কবির হোসেন মিজির গল্প
বুকভরা নীল কাগজ
শহরের পুরোনো ডাকঘরটা এখন প্রায় ভুলে যাওয়া স্মৃতির মতো। মোবাইল আর ইন্টারনেটের যুগে এখন আর কারো কাছে চিঠির কদর নেই। একসময় এই পোস্ট অফিসে কত মানুষের উপস্থিতি ছিল। কেউ চিঠি পাঠাতে আসতো, কেউ মানি অর্ডার তুলতে, কেউবা দূর দেশে থাকা প্রিয়জনের চিঠির খোঁজে ছুটে আসতো।
দেওয়ালের হলুদ রং অনেক আগেই উঠে গেছে, শ্যাওলা পড়েছে, ছাদের কোনে বাদুড় বাসা বেঁধেছে, জানালার গ্রিলে মরিচা পড়েছে। কিন্তু এখনো দুপুরে এক কোণে বসে থাকে একজন মানুষ। তার নাম রাহাত। বয়স তিরিশ ছুঁই ছুঁই। সে একজন স্কুলশিক্ষক। ক্লাস শেষে সবার চোখের আড়ালে সাইকেল চালিয়ে চলে আসে এই নির্জন ডাকঘরে। সঙ্গে থাকে একটা ছোট্ট কাপড়ের ব্যাগ, তার ভেতরে সাদা কাগজ আর কয়েকটা নীল খাম।
খামের ভেতরে সাদা পাতায় লেখা থাকে চিঠি। চিঠিগুলো সে কখনো পোস্ট করে না, শুধু ডাকঘরের টেবিলের ওপর বসে লিখে যায়।
ডাকঘরের চৌকিদার আব্দুল হাই প্রতিদিন দুপুরে তাকে দেখে অবাক হন। বয়স তার পঞ্চাশের ওপর, মাথায় পাকা চুল, হাতে লাঠি। প্রথম প্রথম অবাক হতো, ছেলেটা টেবিল-চেয়ার দখল করে বসে, চুপচাপ লিখে চলে, তারপর কাগজ ভাঁজ করে খামের ভেতরে ঢুকিয়ে রাখে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো, কখনো সেই খাম ডাকবাক্সে ফেলে না কেন?
একদিন আর কৌতূহল সামলাতে পারলো না আব্দুল হাই। সেদিন বিকেলে বাইরে কিছুটা বৃষ্টি হচ্ছিলো। ডাকঘরের ভেতর খোলা জানালা দিয়ে বাতাস ঢুকে কাগজগুলো উড়ছিল। রাহাত তাড়াহুড়ো করে কাগজগুলো ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
আব্দুল হাই এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘স্যার, প্রতিদিন দেখি আপনি লিখে যাচ্ছেন। খামের পর খাম ভর্তি করছেন। কিন্তু পোস্ট করেন না কেন?’
রাহাত কলম থামালো। কিছুটা চুপ করে থেকে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলো। তার চোখে অদ্ভুত এক শূন্যতা। তারপর মৃদু হেসে বলল, ‘যার কাছে লিখি, সে যদি পায়ও, হয়তো পড়বে না। তবুও লিখি। নিজের শান্তির জন্য।’
রাহাতের কথায় চৌকিদার হতভম্ব হয়ে গেল। ‘না মানে? চিঠি লেখা যদি কেবল নিজের জন্য হয়, তবে তো ডায়েরিতেও লিখে রাখতে পারেন!’
