আরব দেশের ভয়ঙ্কর বাজ খেলা!

শেখ আনোয়ার
শেখ আনোয়ার শেখ আনোয়ার , বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ১১:৪৯ এএম, ০২ জুলাই ২০২১

ধূ ধূ মরুভূমি। মাথার ওপর আগুন ছড়াচ্ছে নির্দয় সূর্য। উঁচু একটা বালির ঢিবির ওপর এসে দাঁড়িয়েছে এক লোক। পরনে তার আরবদের চিরাচরিত পোশাক। চারিদিকে সর্তক নজর বুলালো যাযাবর বেদুইন। দিগন্ত বিস্তৃত বালির সাগরে নড়ে-চড়ে উঠলো কী যেনো? ওটা কি?

বাম হাতটা সামান্য উপরে উঠলো তার। সচকিত হলো কাঁধের ওপর বসা বিশাল এক পাখি। মানুষটির উত্তেজনা টের পেয়ে গেছে পাখিটি। বেদুইনের ঘাড়ের রোমগুলোতে ফুলে ফুলে উঠছে কী এক আক্রোশ। পাখির চোখ জোড়ায় শিকারীর দৃষ্টি।

সাধারণ কোনো চোখ নয় ওটা। মানুষের চেয়ে সাত-আট গুণ বেশি শক্তিশালী। ভালো দেখতে পায় ওই ইন্দ্রিয়। বাজ পাখি ৩০০০ ফুট দূর থেকেও স্পষ্ট দেখতে পায় যে কাউকে। তবে এখন-এই মুহুর্তে কেউ একজন ধরা পড়েছে তার ওই ভয়ঙ্কর দৃষ্টির সীমানায়। এমন কেউ, যে জানে না, মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে খুব শিগগিরই।

এবার ইশারা ভাষায় আলতোভাবে দ্বিতীয়বার কাঁধ ঝাঁকালো আরব বেদুইন। মুহুর্তেই বিদ্যুৎ গতিতে বাজ উড়ে উধাও হয়ে গেলো শুন্য আকাশে। তারপর কয়েক সেকেন্ডেই ছোঁ মেরে শিকারকে ধারালো পায়ের নখে বন্দী করে মালিকের কাছে ধরে আনলো। এরই নাম বাজ খেলা।

jagonews24

বাজ খেলা কি?

বাজ খেলার ইংরেজি নাম ফ্যালকনরি। শিকার করার সুপ্রাচীন এক খেলার নাম বাজ খেলা। মানুষের হাত থেকে ইঙ্গিত পেয়ে অনেক দূরে ধেয়ে যায় পোষা বাজপাখি। মুহুর্তে শিকারকে বধ করে ধরে নিয়ে আসে তার মালিকের কাছে। না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। মানুষ আর পাখির মাঝে অদ্ভূত রাডারের মতো এক যোগাযোগ ঘটে এ সময়ে।

পুরোপুরি নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকে অভিজ্ঞ ফ্যালকনার বা বাজ পাখির ওস্তাদ- প্রশিক্ষক। যেকোনো সময় তার সামান্য ইঙ্গিতে মাঝ আকাশ থেকে ফিরে আসে বাজ পাখি। মালিকের হাতের ওপর বসে পড়ে আবার। পরক্ষণেই নির্দেশ পেয়ে হয়তো আবার উড়ে যায় আকাশে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই বাজ পাখির গতিবেগ ঘন্টায় ২০০ মাইল। অন্য কোনো পাখি এতো দ্রুতবেগে উড়তে পারে না। অবাক হলেও সত্যি, এই বাজ পাখির নাক, মুখ, ঠোঁট ও পাখার আকার-আকৃতি অনুকরণ করে বিজ্ঞানীরা আধুনিক প্রকৌশলীরা জেট ইঞ্জিন নির্মাণের নকশা করেছেন।

বাজ খেলার ইতিহাস

বাজ খেলার ইতিহাস অনেক পুরোনো। অনেকেই বলে থাকেন, মানব সভ্যতার বিকাশের পর পরই এই বাজ খেলা চলে এসেছে। আবার কেউবা বলেন, বাজ খেলার ইতিহাস ১০ হাজার বছরেরও আগের। জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্য ও মঙ্গোলীয় সাম্রাজ্যে ঐতিহাসিকভাবে বাজ খেলা খুবই জনপ্রিয় ছিলো।

jagonews24

শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সাধারণ খেলাধুলার মতোই বাজ খেলা ছিলো এক আভিজাত্য। আরবের অসংখ্য কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার বাজ খেলার প্রশংসা করে অনেক কবিতা-সাহিত্য রচনা করে গেছেন। তবে মরুভূমির যাযাবর বেদুইনরা বাজ পাখি শিকারের কাজে ব্যবহার করতো না। তারা বাজপাখি দিয়ে প্রতিযোগিতা খেলা খেলতো।

