রুদ্র-প্রচেতা : পর্ব ০৩

ড. রাজুব ভৌমিক
ড. রাজুব ভৌমিক ড. রাজুব ভৌমিক , কবি ও লেখক
প্রকাশিত: ০৫:০০ পিএম, ০৬ নভেম্বর ২০১৯

এই ধরিত্রীর সব তেরো-চৌদ্দ বয়সের বালকেরা যখন বসুমাতার বুকের ওপর উন্মাদ বানরের মত লাফিয়ে খেলাধুলা করিতে করিতে তাহাকে অতিষ্ঠ করিতেছিল; তখন আমি ব্যস্ত ছিলাম প্রচেতার ভাবনায়। তাই বলিয়া মাতা বসুমতি যে আমার উপর প্রচণ্ড রকমের খুশি সেই ভাবনা করা এখানে বেশ অন্যায় হইবে—কারণ কিছুদিন আগে আমিও আমার সমবয়সীদের সাথে বসুমাতার বুকে যে লঙ্কাকাণ্ড করেছিলুম, তাহার মর্ম শুধু একমাত্র বসুমাতা ও রাক্ষসরাজ রাবণই বলিতে পারিবেন। রাক্ষসরাজের সাথে আমার কোন ব্যক্তিগত সম্পর্ক নেই। কিন্তু ইনি যে বসুমাতার মত হনুমানের লঙ্কাকাণ্ডের একজন ভুক্তভোগী।

পূর্বে বসুমাতার বুকের ওপর আমি কী কাণ্ড না করিলাম। সেই ছোটবেলা হইতে পাগলা শীবের মত তাহার বুকে অন্তহীন নৃত্য থেকে শুরু করিয়া হনুমানের মত আগুন জ্বালানো—সবই আমি করিলাম। শীতকালের সন্ধ্যায় আমরা গ্রামের মাঠে ধানের খড় জোগাড় করিয়া মস্ত বড় একটি স্তূপ বানাইতাম—অতঃপর দেশলাইয়ের কাঠির সহিত তাহার ধ্বংসযজ্ঞ আরম্ভ করিতাম। খড়ের আগুনের তাপে তখন বেশ উষ্ণ লাগিত—কিন্তু সন্ধ্যার পরে ঘরে ঢুকিবার পর পিঠের উপর দুই-চারটা উত্তম-মাধ্যম সবসময় মিলিত। গ্রীষ্মকালে স্নান করিবার জন্য প্রতিদিন পুকুরের পাড়ে গাছটির উপরে উঠিতাম—তারপর পুকুরের মধ্যে লাফের পর লাফ দিতাম। অপরত্র, শীতকালের শেষান্তে যখন আমাদের বাড়ির সামনের পুকুরটির পানি-শূন্য হইত; তখন সবাই মিলে পুকুরের মাঝে গর্ত করিয়া বাড়ি বানাইতাম। আবার সেই মাটি দিয়া আমাদের বাড়ির পিছনে ছোট্ট ঘর বানাইতাম—দেবী দূর্গা, দেবী স্বরস্বতী ও দেবী কালীর মূর্তি সেখানে বানাইতাম। গ্রীষ্মকালে এক আমগাছ থেকে আরেক আমগাছে বানরের মত লাফিয়ে উঠিতাম—না মনের আনন্দে না, চুরি করিয়া আম খাইবার জন্য। আম আমার এতই পছন্দ ছিল যে, আমার সঙ্গে সবসময় একটি ছুরি ও লবণ-মরিচ মিশ্রিত একটি ছোট্ট পলিথিনের ব্যাগ সবসময়ই থাকিত।

তত্রাচ আজ গোধূলি লগ্নের পূর্বে ওসবের কিচ্ছুই করিলাম না। শুধু বিছানায় শুইয়া শুইয়া মোর সখির কথা ভাবিতে লাগিলাম। যখনই তাহার কথা ভাবিতাম; তখনই আমার কলিজা কেমন করিয়া যেন কাঁপিয়া উঠিত।

কলিজা কাঁপে মোর, সখির ভাবনায়,
কবজা করিল হিয়া, প্রাণ বুঝি যায়;
সখির স্পর্শন বিনে, স্বর্গরাজ্যে ভাসি,
বারবার স্বপনে, কাটাই পাশা-পাশি।
ভাঙ্গিলে সুখনিদ্রা, নয়ন ভাসে জলে,
ধরাতলে এতজ্বালা, দেখে না সকলে;
বসে আমি একা একা, স্বপ্নরাজ্য গড়ি,
মিশে আছে সখির-মায়া, নহে আনাড়ি।
প্রাণবধুঁরে পেলে দেখা, বলিব তারে,
প্রহরে তব বদন, দেখাইও মোরে;
বলিব স্বপ্নকথা, নিয়ে বুকে হিম্মত,
দিব বুকচিরে তারে, হোক কেয়ামত।
কলিজা কাঁপে ভেবে, হারাই যদি তারে;
তরজা প্রেম হারিয়ে, যাইব ওপারে।

