বইমেলা: সময় বাড়লেও শেষ দিকে বিক্রি আশানুরূপ নয়

রাসেল মাহমুদ
রাসেল মাহমুদ রাসেল মাহমুদ , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:০৪ পিএম, ১৪ মার্চ ২০২২

করোনা মহামারির কারণে দুই সপ্তাহ পিছিয়ে এ বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া বইমেলা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু প্রকাশক, লেখক ও ক্রেতা-দর্শনার্থীদের চাওয়া মতো মেলার সময় বাড়িয়ে ১৭ মার্চ পর্যন্ত করা হয়। সে হিসাবে মেলার বাকি আর মাত্র তিনদিন। আগের সব বইমেলা পর্যালোচনা করলে জানা যায়, বইমেলার প্রথম দিকে পাঠকরা মেলায় আসেন ঘুরে বিভিন্ন বই দেখে পছন্দের কয়েকটি কিনতে ও ক্যাটালগ সংগ্রহ করতে। ক্যাটালগে থাকা পছন্দের বই মেলার শেষ সময়ে এসে কেনার জন্য পাঠকদের থাকে উপচে পড়া ভিড়। কিন্তু প্রতি বছরের মতো এবার শেষ দিকে এসে মেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থীর উপস্থিতি ততটা নেই। করোনার কারণে সবমিলিয়ে গত দুই বছরের তুলনায় এবছর বই বিক্রি ভালো হলেও মেলার শেষ দিকে এসে বিক্রি আশানুরূপ নয়।

মেলায় বিভিন্ন স্টলের বিক্রয় প্রতিনিধিরা বলছেন, এবারের বইমেলা পিছিয়ে শুরু হওয়ায় অনেক ক্রেতা-পাঠকই জানেন না, মেলা কবে শেষ হবে। ফেব্রুয়ারিতে পাঠকের উপস্থিতি যেমন ছিল তেমনই বই বিক্রিও ছিল বেশি। তবে গত কয়েকদিন মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, এখন সাধারণ দিনে পাঠক ও দর্শনার্থী কম এলেও ছুটির দিনগুলোতে উপস্থিতি কিছুটা বেশি।

রাজধানীতে বসবাসকারী ক্রেতা-পাঠকরা মেলার শুরুতে সময় কম পাওয়ায় কিছু বই কিনলেও মেলায় এসে বই খোঁজ নিয়ে দেখে কেনার তেমন সুযোগ পাননি। সময় বাড়ার ফলে এমন কিছু পাঠক এখন আসছেন। এছাড়াও আসছেন ঢাকার বাইরের কিছু পাঠকরাও। কেউ নিজের পছন্দ ও প্রয়োজনীয় বই কিনছেন মেলা প্রাঙ্গণের স্টল ও প্যাভিলিয়ন ঘুরে। আবার কেউ আসছেন বইমেলা ঘুরে দেখতে। তবে প্রকাশক ও বিক্রেতারা মনে করছেন শেষ কয়েক দিনে বইমেলায় বাড়বে বিক্রি।

করোনায় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ ও সামাজিক দূরত্ব যেন মোটামুটিভাবে হলেও বজায় রাখা যায়, সে বিষয়টি মাথায় রেখে এবার বইমেলার পরিধি অনেকটাই বাড়ানো হয়েছে। স্টলগুলোর সারি ও প্যাভিলিয়নগুলো কিছুটা দূরে দূরে হওয়ায় হাঁটাচলাও করা যাচ্ছে স্বাচ্ছন্দে। শেষ দিকে যারা মেলায় বই কিনতে আসছেন তাদের অনেকেই পছন্দের বই কিনে ঘরে ফিরছেন। শেষদিকে সাধারণ দিনে বই বিক্রি কম হলেও ছুটির দিনগুলোতে মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায় স্টল ও প্যাভিলিয়নগুলোতে পাঠকের বেশ ভিড়। আর এসময় কিছু কিছু স্টল ও প্যাভিলিয়নে ক্রেতাদের চাপ সামলাতে ব্যস্ত দেখা যায় বিক্রেতাদের।

