‘খুন হওয়া’ কিশোরী জীবিত উদ্ধার: হাইকোর্টে দুই তদন্ত কর্মকর্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:১২ এএম, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০
ফাইল ছবি

নারায়ণগঞ্জে ১৫ বছরের এক কিশোরীকে অপহরণ করে গণধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে-তিন আসামি আদালতে এমন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন। এই ঘটনায় তিনজনই কারাগারে আছেন। ৪৯ দিন পর ওই কিশোরীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। কিশোরী এখন একজনকে বিয়ে করে সংসারও করছে।

এ ঘটনায় তলবের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টে উপস্থিত হয়েছেন মামলার দুই তদন্ত কর্মকর্তা। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় তারা আদালতে হাজির হন।

আদালতে দুই পুলিশ কর্মকর্তা হাজির হওয়ার বিষয়টি জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেছেন রিটকারী আইনজীবী মুহাম্মদ শিশির মনির। এ বিষয়ে আজ শুনানির দিন ধার্য রয়েছে বলেও জানান আইনজীবী।

বেঁচে থাকার পরও নারায়ণগঞ্জের স্কুলছাত্রীকে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আসামিদের স্বীকারোক্তি আদায় -সংক্রান্ত বিচারিক আদালতের সব রেকর্ড ও মামলার দুই তদন্তকারী কর্মকর্তাকে (আইও) এর আগে গত (২৭ আগস্ট) তলব করেছিলেন হাইকোর্ট।

জবানবন্দি গ্রহণের কার্যক্রমের বৈধতা ও যৌক্তিকতার প্রশ্ন তুলে করা আবেদনের (রিভিশন) ওপর শুনানি নিয়ে (২৭ আগস্ট) হাইকোর্টের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম এবং বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

আদালতে ওই দিন আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুর্টি অ্যাটর্নি জেনারেল সারোয়ার হোসেন বাপ্পী।

আইনজীবী শিশির মনির আদেশের বিষয়ে বলেছিলেনন, ‘দুই তদন্ত কর্মকর্তাকে তলবের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের মুখ্য বিচারিক হাকিমকে (চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট) সব নথিপত্র (মামলার রেকর্ড) পাঠাতে বলা হয়েছে। আশা করছি তদন্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে ব্যাখ্যা পাওয়ার পর আদালত উপযুক্ততা বিবেচনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শামীম আল মামুন তিন আসামির জবানবন্দি রেকর্ড করেছেন। আবার ১৬৪ ধারার সেই জবানবন্দি ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক রেকর্ড হয়েছে। অথচ ৪৯ দিন পর মেয়েটি এসে বলল আমি তো মরিনি! আমি তো ইকবাল নামের একজনের সঙ্গে প্রেম করে সংসার করছি। তাহলে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি কীভাবে বলা হলো, গণধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে মেয়েটিকে শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে?’

এর আগে গত ২৫ আগস্ট ওই স্কুলছাত্রী ফিরে আসার ঘটনায় হাইকোর্টে একটি রিভিশন আবেদন করা হয়। হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঁচ আইনজীবীর পক্ষে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির এ আবেদনটি করেন।

পাঁচ আইনজীবী হলেন- মো. আসাদ উদ্দিন, মো. জোবায়েদুর রহমান, মো. আশরাফুল ইসলাম, মো. আল রেজা আমির এবং মো. মিসবাহ উদ্দিন।

রিভিশন আবেদনে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় করা মামলা এবং মামলা পরবর্তী প্রক্রিয়ার শুদ্ধতা, বৈধতা এবং যৌক্তিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এছাড়া ওই মামলার নথি তলবেরও আবেদন করা হয়। নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপার, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, মূল মামলার বাদী এবং আসামিদের বিবাদী করা হয়।

গত ২৪ আগস্ট ‘ধর্ষণের পর নদীতে লাশ ফেলে দেয়া স্কুলছাত্রী ৪৯ দিন পর জীবিত প্রত্যাবর্তন’ শিরোনামে দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরে সংবাদটি হাইকোর্টের নজরে আনেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। এরপর আদালত আইনজীবীকে লিখিতভাবে হাইকোর্টে আবেদন করতে বলেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৫ আগস্ট ওই ঘটনায় রিভিশন আবেদন দাখিল করা হয়।

পরে ২৬ আগস্ট এই আবেদনের শুনানির জন্য বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দিন নির্ধারণ করেন হাইকোর্ট। আজ শুনানি শেষে এ আদেশ দেন আদালত।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ পাক্কা রোড এলাকার স্কুলছাত্রী গত ৪ জুলাই নিখোঁজ হয়। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির পর ১৭ জুলাই সদর মডেল থানায় একটি জিডি করেন স্কুলছাত্রীর বাবা। এক মাস পর ৬ আগস্ট একই থানায় স্কুলছাত্রীর বাবা অপহরণ মামলা করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় বন্দর উপজেলার বুরুন্ডি খলিলনগর এলাকার আমজাদ হোসেনের ছেলে আব্দুল্লাহ (২২) ও তার বন্ধু বুরুন্ডি পশ্চিমপাড়া এলাকার সামসুদ্দিনের ছেলে রকিবকে (১৯)। তাদের ওই দিনই গ্রেফতার করা হয়। দুদিন পর গ্রেফতার করা হয় বন্দরের একরামপুর ইস্পাহানি এলাকার বাসিন্দা নৌকার মাঝি খলিলকে (৩৬)।

গত ৯ আগস্ট পুলিশ জানায়, স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেয় আসামিরা। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় এ ঘটনা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। অথচ ২৩ আগস্ট দুপুরে বন্দরের নবীগঞ্জ রেললাইন এলাকায় সুস্থ অবস্থায় পাওয়া যায় নিখোঁজ স্কুলছাত্রীকে। সে নিজে তার মাকে একটি দোকান থেকে কল করে চার হাজার টাকা চায়! বাবা-মা এতে অবাক হয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানান। পরে স্কুলছাত্রীকে নিয়ে তারা থানায় হাজির হন। তাদের সঙ্গে ছিল কিশোরীর স্বামী ইব্রাহিম। তাকে জীবিত অবস্থায় পাওয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পুলিশের তদন্ত ও আদালতে দেয়া জবানবন্দিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

এরপর ‘ধর্ষণের পর নদীতে লাশ ফেলে দেয়া স্কুলছাত্রীর ৪৯ দিন পর জীবিত প্রত্যাবর্তন’ শিরোনামে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সংযুক্ত করে মঙ্গলবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঁচ আইনজীবীর পক্ষে একটি রিভিশন দায়ের করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।

এফএইচ/এসআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]