পুঠিয়ার শ্রমিক নেতা হত্যা : এজাহার বদলের রিটের রায় ১ ডিসেম্বর
রাজশাহীর পুঠিয়ার শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার এজাহার বদলে ফেলার অভিযোগের বিষয়ে করা রিট আবেদনের ওপর আগামী ১ ডিসেম্বর রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন হাইকোর্ট। বুধবার (২৭ নভেম্বর) হাইকোর্টের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই দিন ধার্য করেন।
রায়ের দিন ঠিক করার পর এ বিষয়ে হত্যার স্বীকার ভিকটিমের কন্যা নিগার সুলতানা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালতের প্রতি আমাদের পরিবারের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। আমরা ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছি আর গণমাধ্যমের ভূমিকাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন আইনজীবী অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং রিট আবেদনকারীর পক্ষে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আদালতে বলেন, বিচার বিভাগীয় তদন্তেই বেরিয়ে এসেছে এজাহার বদলের সঙ্গে কে কে জড়িত। তিনি পুঠিয়ার সাবেক ওসি শাকিল উদ্দিন আহমেদ বাপ্পির বিরুদ্ধে তার শাশুড়ির করা অভিযোগসহ একাধিক অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমাদের এজাহার বদলে ফেলা হয়েছে। এই আদালতের কাছে ন্যায়বিচার চাচ্ছি।
জবাবে রষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘ওসি জড়িত থাকলে বলার কিছু নেই। সেটা আদালত বিচার করবেন। এজাহার বদল হয়েছে কি না সেটা তদন্তের বিষয়। যদি বাদীর কথামতো এজাহার নেয়া না হয়, তবে সে অভিযোগ ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগ মিথ্যা হলেও বাদী যেভাবে বলবেন সেভাবেই এজাহার নিতে থানা বাধ্য।’
তিনি বলেন, ‘ঢালাওভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জড়ানো ঠিক হয়নি। ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে এভাবে ঢালাওভাবে সকলকেই জড়ানো হতে পারে। তাই জেলা জজ অথবা ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের দিয়ে তদন্ত করা হোক। রাষ্ট্রপক্ষ এখানে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করে।’
এসময় আদালত বলেন, ‘পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ- আমরা এটাকে হালকাভাবে দেখতে পারি না। এখানে থানার ওসির বিরুদ্ধে এজাহার বদলে ফেলার অভিযোগ। এই অভিযোগ মিথ্যা কি না-সেটা দেখা দরকার।’
একজন আসামির জবানবন্দি নিয়ে এসপির সংবাদ সম্মেলন করা নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলকে প্রশ্ন রেখে আদালত বলেন, ‘আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি সত্য হলেও এভাবে এসপি তা প্রকাশ করতে পারেন কি না?
হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ১৬ সেপ্টেম্বর এক আদেশে সাবেক ওসি শাকিল উদ্দিন আহমেদ বাপ্পির বিরুদ্ধে মামলার এজাহার বদলে ফেলার অভিযোগে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন। রাজশাহীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মেহেদী হাসান তালুকদারকে বিষয়টি তদন্ত করে ৪৫ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেয়া হয়। একইসঙ্গে, ওই ওসিকে কেন চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হবে না, তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়। পাশাপাশি ওসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা-ও জানতে চাওয়া হয়।
এই নির্দেশের পর বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করেন রাজশাহীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মেহেদী হাসান তালুকদার। হাইকোর্টে দেয়া প্রতিবেদনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মো. মাহমুদুল হাসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মো. মতিউর রহমান ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পুঠিয়া সার্কেল) মো. আবুল কালাম সাহিদ এবং পুঠিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মহিনুল ইসলাম ও সাবেক ওসি শাকিল উদ্দিন আহমেদ বাপ্পিকে দায়ী করা হয়েছে।
এই প্রতিবেদন গত ৬ নভেম্বর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট দের কাছে পাঠানো হয়। আজ ওই প্রতিবেদনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
জানা যায়, গত ২৪ এপ্রিল পুঠিয়া সড়ক পরিবহন মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে নুরুল ইসলাম ও আব্দুর রহমান পটল সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনে পটলকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এই ফলাফল বাতিল চেয়ে নুরুল ইসলামসহ তিনজন রাজশাহী আদালতে মামলা করেন। মামলায় বলা হয়, নুরুল ইসলাম ৬০২ ভোট ও পটল ৫২০ ভোট পান। কিন্তু এই ফল পাল্টে পটলকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। এই মামলার বিরোধের জের ধরে গত ১০ জুন নিঁখোজ হন নুরুল ইসলাম। পরদিন ১১ জুন সকালে পুঠিয়ার কাঁঠালবাড়িয়া এলাকার ‘এসএস ব্রিক ফিল্ড’ নামক ইটভাটা থেকে নুরুল ইসলামের লাশ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় নিহতের মেয়ে নিগার সুলতানা থানায় এজাহার দাখিল করেন। ওই এজাহারে পুঠিয়া সড়ক পরিবহন মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচনের ফল পাল্টে দেয়ার সঙ্গে ওসি শাকিল উদ্দিনের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়। এটা দেখার পর নিগার সুলতানা এজাহার গ্রহণ না করে ওসির সম্পৃক্ততার কথা বাদ দিয়ে এজাহার সংশোধন করতে বলা হয়।
থানার কথা মতো নিগার সুলতানা ওসির নাম বাদ দিয়ে মূল হত্যাকারী হিসেবে আব্দুর রহমান পটলসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে এজাহার দাখিল করেন। থানা সেই এজাহার রেখে দেয়। পরে ওই রাতে নিগার সুলতানাকে থানায় ডেকে নিয়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষর রেখে দের।
এরপর কয়েকদিন থানা থেকে কোনো তৎপরতা না দেখে নিহতের স্ত্রী সাজেদা বেগম পুঠিয়া উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা করেন। এই মামলায় আব্দুর রহমান পটলসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। এই মামলাকে এজাহার হিসেবে গণ্য করার নির্দেশনা চাওয়া হয়। এসময় পুঠিয়া থানা থেকে নিগার সুলতানার স্বাক্ষর করা একটি এজাহার হাজির করে থানা পুলিশ। তাতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি দেখানো হয়। ওই এজাহারে সন্দেহজনক হিসেবে পাঁচজনের নাম বলা হয়।
এই এজাহারের বিষয়ে তখনই নিগার সুলতানা ও তার মা সাজেদা বেগম আপত্তি জানিয়ে বলেন, ‘এই এজাহার তাদের নয়।’ পরবর্তীতে নিহত নুরুল ইসলামের পরিবারের পক্ষ থেকে গত ১৮ জুলাই আইজি, রাজশাহী রেঞ্জের পুলিশের ডিআইজি ও রাজশাহীর এসপির কাছে এজাহার বদলে ফেলার অভিযোগ দাখিল করা হয়। কিন্তু পুলিশ প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়নি। এ অবস্থায় হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়।
এদিকে গত ১৮ জুন রাজশাহীর এসপি এক সংবাদ সম্মেলন করে নিহত নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ আনেন। এসপির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘নুরুল ইসলামের সমকামিতার অভ্যাস চিল। এলাকার এক কিশোরকে তিনি (নুরুল ইসলাম) এ কাজে বাধ্য করতেন। ১০ জুন রাতেও নুরুল ইসলাম ওই কিশোরের সঙ্গে সমকামিতায় লিপ্ত হন। একপর্যায়ে ওই কিশোর তাকে ইটের আঘাতে হত্যা করে। তাই ওই কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।’
এসপির এই সংবাদ সম্মেলনের কথা গত ১৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে তুলে ধরেন আইনজীবী। শুনানি শেষে আদালত আদেশ বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন।
এফএইচ/এসআর/এমএস