বইমেলা ঘিরে বই কেমন বিক্রি হচ্ছে, জানতে চাইলে মেলায় অন্য প্রকাশ-এর বিক্রয় প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ আল সাফি জাগো নিউজকে বলেন, গত দুই বছরের তুলনায় এবছর মেলায় খুব ভালোই বই বিক্রি হয়েছে। ছুটির দিনগুলোতে সবচেয়ে বেশি বই বিক্রি হয়েছে। শেষ দু-তিন দিন কেমন আসে বলা যাচ্ছে না।

অন্বেষা প্রকাশ-এর প্রকাশক সাদাত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, বইমেলায় প্রথম দিকে পাঠকরা আসেন বইয়ের ক্যাটালগ সংগ্রহ করতে এবং মেলার শেষ দিকে তারা বইগুলো কেনেন। এটি একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে পাঠকদের। এবারের মেলা প্রথমে ১৪ দিন চলার কথা থাকায় শুরুতে কিছু পাঠক এসেছেন। ক্যাটালগ সংগ্রহ করে বা অনেকে তা না করেই কিছু বই কিনে নিয়েছেন। ফলে পাঠক যে বইগুলো কিনতেন তার অনেকগুলোই কিনতে পারেননি। পরে মেলার সময় বাড়ানো হলেও অনেকের পক্ষে মেলায় আসা সম্ভব হয়নি। শুরু থেকেই সময়টা বাড়ানোর ঘোষণা থাকলে লেখক-পাঠক ও ক্রেতাদের বিভ্রান্ত হতে হতো না। বই বিক্রিও আরও বেশি হতো।

বাবার সঙ্গে বইমেলায় আসা ঝিনুক মালা জাগো নিউজকে বলেন, মেলায় এসে ভালোই লাগছে। এবছর আজই প্রথম এলাম। মেলা শেষ হয়ে যাবে তাই পছন্দের কয়েকটি বই আজ কিনেছি। গণিতের বই ও কিছু গল্পের বই কিনবো।

মাসব্যাপী এ মেলা ঘিরে প্রতিবছরই নতুন নতুন বই আসে। এসব বই সংগ্রহে পাঠকদের থাকে বাড়তি আগ্রহ। এবারের বইমেলায়ও তেমনই কিছু নতুন বই এসেছে মেলায়। প্রথমা প্রকাশ থেকে প্রকাশিত ড. আকবর আলী খানের আত্মজীবনীমূলক বই “পুরনো সেই দিনের কথা”, আনিসুল হকের “রক্তে আঁকা ভোর”, অন্য প্রকাশ থেকে প্রকাশিত সাদাত হোসেনের লেখা “প্রিয়তম অসুখ সে” বইগুলো এবারের বইমেলায় তুলনামূলক ভালো বিক্রি হচ্ছে।

শেষ সময়ে মেলায় বই কিনতে আসা প্রাইম ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফয়েজুল ইসলাম কৌশিক জাগো নিউজকে বলেন, একটু ব্যস্ততা ছিলাম বলে এতোদিন বইমেলায় আসতে পারিনি। আজ বন্ধুরা মিলে এলাম। স্টলগুলো ঘুরে বই দেখছি। পছন্দের বই পেলেই কিনবো।

jagonews24

নানা প্রস্তুতি শেষে প্রকাশকরা বইয়ের পসরা সাজিয়ে মেলায় বসলেও করোনা মহামারির কারণে গত দুবছর তা হচ্ছে না। প্রকাশনা শিল্পের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আশা নিয়ে এবছরও শুরু হয় মেলা।

মাওলা ব্রাদার্স-এর প্রকাশক আহমেদ মাহমুদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, এবছর শুরুতে বইমেলায় প্রচুর পাঠক এসেছে। আগের মতো করেই তারা বই কিনছে। কোভিডের যে আশঙ্কা ছিল সেটা মাথায় রেখেও পাঠকরা সুরক্ষিতভাবেই বই কিনছে। তাদের প্রিয় লেখকদের বই দেখছে এবং প্রয়োজনীয় বই কিনছে। বই প্রচুর বিক্রি হচ্ছে। তবে মেলা শেষেই বুঝা যাবে কেমন বিক্রি হলো পুরো বইমেলায়।

