শিশুরা যেভাবে খাঁচায় বন্দি হচ্ছে

ফারহানা মোবিন
ফারহানা মোবিন ফারহানা মোবিন , লেখক এবং চিকিৎসক
প্রকাশিত: ০১:২৪ পিএম, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

রাজধানী ঢাকা এখন যান্ত্রিক বাতাসে পূর্ণ। এ যান্ত্রিকতার শিকার হচ্ছে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই। ঢাকার বাইরের শিশুরা খেলাধুলার সুযোগ পায়। কিন্তু ঢাকার শিশুরা অধিকাংশই থাকে গৃহবন্দি। খেলার মাঠ নেই, হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে তাদের বাসার বাইরে যেতে দেওয়া হয় না। স্কুলগুলোও অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাবা-মায়েরা নিরুপায় হয়ে বাসায়ই শিশুকে বন্দি করে রাখেন। আমাদের সমাজে অধিকাংশ মায়েরা এখনো বাসার বাইরে কাজ বা চাকরি করেন না।

দেখা যায়, মা হয়তো রান্নাঘরের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। শিশুটি বাসায় থাকলেও সে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব নিয়ে খেলতে থাকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে এসব যন্ত্র নিয়ে ভিডিও গেম খেলে। যা একজন শিশুর চোখের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। আর স্কুলের পড়া তো আছেই। স্কুলগুলোতে এখন লেখাপড়ার পাহাড়। চারিদিকে তুমুল প্রতিযোগিতা।

শিশুদের সকালে স্কুল, সন্ধ্যায় হুজুর, তারপর বাসায় শিক্ষক পড়াতে আসেন। বাসার শিক্ষক পড়িয়ে চলে যাওয়ার পর তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যাওয়ার প্রস্তুতি। অনেক পরিবারে বাবা-মা দু’জনই শিশুকে পড়ায়। আবার কিন্ডার গার্টেন স্কুল থেকে মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তির জন্য অনেকেই কোচিং করে। অর্থাৎ সেসব শিশুর বিকেলের খেলার সময়ও হারিয়ে যায়।

লেখাপড়ার চাপ এতো বেশি যে, কিছু কিছু পরিবারের বাবা-মাও ছেলে-মেয়ের সাথে পড়তে বসেন। রাজধানী ঢাকার স্কুলগুলোর আশেপাশে দেখা যায়, কিছুসংখ্যক মা স্কুলগুলোর বাইরে স্কুল ছুটি না হওয়া পর্যন্ত বসেই থাকেন। রাস্তার জ্যাম ঠেলে বারবার বাসা থেকে যাওয়া-আসাটা অসুবিধা, তাই স্কুলের বাইরে রাস্তাতেই বসে থাকতে দেখা যায়।

Child

অনেক শিশুর স্কুল শেষে কোচিং, কোচিং শেষে বাসায় যায়। সকাল বেলা বাসা থেকে বের হয়, স্কুল তারপর কোচিং শেষে রাস্তার জ্যাম ঠেলতে ঠেলতে বাসায় ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। এ দৃশ্য হলো নগরী ঢাকার।

ঢাকার বাইরের শিশুরাও লেখাপড়ার ভীষণ চাপে থাকে। তবে তারা খেলার সুযোগ পায়, ঢাকার বাইরের শিশুদের খেলার মাঠ আছে। স্কুলগুলোতেও খেলার মাঠ থাকে। সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছে ঢাকার শিশুরা। তারা স্কুল কোচিং অথবা শিক্ষকের বাসায় প্রাইভেট পড়ে বাসায় ফিরে রাতে মা-বাবা বা শিক্ষকের কাছে আবারও পড়তে বসে। এ হচ্ছে তাদের নিয়তি। খেলার সময় আর ঘুমানের অভাবে মা অথবা বাবার মোবাইল ফোনটা নিয়েই গেম খেলতে থাকে।

নাস্তা হিসেবে খায় ফাস্টফুড। কয়েক বছর আগে বাসায় স্থায়ীভাবে গৃহকর্মী পাওয়া যেত। এখন তা-ও তেমন সহজলভ্য নয়। ফলে মায়েরাও অনেক সময় শিশুর টিফিন বা নাস্তার জন্য নিরুপায় হয়ে ফাস্টফুডে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন। একদিকে খেলার মাঠের অভাব, অন্যদিকে নিয়মিত ফাস্টফুডের জন্য অনেক শিশু স্থূলতার সমস্যায় ভুগছে। বছরের পর বছর এ অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। পরিনামে শিশুরা অকালেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

