বিয়ের পাত্রীকে আকৃষ্ট করতে মুখে মেকআপ করেন পুরুষরা

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:১১ পিএম, ২২ জানুয়ারি ২০২৬

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিয়ে, প্রেম ও সৌন্দর্যবোধের ধারণা একেক রকম। কোথাও নারীর সৌন্দর্য প্রদর্শনই মুখ্য, কোথাও আবার সামাজিক বা পারিবারিক সিদ্ধান্তই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়। তবে আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির প্রান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী উড্যাব উপজাতির সমাজব্যবস্থা এসব প্রচলিত ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে সৌন্দর্যের ভার পুরুষের কাঁধে, আর সম্পর্কের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নারীর হাতে। বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে পুরুষরা মুখে মেকআপ করে, রঙিন পোশাকে নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করেন, আর নারীরা সেই সৌন্দর্য বিচার করে নিজের পছন্দের সঙ্গী নির্বাচন করেন।

উড্যাব উপজাতি মূলত ফুলানি জনগোষ্ঠীর একটি যাযাবর শাখা। তারা প্রধানত নাইজার, চাদ, নাইজেরিয়া ও ক্যামেরুনের কিছু অঞ্চলে বসবাস করে। কঠোর মরুভূমি পরিবেশে টিকে থাকার জন্য তারা এক জায়গায় স্থায়ীভাবে বসবাস না করে পশুপালনের প্রয়োজনে ঘুরে বেড়ান। গরু তাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু অর্থনীতি, সামাজিক মর্যাদা এমনকি বিয়ের ক্ষেত্রেও পশুর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

বিয়ের পাত্রীকে আকৃষ্ট করতে মুখে মেকআপ করেন পুরুষরা

এই জাতির সাংস্কৃতিক জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত আয়োজন হলো গেরেওল উৎসব। বর্ষা মৌসুম শেষে উড্যাবদের বিভিন্ন দল একত্রিত হয়ে এই উৎসব পালন করে। গেরেওল মূলত একটি সৌন্দর্য ও নৃত্য প্রতিযোগিতা, যেখানে অংশগ্রহণ করেন কেবল পুরুষরা। এই দিনটিকে ঘিরে তারা দীর্ঘ প্রস্তুতি নেন, কারণ এখানেই নির্ধারিত হয় প্রেম, সম্পর্ক এবং অনেক সময় ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গী।

গেরেওলের দিনে উড্যাব পুরুষরা অত্যন্ত যত্নসহকারে নিজেদের সাজান। তারা মুখে হলুদ, লাল ও কালো রঙের মেকআপ ব্যবহার করেন। চোখ আরও বড় ও আকর্ষণীয় দেখাতে গাঢ় কালো আইলাইনার টানা হয়। ঠোঁট লাল রঙে রাঙানো হয়, যাতে দাঁতের সাদা রং আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মাথায় পরা হয় উটপাখির পালক, রঙিন কাপড়, পুঁতি ও শাঁস দিয়ে তৈরি অলংকার। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, বড় চোখ, উজ্জ্বল দাঁত এবং লম্বা-সরু দেহই পুরুষ সৌন্দর্যের প্রধান মানদণ্ড।

নাচের সময় পুরুষরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছন্দময় ভঙ্গিতে শরীর দোলান। তারা বারবার দাঁত বের করে হাসেন এবং চোখ বড় করে মেলে ধরেন, যেন বিচারক নারীরা সহজেই তাদের সৌন্দর্য পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। এই নাচ কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং এটি এক ধরনের নীরব ভাষা যার মাধ্যমে পুরুষরা নিজেদের আত্মবিশ্বাস, শক্তি ও আকর্ষণ প্রকাশ করেন।

বিয়ের পাত্রীকে আকৃষ্ট করতে মুখে মেকআপ করেন পুরুষরা

এই উৎসবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন উড্যাব নারীরা। তারাই বিচারক, তারাই দর্শক এবং তারাই সিদ্ধান্তদাতা। নাচ ও সৌন্দর্য প্রদর্শন শেষে নারীরা নিজেদের পছন্দের পুরুষ নির্বাচন করেন। এই নির্বাচন প্রকাশ্যে ঘোষণা করার প্রয়োজন হয় না; অনেক সময় চোখের ইশারা বা নীরব সম্মতিতেই বিষয়টি সম্পন্ন হয়। একজন নারী চাইলে একাধিক পুরুষকেও পছন্দ করতে পারেন, এবং সমাজে সেটি গ্রহণযোগ্য।

