এভাবে চলে যেতে নেই

হাবীবাহ্ নাসরীন
হাবীবাহ্ নাসরীন হাবীবাহ্ নাসরীন , কবি ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৯:১৩ এএম, ০৪ জুন ২০১৫

সিজিপিএ সিস্টেমের সর্বোচ্চ পয়েন্ট জিপিএ-৫ বা এ প্লাস পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে সব শিক্ষার্থী কিংবা অভিভাবকের। এবং সেই প্রত্যাশা পূরণের প্রচেষ্টাও থাকে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর। অনেক সময় হয়তো তারা নিজেদের ভালোটা বুঝতে পারে না। জীবন নামক স্টেশনে তারা নতুন যাত্রী, অনেক কিছুই তাদের কাছে অচেনা। কোনটা তাদের জন্য ভালো, কোনটা ক্ষতিকর, তা বোঝানোর দায়িত্ব থাকে অভিভাবকেরই। অভিভাবকেরা বুঝিয়েও থাকেন। সন্তান না বুঝতে চাইলে মৃদু শাসনও করে থাকেন। শাসন অভিভাবকেরা করতেই পারেন। তবে সেই শাসন যখন মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, প্রত্যাশার পাহাড়ে সন্তান যখন চাপা পড়ে যায়, তখনই ঘটে মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা। শাসন আর প্রত্যাশার বাড়াবাড়িতে নিভে যেতে পারে প্রিয় সন্তানের জীবনপ্রদীপ! এমনটাই মনে করিয়ে দিলো আরাফাত শাওনের স্বেচ্ছামৃত্যু। ২০১৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ এর ভেতরে ৪.৮৩ পেয়েও যাকে চলে যেতে হয়েছে একবুক অভিমান আর ঘৃণা নিয়ে!

স্বেচ্ছামৃত্যু কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। একজন শিক্ষার্থী, যে কি না জিপিএ-৫ এর ভেতরে ৪.৮৩ পায়, সে কেন এভাবে চলে যাবে? যে কেবল জীবনের চৌকাঠে পা রেখেছে, কী এমন কারণ যার জন্য তাকে দরজা থেকেই ফেরত যেতে হয়, কেন তাকে আমরা ফুলেল ডালা নিয়ে বরণ করতে পারি না, কেন তাকে আমরা নিঃস্ব হাতে ফেরত পাঠাই, কেন বেছে নিতে বলি স্বেচ্ছামৃত্যুর মত করুণ উপসংহারকে!

আরাফাত তার মৃত্যুর জন্য দায়ী করে গেছে তার পরিবার, এদেশের রাজনীতি, মেরুদন্ডহীন শিক্ষাব্যবস্থাকে। তার সবগুলো অভিযোগ কি সত্যি নয়? এ প্লাস ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সব অভিভাবকের মুখে একটাই চাওয়া, তার সন্তানকে এ প্লাস পেতেই হবে! আরাফাত লিখে গেছে `A+ কি গাছে ধরে যে আমি পেড়ে আনবো!`। এমন প্রশ্ন নাড়া দিয়ে যায় আমাদের বিবেককে। অথচ আরাফাতের আগে কখনও কি আমরা এমন করে ভেবেছি? এক একটি দুর্ঘটনা ঘটার আগে কেন আমরা সচেতন হই না!

ডাবল এ প্লাস ধারী অনেক শিক্ষার্থীকেই দেখা যায় সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষাতেই পাস করতে পারছে না! এ প্লাস না পেলে তুমি মেধাবী নও- সমাজের এমন একচোখা দৃষ্টিভঙ্গীর কারণেই শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবই গোগ্রাসে গিলে উগড়ে দিচ্ছে পরীক্ষার খাতায়। যার ফলাফলস্বরূপ এ প্লাস অনেকেই পাচ্ছে ঠিকই, পরিপূর্ণ মেধাবী হয়ে উঠতে পারছে না। দুটি সার্টিফিকেটে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার জন্য দৌড়াতে গিয়ে ছিটকে পড়ছে জীবনের মূল লক্ষ্য থেকে। দুটি ছাপানো কাগজ যে আমাদের ভাগ্য, আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে না, তা আমাদের অভিভাবকদের বুঝতে আর কত সময় লাগবে! না কি এভাবেই মেধাবী আরাফাতরা একে একে ঝরে যাবে!

কিশোর আরাফাতের বয়স কম। জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা কম। জীবনকে সে যতটুকু দেখেছে তাতে বেঁচে থাকার জন্য আনন্দজনক কিছু হয়তো খুঁজে পায়নি, তাকে সে সুযোগটুকু দেয়ার দায়িত্ব কি অভিভাবকদের ছিল না? আরাফাতকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার দায় তারা কী করে এড়াবেন! সন্তানের মঙ্গলের জন্য শাসন, ভালো ফলাফলের জন্য আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যেক মা-বাবারই থাকবে। তাই বলে সেই আকাঙ্ক্ষার চাপ যেন এমন না হয় যা সন্তানকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে! সন্তানের কোমল মনটাকে বুঝে তার পাশে বন্ধুর মতো না থাকতে পারলে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর আরাফাতদেরকেও বুঝতে হবে, স্বেচ্ছামৃত্যু কখনোই কোনো সমাধান হতে পারে না। সমস্যার সমাধান করতে হয় বেঁচে থেকে। জীবন একটি যুদ্ধক্ষেত্র। প্রতিটি মুহুর্ত এখানে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়। আজ অভিমান নিয়ে সরে দাঁড়ালে, কেউ তোমাকে ডেকে ফেরাবে না। নিজের জায়গাটুকু নিজে দখল করে নাও। নিজের অবস্থান আলোকিত করে দাঁড়াও। যেন বাকিরাও তোমার আলো দেখে পথ চিনে নিতে পারে। অন্ধকারে হারিয়ে যেও না। এভাবে চলে যেতে নেই।

এইচএন/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।