বলা হতো, মরুবাসীদের জীবন বাঁচানোর উপায় হলো এই বাজ খেলা। খ্রীষ্টের জন্মের ৬০০ বছর আগেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশ- আরব, ইরান-ইরাক, কাতার, বাহরাইন, দুবাইসহ পারস্য ও আরব উপসাগর, লিবিয়া, মিসর ও আফ্রিকার মরু জঙ্গল এলাকায় ব্যাপক ঐহিত্যপূর্ণ খেলা হিসেবে পরিচিত ছিলো এই বাজ খেলা।

কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, তুর্কিস্তানে সর্বপ্রথম শুরু হয়েছিলো বাজ পাখির এই শিকারের খেলা। ধীরে ধীরে আরব উপসাগরে বাজ খেলা প্রসিদ্ধি লাভ করে। জানা যায়, উমাইয়া খলিফা মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান এবং হিশাম বিন আব্দুল মালেক এই বাজ খেলা খুবই পছন্দ করতেন।

আব্বাসীয়দের শাসনামলে এই বাজ খেলার ব্যাপক সমৃদ্ধি লাভ করে। খলিফা হারুন উর রশিদ নিজে বাজ খেলায় প্রচন্ড অনুরক্ত ও পৃষ্টপোষক ছিলেন। তিনি প্রতিবেশী রাষ্ট্রনায়কদের বাজ পাখি উপঢৌকন হিসেবে পাঠাতেন।

jagonews24

বাজ খেলার বই

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে বাজ পাখি এক সময় রীতিমতো কূটনৈতিক পর্যায়ে ব্যবহৃত হতো। ওসব অঞ্চলে দেশে-দেশে, রাজায়-রাজায় একজন-আরেকজনের কাছে উপহার হিসেবে পাঠাতেন শিকারী এই বাজ পাখি।

ইতিহাসের পাতায় বাজ উস্তাদ প্রশিক্ষকদের প্রভু হিসাবে যে নরপতির নাম সবচেয়ে বেশি উল্লেখ আছে, তিনি জার্মানির সম্রাট দ্বিতীয় ফেডারিক। অত্যন্ত জ্ঞানী লোক ছিলেন। প্রকৃতিবিজ্ঞানের ওপর ছিলো তার অগাধ পড়াশোনা।

পাখি বিশারদ হিসেবেও নাম কুড়িয়েছিলেন অনেক। দেশ-দেশান্তরে পাখিদের আনাগোনা নিয়ে সর্বপ্রথম তিনিই গবেষনা চালান। বাজপাখির খেলার ওপর তিনি লিখেছেন ‘দ্য আর্ট অব ফ্যালকনরি’ নামক বিখ্যাত বই।

দেশে দেশে বাজ খেলা

খ্রীষ্টের জন্মের ৭০০ বছর আগে জাপান-কোরিয়া অঞ্চলে সেনাবাহিনীদের অনুষঙ্গ ছিলো এই বাজ খেলা। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে চীনে। সেখানে শিকারী বাজের ইতিহাস সুপ্রাচীন। চীনের রাজনীতি ও ক্ষমতার মধ্যে বাজ খেলার যোগসূত্র আছে। মঙ্গোলিয়ান সেনাবাহিনীতে হাজার বছর আগে থেকেই উঁচুমানের প্রশিক্ষণ হিসেবে বাজ খেলা প্রশিক্ষণে সেনা সদস্যদের দক্ষ করে গড়ে তোলা হতো।

jagonews24

এই বাজ শিকারী সেনাদের মাধ্যমেই যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা করা হতো। এখনো আছে উত্তর পূর্বচীনের জিলিং প্রদেশের চাংবাই পাহাড়ের উপর বাজ শিকারীদের বিশাল গ্রাম। এই গ্রামের নাম ইংতুন। প্রায় ৩০০ বাজ শিকারী পরিবার এখানে বসবাস করে। এরা সবাই মাঞ্চু উপজাতি হিসেবে পরিচিত। এখানকার মানুষের জীবিকা মাছ ধরা ও পাখি শিকার।

৩০০ বছর ধরে বাজ শিকারের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে তারাই। বাজ পাখি ধরা, পোষ মানানো ও প্রশিক্ষণ দিতে পারদর্শী তারা। চীনের উত্তর পশ্চিম উপজাতি নাক্সি নামে আরেকটি উপজাতি আছে। গ্রেট কুবলাইখানের সেনাবাহিনীদের কাছ থেকে তারা বাজপাখি ধরা ও প্রশিক্ষণ নেয়। এখানকার কৃষকরা প্রতিবছর সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ মাস সময় পর্যন্ত খরগোশ শিকারের কাজে বাজ পাখিকে কাজে লাগায়।