তাহার সহিত আমার এই প্রেমকে কহিলাম তরজা প্রেম—যে প্রেমে পড়িবার মাত্র আমার হৃদয় গহীনে সুর, গান ও কবিতার আবির্ভাব হইল। পূর্বে বলিয়াছি বৈকুণ্ঠে যাইবার পূর্বে আমার ঠাকুরদাদা বহু তরজা অনুষ্ঠানে যোগ দিত। তরজা অনুষ্ঠান হইল লোকসঙ্গীতের সেই অনুষ্ঠান; যেখানে সদ্য-সদ্য গান রচনা করিয়া দুই দলের মধ্যে কবিগান হইত। আমার প্রচেতার সহিত ঠিক তেমনই এ বন্ধন। তাহার ভাবনায় আমি কবিতাতে ডুবাইয়া সারাটা দিন-রাত হাবুডুবু খাইতাম। এই অন্তর তাহার রচিত সৌন্দর্য কবিতা শুনিত আর তাহাকে হৃদয়-স্পর্শী কবিতা শুনাইবার চেষ্টা করিত। পার্থক্য শুধু এখানে এইটাই—এখানে কে জিতত বা হারত সেইটা মূল বিষয় ছিল না। শুধু সম্পর্ক ছিল পবিত্র কবিতার।

বিছানায় বসিয়া দুই চক্ষু মেলিয়া কেন জানি ভাবিতে লাগিলাম—আহা, যদি জানিতাম প্রচেতা এখন কী করিতেছে তাহলে কতই না ভালো হইত। প্রচেতা স্বর্গের দেবী সে—নিশ্চয়ই অনেক ভালো সন্ধ্যা কাটাইতেছে। তাহার কি কোন দুঃখ থাকিতে পারে? আমার শুধু যত দুঃখ—সে শুধু সখি বিনে। ঠাকুরদাদাকে একদিন একটি প্রশ্ন করেছিলাম—আচ্ছা দাদা, যখন শ্রীকৃষ্ণ এ ধরাতে জন্ম নিয়েছিল, মানুষ কি তখন জানিত তিনি যে ভগবান? তাহলে তো কেউ কৃষ্ণের সঙ্গ ছাড়িত না। ঠাকুরদাদা কহিলেন—কেউ জানিত কৃষ্ণ ভগবান, আবার কেউ তাকে শত্রু বলিয়াও জানিত, আবার কারও তাহার সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না। যাহার মন যেমন, সে ভাবিবে তেমন। তিনি আরও বলিলেন, ঈশ্বর বা দেবতাকে চিনিতে হইলে অসদৃশ মনের প্রয়োজন। সবাই দেবতাদের চিনিতে পারে না। ঠাকুরদাদার কথা স্মরণ করিয়া একটু স্বস্তি পাইলাম। কারণ মনে মনে প্রচেতাকে যে আমার হারাইবার অভিশঙ্কা তৈরি হইল। ভাবিলাম—যদি আমি জানিতে পারি যে মোর প্রচেতা সাক্ষাৎ এক দেবী, তাহলে নিশ্চয়ই অন্যেরাও জানিবে এবং তাহার হৃদয় ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করিবে। তখন আমার কী হইবে?