রাহাত নিচের দিকে তাকালো। কলম দিয়ে আবার শব্দ আঁকতে লাগলো। ‘ডায়েরি কেবল নিজেকে শোনায়। কিন্তু চিঠি, সব সময় কাউকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়। আমি যার জন্য লিখি, সে যদি আর কখনো ফিরে না আসে, তবুও যেন মনে হয় আমি প্রতিদিন তার সঙ্গে কথা বলছি।’
আব্দুল হাই আর কিছু বললো না। শুধু খেয়াল করলো, রাহাত খামের ওপর একটি নাম লিখে রেখেছে ‘ইশিতা’।
- আরও পড়ুন
কমলা রঙের রোদ
ডাকঘরটা দুপুরে প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। মানুষজন চিঠি পাঠায় না, সবাই এখন ফোনে কথা বলে, ই-মেইলে বার্তা পাঠায়। কিন্তু রাহাতের কলমে প্রতিদিন নতুন নতুন চিঠি জমতে থাকে। টেবিলের ওপর তার খামগুলো সাজানো থাকে। প্রতিটি খামের হাতের লেখা প্রায় একই রকম সুন্দর, অক্ষরগুলো গোল, পরিপাটি। খামের ভেতর সে লিখে যায় ছোট ছোট গল্প, নিজের মনের কথা, দিনের ঘটনা, কিংবা রাতের অস্থিরতা। কখনো লিখতে লিখতে হঠাৎ থেমে যায়। দূরের জানালা দিয়ে চেয়ে থাকে। তার চোখে যেন ভেসে ওঠে অতীতের কোনো ছবি।
ইশিতার কাছে চিঠি লেখার অভ্যাসটা তার গত ছয় বছর ধরে। তখন রাহাত কলেজে পড়তো। তার স্কুলজীবনের সহপাঠি ছিল ইশিতা। শহরের সবচেয়ে মেধাবী মেয়ে। সাদাসিধে পোশাক, গম্ভীর চাহনি, মায়া মাখা হাসি। ক্লাসে সবাই তাকে শ্রদ্ধা করতো। ইশিতার সঙ্গে রাহাতের সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বের মতো। তবে সেই বন্ধুত্বের আড়ালে চাপা পড়ে থাকতো অদ্ভুত এক টান। তারা কখনো সরাসরি একে অপরকে কিছু বলেনি। শুধু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যেতো, দুজনেই একে অপরের প্রতি দুর্বল।
ইশিতা ডাক্তার হতে চেয়েছিল আর রাহাত শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতো। একদিন লাইব্রেরির সিঁড়িতে বসে বই পড়তে পড়তে ইশিতা বলেছিল, ‘রাহাত, আমাদের স্বপ্নগুলো যদি দূরে হারিয়ে যায়? যদি আর একসাথে থাকা না হয়?’
রাহাত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল, ‘তাহলে অন্তত মনে রেখো, আমি সব সময় তোমার পাশে ছিলাম।’
কিন্তু সেই কথা কথাতেই রয়ে গেল। কয়েক মাসের মধ্যেই খবর এলো, ইশিতার বিয়ে ঠিক হয়েছে ঢাকার এক ধনী ব্যবসায়ীর সঙ্গে।
সেদিন রাতে বিছানায় বসে প্রথম চিঠি লিখেছিল রাহাত। ‘তুমি যদি কখনো ফিরে আসতে, আমি এই চিঠিটাই তোমাকে দিতাম।’ চিঠিটা খামে ভরে নিজের টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিল। তারপর থেকে প্রতিটি মাসে একটি করে চিঠি লিখতে শুরু করলো সে।
সেদিনের সেই কথাগুলো আজ অনেক মনে পড়ছে। ছয়টি বছর কেটে গেছে। এর মাঝে প্রায় সত্তরটা চিঠি জমে গেছে তার কাছে।
প্রতিদিন স্কুল থেকে এসে ডাকঘরে বসে সে। একসময় শহরের ব্যস্ত শহরের কোলাহল মিশে যায় নীরবতার গভীরে কিন্তু ডাকঘরের সেই কোণায় বসে থাকে একটি মানুষ আর তার নীল খামগুলো।
কখনো কখনো বৃষ্টির দুপুরে লিখতে লিখতে তার চোখ ভিজে ওঠে। কালির সঙ্গে মিশে যায় অশ্রুর দাগ। পোস্ট অফিসের চৌকিদার নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে দেখে। তার মনে হয়, এই যুবক আসলে সময়ের বাইরে বেঁচে আছে। সবাই যখন নতুন প্রযুক্তির যুগে ছুটছে, সে তখনও কলম-কালি-নীল খামের ভেতরে খুঁজছে তার প্রিয়জনকে।
একদিন বিকেলে আব্দুল হাই লক্ষ্য করলো, রাহাত খামের ভেতরে লিখতে লিখতে হঠাৎ থেমে গেছে। চোখ দুটি মুদে বসে আছে। তার ঠোঁটে যেন অদ্ভুত এক নাম বারবার ফিসফিস করে বলছে, ‘ইশিতা... ইশিতা...’