অমর একুশে বইমেলায় শুধু ঢাকার পাঠকরাই নয়, দেশের সব জায়গা থেকে বইপ্রেমীরা আসেন নতুন বইয়ের খোঁজে। শুরুতে করোনার কারণে বাইরের পাঠকরা কম এলেও মেলার সময় বাড়ায় এখন ঢাকার বাইরের ক্রেতা-পাঠকদের উপস্থিতি বাড়ছে।

পাঞ্জেরী প্রকাশনী-এর ক্রিয়েটিভ মার্কেটিং ইনচার্জ ইফতেখার আজিজ বলেন, ঢাকায় যেসব পাঠক রয়েছেন তারা শুরুতে আসার সুযোগ থাকলেও ঢাকার বাইরের পাঠকরা পরেই আসেন। ফলে প্রথম দিকে মেলার সময় কম থাকায় ঢাকার বাহিরের পাঠকরা আসতে পারেনি। তবে শুরুতে মেলায় বিক্রি ভালোই হয়েছে। এখনো অনেকেই আসছেন এবং বিক্রিও হচ্ছে।

গাজীপুরের সখিপুর থেকে বইমেলায় আসেন পারভেজ হোসেন। সোমবার (১৪ মার্চ) বিকেলে মেলায় কথা হয় তার সাথে। এসময় জাগো নিউজকে পারভেজ জাগো নিউজকে বলেন, এবারের মেলায় প্রথম দিকে আসা হয়নি, আজই প্রথম এলাম। বিদেশি লেখকের কয়েকটি বই কিনতে এসেছি। এর বাইরে পছন্দের বই পেলে কিনবো।

সাতক্ষীরার আশাশুনি থেকে বইমেলায় আসা সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের প্রভাষক ইদ্রিস আলী জাগো নিউজকে বলেন, মেলায় প্রথম দিকে আসতে পারিনি। আজকেই প্রথম এলাম। পছন্দের লেখকদের কিছু বই কিনবো। বইমেলা থেকে বই সংগ্রহ করার মধ্যে আলাদা একটু ভালোলাগাও কাজ করে।

মেলা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মার্চের তুলনায় ফেব্রুয়ারি মাসেই বেশি পাঠক এসেছে এবারের বইমেলায়। ফলে বইয়ের বিক্রিও শুরুতেই বেশি হয়েছে।

প্রথমা প্রকাশন-এর বিক্রয় প্রতিনিধি তারেক রাসেল জাগো নিউজকে বলেন, পাঠক বেশি ছিলো ফেব্রুয়ারি মাসেই। তখন বই বিক্রিও বেশি ছিলো। মার্চের শুরু দিক থেকেই রিদমটা নেই। অনেকে জানে না হয়তো। তাই এখন তুলনামূলক কিছুটা কম বই বিক্রি হচ্ছে। হুট করে দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির একটা ধাক্কাও মেলায় লেগেছে। ফলে সাধারণ পাঠক ইচ্ছেমতো বই কিনতে পারছেন না। এছাড়া উপস্থিতি বেশি দেখলেও মেলায় অনেকেই আছেন, যারা শুধুই ঘুরতে আসেন।

সোমবার (১৪ মার্চ) বইমেলায় এসেছিলেন লেখক ও গল্পকার হাবিবুল্লাহ ফাহাদ। এসময় কথা হয় তার সঙ্গেও। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, বইমেলায় পাঠক, লেখক ও প্রকাশকদের সমাবেশ হয়, যা অন্য সময়ে হয় না। এখানে লেখক-পাঠকদের মধ্যে একধরনের মতবিনিময় হয়। প্রবীণ ও ভালো লেখকদের সঙ্গেও দেখা হয়। বছরের অন্য সময়ে তাদের সান্নিধ্য পাওয়া যায় না। এসব কারণেই বইমেলায় নিয়মিতই আসা।

আরএসএম/এমকেআর/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]