পরিবেশ-পরিস্থিতি, সুযোগ-সুবিধার অভাবে মানুষ সন্তানকে খেলার জন্য ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, ট্যাব দিচ্ছেন। দৈহিক পরিশ্রমের চেয়ে মানসিক পরিশ্রম হচ্ছে বেশি। এ ধরনের শিশুরা বড় হয়ে একটুতেই হতাশায় ভোগে। পরীক্ষায় ভালো নম্বর হয়তো পায় কিন্তু তারা বাস্তববাদী হতে পারে না। মানুষের সাথে মেশার সুযোগ তাদের হয় না। তাই বাস্তবতা থেকে তারা একটু একটু করে দূরে সরতে থাকে। আর যেসব শিশু ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন পরিবেশে যায়, বিভিন্ন মানুষের সাথে মেশার সুযোগ পায়, তারা জীবনের বড় ধরনের দুঃখ-কষ্টগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে শেখে।

Child-1

আমরা রাজধানী ঢাকার বাবা-মায়েরা খুব বেশি অসহায়। আমাদের নিরুপায় হয়ে সন্তানদের যান্ত্রিক বানিয়ে ফেলতে হচ্ছে। লেখাপড়ার বোঝা, প্রতিযোগিতার তীব্রতা পিতা-মাতাকে বাধ্য করছে শিশুদের যান্ত্রিক বানাতে। বছরের পর বছর এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। একটি শিশু এভাবে ডিজিটাল ব্রয়লার শিশুতে পরিণত হচ্ছে। যা কখনোই কাম্য নয়।

এ অবস্থা ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের এই ঝুঁকি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সরকারকে পাঠ্যসূচির পরিমাণ আরও কমিয়ে আনতে হবে। বহির্বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কিভাবে আরও উন্নত হবে, তা চিন্তা করতে হবে।

মিডিয়াগুলোকে আরও বেশি সোচ্চার হতে হবে। গ্রামাঞ্চলের শহরতলীর শিশুরা শহরের শিশুদের মতো বন্দি জীবনযাপন করে না। কিন্তু নগরীর শিশুরা স্বাভাবিক জীবন থেকে খুব বেশি বঞ্চিত। তারা ডিজিটালভাবে বড় হচ্ছে, কিন্তু হারিয়ে ফেলছে প্রাণ। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোয় ঢাকার ডিজিটাল শিশুরা অনেকেই সৃজনশীল কাজের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। যেমন- ড্রইং, আবৃত্তি, গান, নাচ, জুডো কারাতে খেলা। বাবা-মার উচিত তাদের এ শখের কাজগুলোয় মানসিক চাপ না দেওয়া। অন্তত শখের কাজে তাদের স্বাধীনতা দেওয়া দরকার।

অনেক বাবা-মা শিশুদের মেরে, বকাঝকা দিয়ে, চাপ দিয়ে পড়ান- যা উচিত নয়। এমনিতেই তাদের আমরা মুক্ত বাতাসে খোলা আকাশের নিচে বড় হতে দিতে পারছি না। হারিয়ে যাওয়ার ভয়, মাদকের ভয়াবহ আক্রমণ থেকে দূরে সরানোর জন্য সব বাবা-মা ভীষণ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।

ব্রয়লার মুরগি যেভাবে খাঁচায় বন্দি থাকে; আমাদের শিশুরাও সেভাবেই খাঁচায় বন্দি। নির্দিষ্ট সময়ে স্কুল, কোচিং, হুজুরের কাছে আরবি পড়া, ফাস্টফুড খাওয়া, ভিডিও গেম, কার্টুন হলো তাদের শখের অন্যতম মাধ্যম।

যদি আমাদের শিশুদের উপযুক্ত পরিবেশ দিতে না পারি, তাহলে তারা সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারবে না। এ অবস্থা থেকে বাবা-মা অভিভাবকদের বের হতে হবে। একটি শিশুকে আমরা যদি সুবিধামতো গড়তে পারি, তাহলে সেই শিশুটিই হবে আগামীর কর্ণধার।

Child-2

আমাদের শিশুরা যেন ব্রয়লার শিশু হয়ে গড়ে না ওঠে, তার দিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। বাবা-মাদের চেষ্টা করতে হবে, আমাদের শিশুদের লেখাপড়ার চাপ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। ভালো ফলাফলের জন্য বকাঝকা বা জোর করে পড়ানো অনুচিত। তাদের বোঝাতে হবে, জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য লেখাপড়া প্রয়োজন। আর ছুটির দিনগুলোয় বাসার মানুষকে চেষ্টা করতে হবে, তাদের কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার জন্য, এতে তাদের মন প্রফুল্ল হবে।

চেষ্টা করতে হবে, বিভিন্ন গেম-কার্টুনের পরিবর্তে গল্পের বইয়ে অভ্যস্ত করা। সেটা হবে তাদের জন্য ভীষণ উপকারী এক কাজ। আজকের শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সমৃদ্ধ করার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ডিজিটাল ব্রয়লার শিশু নয়, আমাদের গড়তে হবে সবুজ-সরল শিশু।

শিশুদের বানাতে হবে ভবিষ্যতের যোদ্ধা শিশু হিসেবে। আমরা সম্মিলিতভাবে যদি চেষ্টা করি, তাহলে মানুষের মন-মানসিকতার পরিবর্তন করা এবং অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো আমাদের পক্ষে সম্ভব।

লেখক: চিকিৎসক

এসইউ/পিআর