চৌকিদারের বুক কেঁপে উঠলো। মনে হলো, এত বছরের সঙ্গেও এই নামটাই রাহাতকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এইভাবেই কাটছে রাহাতের দিনগুলো। চিঠির ভেতরে ডুবে থেকে, অদৃশ্য এক মানুষের জন্য লিখতে লিখতে। কেউ জানে না, একদিন এই চিঠিগুলো সত্যিই কারও হাতে পৌঁছাবে কি না। কিন্তু রাহাতের তাতে কিছু আসে-যায় না। কারণ তার ভালোবাসা চিঠির মতোই, প্রেরকের হাতে লেখা, কিন্তু প্রাপকের অজানা।
- আরও পড়ুন
রক্তপলাশের ভোর
একদিন বিকেলে রাহাত টেবিলের পাশে বসে চিঠি লিখছিলো, কিন্তু আজ যেন তার হাতের কলমটা কেঁপে উঠছে। বারবার সে তাকাচ্ছে দরজার দিকে, যেন কেউ এসে দাঁড়াবে। দরজাটা ধীরে খুলে গেল। সাদা শাড়িতে ইশিতা ভেসে এলো, যেন ছয় বছরের আগের সেই কলেজের দিনের স্মৃতি হেঁটে এসেছে। চোখে ক্লান্তি, তবু সেই চেনা মায়া স্পষ্ট। রাহাতের কলম থেমে গেল।
আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘ইশিতা...’। তার গলা ভারী হয়ে এলো। ইশিতা থেমে দাঁড়ালো, তাকিয়ে রইলো রাহাতের দিকে।
‘রাহাত?’ শব্দটা যেন কাঁপা বাতাসে মিলিয়ে গেল।
দু’জনেই কিছু বলল না। ছয় বছরের জমে থাকা অনুভূতি হঠাৎ চোখের ভেতর ভেসে উঠলো।
রাহাত ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
‘তুমি... এখানে কেন?’
ইশিতা মৃদু হাসলো, চোখের ভেতর জল চিকচিক করছে।
‘আমি তোমার খোঁজে এসেছি রাহাত। ছয় বছর আগে আমার বিয়ে টেকেনি। বড় শহরের সেই জীবনটা আমি মানিয়ে নিতে পারিনি। সবকিছু ভেঙে গেলে একদিন ডাকঘরের ঠিকানায় তোমার পুরোনো চিঠি পেয়ে গেলাম। তখনই ঠিক করেছিলাম, যে হাত আমাকে প্রথমে লিখেছিল, তাকে একদিন খুঁজে পাবো।’
ইশিতার কথায় রাহাতের গলা শুকিয়ে এলো।
‘ছয় বছর ধরে আমি লিখেছি কিন্তু কোনো চিঠিই পাঠাইনি। শুধু আশা করতাম, তুমি কোনো একদিন ফিরে আসবে।’
ইশিতা হাত বাড়িয়ে দিলো।
‘আমি জানতাম, তাই কখনো ফোন করিনি। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শুধু ভাবতাম, তুমি কি এখনো লিখছো?’
রাহাত টেবিলের ওপর রাখা নীল খাম তুলে ধরলো।
‘দেখো, এইসব চিঠি শুধু তোমার জন্য।’
ইশিতা খামগুলোর দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেললো, চোখ ভিজে এলো।
‘ভাবিনি আজও আমার জন্য লেখা হবে।’
বাইরে বৃষ্টি শুরু হলো। ফোঁটা ফোঁটা শব্দ যেন তাদের বুকের ভেতরের সব কথা হয়ে ঝরছে। দু’জনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো, অথচ মনে হচ্ছিলো এতদিনের গল্প এক মুহূর্তে গলে যাচ্ছে।
রাহাত নরম কণ্ঠে বলল, ‘ইশিতা, শেষ চিঠি শেষ হয়েছে। আর লিখবো না, কারণ তুমি এসে গেছো।’
ইশিতা রাহাতের কাছে এসে কাঁধে হাত রাখলো। ‘তাহলে আজ থেকে আমরা আমাদের নতুন গল্প লিখবো রাহাত?’
রাহাত হাত বাড়িয়ে ইশিতার হাত ধরলো। ‘হ্যাঁ, এবার আমরা দু’জন মিলে লিখবো।’
জানালার বাইরে বৃষ্টি আর রোদ মিশে এক অদ্ভুত আলো তৈরি হলো ডাকঘরের ভেতরে। পুরোনো টেবিল, নীল খাম আর ছয় বছরের চিঠি, সবকিছু যেন নতুন এক জীবনের শুরু হয়ে রইলো।
এসইউ