উড্যাব সমাজে নারীদের এই স্বাধীনতা অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। একজন নারী চাইলে বিবাহিত পুরুষকেও সঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে পারেন। আবার তিনি যদি আগের সম্পর্কে অসন্তুষ্ট হন, তবে নতুন সঙ্গীর সঙ্গে চলে যাওয়ার অধিকারও তার রয়েছে। এসব সম্পর্ক সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ নয়, বরং সংস্কৃতির অংশ হিসেবেই বিবেচিত।

বিয়ের পাত্রীকে আকৃষ্ট করতে মুখে মেকআপ করেন পুরুষরা

উড্যাবদের বিয়ের ক্ষেত্রে মূলত দুই ধরনের প্রথা দেখা যায়। একটি হলো প্রথাগত বিয়ে, যা পরিবার ঠিক করে দেয়। সাধারণত অল্প বয়সেই এই বিয়ে সম্পন্ন হয় এবং এটি সামাজিক দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে দেখা হয়। অন্যটি হলো গেরেওল উৎসব থেকে জন্ম নেওয়া প্রেমভিত্তিক বিয়ে। এই বিয়েতে আবেগ, পছন্দ ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তই মুখ্য। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রেমভিত্তিক বিয়ে প্রথাগত বিয়ের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পায়।

যদিও নারীরা সঙ্গী নির্বাচনে স্বাধীন, তবে দৈনন্দিন জীবনে তাদের দায়িত্ব কম নয়। সংসার সামলানো, শিশুদের লালন-পালন, পশুপালনে সহায়তা সব ক্ষেত্রেই নারীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবুও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের মতামত ও পছন্দকে বিশেষ সম্মান দেওয়া হয়।

উড্যাবদের পোশাক ও অলংকার তাদের সংস্কৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। পুরুষরা সাধারণত ঢিলেঢালা লম্বা পোশাক, রঙিন স্কার্ফ ও পাগড়ি পরেন। পুঁতি, শাঁস ও ধাতব গহনা তাদের সাজের অংশ। নারীরা সূচিকর্ম করা লম্বা পোশাক, রঙিন ওড়না, ভারী গলার হার, কানের দুল ও নাকফুল পরেন। তবে সৌন্দর্য প্রদর্শনের ক্ষেত্রে পুরুষদের সাজই বেশি জাঁকজমকপূর্ণ।

বিয়ের পাত্রীকে আকৃষ্ট করতে মুখে মেকআপ করেন পুরুষরা

খাদ্যাভ্যাসের দিক থেকে উড্যাবদের জীবন বেশ সরল। যাযাবর জীবনের কারণে তাদের খাদ্য মূলত গরুর দুধ, দই এবং মাঝে মাঝে মাংসের ওপর নির্ভরশীল। বাজরা বা শস্যজাত খাবারও তারা গ্রহণ করে। অনেক সময় দীর্ঘ পথ চলার কারণে দিনের পর দিন শুধু দুধ ও পানি খেয়েই কাটিয়ে দেন তারা।

উড্যাবদের বিশ্বাস ও সংস্কৃতি প্রকৃতিনির্ভর। সূর্য, চাঁদ, বৃষ্টি ও পশুকে তারা শ্রদ্ধা করে। গান ও নাচ তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মুখে মুখে গল্প বলা ও ঐতিহ্য বর্ণনার মাধ্যমে তারা নিজেদের ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেয়।

বর্তমান সময়ে আধুনিকতার প্রভাব উড্যাব সমাজেও পড়তে শুরু করেছে। তরুণ প্রজন্মের কেউ কেউ শহরমুখী হচ্ছে, আধুনিক পোশাক ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। গেরেওল উৎসব এখন অনেক পর্যটকের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এতে একদিকে যেমন বিশ্ব উড্যাব সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারছে, অন্যদিকে তেমনি সংস্কৃতির বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হচ্ছে।

আরও পড়ুন
যার সংগ্রহে যত তিমির দাঁত, বিয়ের পাত্র হিসেবে সে তত এগিয়ে
বিয়ে এত সহজ নয়, কাঠ কেটে বর-কনেকে দিতে হয় পরীক্ষা

সূত্র: বিবিসি

কেএসকে/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।