সাহসিকতার প্রতীক বাজ খেলা

চীনের উপজাতিদের কাছে বাজপাখি পালন ও শিকার সাহস ও পৌরুষত্বের প্রতিক। মাঞ্চুর রাজা লিও শেং (১৬৩৯ সাল) কে বাজপাখির রাজা বলা হয়। কথিত আছে, এই রাজা যখন ৯ বছরের যুবরাজ; তখন থেকেই তিনি প্রসিদ্ধ বাজ শিকারী। চীনের রাজারা একজন বাজ মাস্টারকে রাজ্যে চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বলে মর্যাদা দিতেন।

সফল শিকার শেষে যখন রাজদরবারে প্রধান বাজ প্রশিক্ষক সদর্পে প্রবেশ করতেন। তখন স্বয়ং রাজা সম্মান জানাতে সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেন। অভিজাত নারীরাও অংশ নিতেন এসব বাজ শিকার অনুষ্ঠানে। রাজবংশের রাজাধিপতিরা নিয়মিতভাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছ থেকে বাজপাখি উপহার পেতেন কিংবা উপহার হিসেবে পাঠাতেন।

jagonews24

চীনের রাজাদের কাছে বাজ ছিলো এক সময় আভিজাত্যের প্রতীক। চীনের মাঞ্চুর রাজা লিও শেং এর মৃত্যু দিবসে প্রতিবছর নবম চান্দ্র মাসে সবাই মিলে বাজ পাখি দিয়ে পাখি ও মাছ শিকার করে। তারপর ছেলে-মেয়েসহ গ্রামের সব মানুষ পাহাড়ের উপর উঠে ধুমধাম করে ভোজ উৎসবের আয়োজন দেয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত উপদ্বীপে খ্রীস্টপূর্ব ৬০০ বছর আগে থেকে বাজ খেলা চলে আসছে বলে জানা যায়। বাজ খেলা মোগলদের ব্যাপক পৃষ্টপোষকতা পায়। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে মরুভূমি এলাকার হরিণ শিকারের কাজে বাজ পাখি ব্যবহার করা হতো।

বাজ খেলার নিয়ম

বাজপাখি নিয়ে শিকারের বেলায় যথেষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয়। যেমন- শিকার করা পাখিকে নিয়ে মাটিতে নামার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেখানে হাজির হতে হয় বাজ প্রশিক্ষককে। মাটিতে নামার আগেই শিকারের গায়ে ছুরির মতো ধারালো নখগুলো ভালো মতো ঢুকিয়ে দিতে হয় বাজ পাখিকে। নইলে মাঝপথেই ধস্তাধ্বস্তি শুরু করে এবং শিকারীর হাত থেকে ছাড়িয়ে নিতে পারে নিজেকে।

ভাগ্য ভালো হলে শিকারের বুকের ওপর নখগুলো গেঁথে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে শিকারী বাজ। তখনই কাছে পৌঁছে যায় বাজ প্রশিক্ষক। আরব উপসাগরীয় দেশে বাজ পাখি অন্য যেসব পাখি শিকার করে ধরে আনে তাদের নাম হুবারা বাস্টার্ড। সাধারণ বাজের তুলনায় বেশ বড়সড় মরুপাখি এই হুবারা বাস্টার্ড। পাখিটা দেখতে আমাদের দেশের সারস পাখির মতো।

jagonews24

তবে আকারে অনেক বড়। শুধু যে এর সুস্বাদু মাংসের জন্যই শিকার করা হয় তা কিন্তু নয়। এ পাখিকে ধরার জন্য না-কি বেশ ভালো রকম কসরত দেখাতে হয় বাজ পাখিকে। অনেক সময় প্রায় দেড় মাইল দূর থেকে উড়তে শুরু করে বাজ। ধাওয়া করতে করতে অনায়াসে পার হয়ে যায় সাত থেকে আট মাইল দূরত্ব। শিকার ধরতে বাজ পাখিকে এতোখানি দক্ষ করে গড়ে তুলতে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয় বাজ প্রশিক্ষককে।

আর হ্যাঁ। বাজ পাখি প্রশিক্ষণ দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। প্রতিদিন ট্রেনিং দিতে হয়। প্রতিনিয়ত যত্ন নিতে হয়। বাজ পাখিকে ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘদিন চোখে চোখে রাখতে প্রশিক্ষকদের দিনের পর দিন জঙ্গলে কাটাতে হয়। তা না হলে মাত্র কয়েকদিনের হেলাফেলায় পোষা থেকে আবার বন্য হয়ে উঠতে পারে শিকারী বাজ পাখি।

দেশে দেশে, যুগে যুগে একসময় ব্যাপক প্রচলন থাকলেও ধীরে ধীরে কালের গ্রাসে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বাজ খেলার এই প্রথা। কেবল আরবের দেশগুলোতে উটের দৌঁড় প্রতিযোগিতার মতোই এখনো রয়ে গেছে সৌখিন এই বাজ খেলা।

লেখক: বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

জেএমএস/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]