সুয়েজ খালে যানজটের পেছনে দায়ী এই মিসরীয় নারী?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৫২ পিএম, ০৪ এপ্রিল ২০২১

গত মাসে অদ্ভুত একটি ব্যাপার নজরে আসে মারওয়া এলসলেহডারের। সুয়েজ খালে জাপানি মালিকানার বিশাল একটি জাহাজ আড়াআড়িভাবে আটকে পড়ায় মালবাহী জাহাজ চলাচলে বিরাট অচলাবস্থা তৈরি হয়। গত ২৩ মার্চ ২০ হাজার কন্টেইনার ভর্তি এভার গিভেন নামের বিশাল জাহাজটির মাথা সুয়েজ খালের তীরে বালিতে আটকে যায়।

সে সময় মারওয়া তার মোবাইল ফোনে দেখতে পান, তাকেই এই ঘটনার জন্য দায়ী করে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইনে।
মিসরের প্রথম নারী ক্যাপ্টেন মারওয়া বলেন, ‘আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছি।’

এরপর লোহিত সাগরে ২শ’র বেশি জাহাজের বিশাল জট তৈরি হয় এবং অনেক জাহাজ আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে বাধ্য হয়। কয়েকদিনের জন্য থমকে যায় জাহাজ চলাচল।

সে সময় মারওয়া মিসরের মেরিটাইম সেফটি কর্তৃপক্ষের আইডা ফোর নামে জাহাজে ফার্স্ট মেট হিসেবে কাজ করছিলেন। ঘটনার সময় জাহাজটি ছিল সুয়েজ খাল থেকে কয়েকশ’ মাইল দূরে আলেকজান্দ্রিয়ায়।

জাহাজটি মিসরের সমুদ্র নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন। এটি লোহিত সাগরে একটি বাতিঘরের জন্য মালামাল পৌঁছে দেয়ার কাজ করে থাকে। এছাড়া আরবলীগ পরিচালিত আরব অ্যাকাডেমি ফর সায়েন্স, টেকনোলজি অ্যান্ড মেরিটাইম ট্রান্সপোর্টের নবীন ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণের কাজেও ব্যবহৃত হয়।

যে খবরটির মাধ্যমে সুয়েজ খালের অচলাবস্থার সাথে মারওয়া এলসলেহডার জড়িত বলে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল সেটি আসলে একটি ভুয়া বা মিথ্যা সংবাদ। মূলত সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভুয়া এক সংবাদ শিরোনামের স্ক্রীনশটে ওই অচলাবস্থার জন্য তাকে দায়ী করা হয়েছিল। আর সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুতই।

ভুয়া যে সংবাদ শিরোনামের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়েছে, ধারণা করা হচ্ছে সেটি আরব নিউজে প্রকাশিত কোন প্রতিবেদন। ওই খবরে প্রকাশি ছবিটি নেয়া হয়েছে আরব নিউজের গত ২২ মার্চ প্রকাশিত অন্য একটি খবর থেকে।

সেখানে মিসরের প্রথম নারী জাহাজের ক্যাপ্টেন হিসেবে মারওয়ার ওপর একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। টুইটারে সেই ছবি বহুবার শেয়ার করা হয়েছে।

এমনকি টুইটারে মারওয়া এলসলেহডারের নামে থাকা অনেকগুলো অ্যাকাউন্ট থেকেও ওই ভুয়া খবর ছড়ানো হয় যে তিনি এভার গিভেনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বিবিসিকে মারওয়া বলেন, তার কোন ধারণাই নেই কে কোথা থেকে আর কেন এই ভুয়া খবর ছড়িয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় আমি আমার কাজের ক্ষেত্রে একজন সফল নারী, সেজন্য আমাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। অথবা হয়তো আমি একজন মিসরীয় সেজন্যও হতে পারে, কিন্তু আমি নিশ্চিত না কেন এমনটা হয়েছে।’

তবে তিনি সুয়েজ খালের ওই জটিলতায় কোনভাবে যুক্ত ছিলেন না। ঘটনার সময় তার জাহাজ ছিল সুয়েজ খাল থেকে কয়েকশ’ মাইল দূরে। তবে কাজ করতে গিয়ে এবারই প্রথম তিনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেন এমন নয়। তিনি এমন একটি ক্ষেত্রে কাজ করছেন ঐতিহাসিকভাবে তা পুরুষ নিয়ন্ত্রিত।

ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের হিসাব অনুযায়ী, এই মূহুর্তে বিশ্বের সমুদ্রযানগুলোতে মাত্র দুই শতাংশ নারী কাজ করছেন। ২৯ বছর বয়সী মারওয়া এলসলেহডার ২০১৫ সাল থেকে আইডা ফোর জাহাজের ক্যাপ্টেন হিসেবে কাজ করছেন।

নিয়োগের সময় তিনি ছিলেন সবচাইতে কমবয়সী এবং প্রথম নারী মিসরীয় ক্যাপ্টেন। এমনকি তিনি যখন আরব লীগের বিশ্ববিদ্যালয় আরব অ্যাকাডেমি ফর সায়েন্স, টেকনোলজি অ্যান্ড মেরিটাইম ট্রান্সপোর্টে ভর্তির আবেদন করেন, তখনও সেখানে মেয়েদের পড়ার অনুমতি ছিল না।

তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় যাবার পর তৎকালীন মিসরীয় প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের অনুমোদনে তিনি অ্যাকাডেমিতে পড়ার সুযোগ পান। ফলে যখন সুয়েজ খালে অচলাবস্থার জন্য তাকে দায়ী করা হলো, তখন তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। কারণ এটি তার কাজের ওপর প্রভাব ফেলবে।

তিনি বলেন, ‘ভুয়া খবরটি ছিল ইংরেজিতে প্রকাশিত, যে কারণে এটা অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। আমি খুব চেষ্টা করছি ওই নিবন্ধে কী আছে তা না ভাবার। কারণ এর ফলে আমার যে সম্মান তার ওপর প্রভাব পড়েছে এবং আমি জানি আমার বহু চেষ্টার ফল হিসেবেই আমি আজকের জায়গায় এসেছি।’

তিনি বলেন, নিবন্ধে তার সম্পর্কে অত্যন্ত নেতিবাচক এবং রূঢ় মন্তব্য করা হয়েছে। কিন্তু অনেক সাধারণ মানুষ এবং সহকর্মীদের কাছ থেকে উৎসাহজনক মন্তব্যও পেয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘যত সমর্থন আর ভালোবাসা আমি পেয়েছি আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তার ওপরই নজর দেব। সেজন্যই আমার সব ক্ষোভ এখন কৃতজ্ঞতায় রূপ নিয়েছে।’ সামনের মাসেই মারওয়া এলসলেহডারের ফাইনাল পরীক্ষা। পাস করার পর তিনি ফুল র্যাংক ক্যাপ্টেন হিসেবে কাজ করতে পারবেন।

টিটিএন/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]