১৮৮৬ হেক্টর ধান ও সবজির জমি

এমওএস/এমএএইচ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।