ছোটবেলা থেকে দেখিয়া আসিলাম, মানুষের কিভাবে দেবতা বা দেবীকে সারাদিন নিরলসভাবে পূজা করিয়া আসিতেছে কিন্তু কখনো কেউ দেবতা বা দেবীর সাক্ষাৎ পাইতে শুনিলাম না। একদা আমাদের ইংরেজীর শিক্ষক নজরুল স্যার আমাদের ক্লাসে একটি মাছ বিক্রেতার গল্প বলিলেন। সেই গল্পটি আজ তাই খুব মনে পড়িতেছে। তিনি কহিলেন, এক সন্ধ্যায় একজন মৎস্য বিক্রেতা একটি বড় মাছ নিয়া বাজারে বিক্রি করিতে আসিলেন। বড়সড় তরতাজা মাছ দেখিয়া সবাই মাছটি কিনিবার জন্য নানা দাম হাঁকিল কিন্তু যতবার মাছ বিক্রেতার কাছে ক্রেতারা দাম চাহিল; ততবার সে বেশি অর্থ লাভের আশায় মাছের দাম বৃদ্ধি করিল। মাছটির দর বিক্রেতা এত বৃদ্ধি করিল যে, একসময় ক্রেতারা শুধু মাছটির দিকে চাহিয়া থাকিত কিন্তু কোন দর কষাকষি করিত না। তেমনই বোধ হয় এই দেব-দেবীদের অবস্থা হইল। যেহেতু বহু মানুষ দিনের পর দিন এই দেব-দেবীদের পাইতে নানারকমের উপাসনা করিতেছে। তাই দিনদিন পুরোহিতের এবং গুরুদের মুখে দেব-দেবীদের সাধনা করিবার জন্য নতুন নতুন নিয়মাবলী শুনিতে পাই। উপরন্তু নানা ধর্মগ্রন্থে ঈশ্বর ও দেব-দেবীদের পাইবার জন্য হাজার হাজার নিয়মাবলী রহিয়াছে। এইসব নিয়মাবলী পড়িতে পড়িতে অনেকের সারাজীবন অন্ত হইয়া যায়। কিন্তু দেব-দেবীকে যথার্থভাবে চাহিবার সুযোগ তাহাদের হয় না। চিন্তায় পড়িলাম—তাহলে যে ব্যক্তি পড়িতে পারে না তাহার কী হইবে? তাই আমি ভাবিলাম—আমার প্রচেতা শুধু আমার একান্ত দেবী। সে আর কারও হইতে পারে না। তাহাকে আমি ভিন্ন কেউ পূজা করিতে পারিবে না। যদি তাহাকে সবাই জানিয়া তাহার পূজা করিতে চায়। তাহলে আমার কী হইবে? সে আর কখনো কাউকে ধরা দিবে না। মূর্তির দেব-দেবীর মত নীরবে তাহার কর্ম করিয়া যাইবে আর সারাজীবন তাহার প্রেম বিনে আমাকে মরুভূমির মাঝখানে এক তৃষ্ণার্তের মত ধুঁকে ধুঁকে মরিতে হইবে। এ সুযোগে অনেকে আবার তাহার বান্ধবীর ও পরিচিতদের কাছ থেকে তাহার সম্বন্ধে জানিয়া তাহাকে পাইবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করিবে—ঠিক যেমন দেব-দেবীকে পাইবার জন্য গুরুকূল এবং পুরোহিতের বাড়িতে যাইয়া মানুষ এখন ভীড় করে।

এসব ভাবিতে আমার কলিজাটি শীতকালে দাদা-দাদীর পায়ের মত কাঁপিয়া উঠিল। আমি বাবা ওসব কিছু করিতে পারিব না—মনে মনে তা ঠিক করলুম। প্রচেতা যে শুধু আমারই হইবে—সে কখনো অন্যের হইতে পারে না। তাহারে আমি ব্যতীত অন্য কেউ পূজিতে পারে না। মোর এই হৃদয়মন্দিরে তাহাকে বসিয়া শুধু আমি আপনমনে সবসময় তাহার উপাসনা করিয়া যাইব। সে শুধু মোর হৃদয়ের পুষ্প ও অঞ্জলি পাইবে। হৃদয়ের পুষ্প দিয়ে তাহার চরণ সাজাইব—সেই সাথে তাহাকে আমার অন্তরে পদার্পণ করিবার আমন্ত্রণ করিব।

বসিয়া সখিরে মোর হৃদয়মন্দিরে,
পূজিব ভালোবেসে আমি তাহারে,
করিব উপাসনা আপনমনে,
পাইতে সখির মন এই জীবনে,
হৃদয় পুষ্প-অঞ্জলি দিয়া,
নাও সখি আমার দাও তব হিয়া।

প্রদোষ-কাল হইল। মা কহিলেন—পড়িতে বসিবার জন্য। এতক্ষণ যে বিছানার উপরে আমি এই অসময়ে শুইয়াছিলাম ঘরের কেহ তাহা বিন্দুমাত্র লক্ষ্য করিল না। আর লক্ষ্য বা করিবে কেন? তেরো-চৌদ্দ বছর একটি বালকের মনে প্রেমের উদ্ভব এবং প্রকাণ্ড প্রেম ঝড় হইতেছে, তাহা কাহার তো চিন্তা করিবার কথা নয়। পড়াশুনা না করিয়া আমি বাড়ির সামনের পুকুর পাড়ে একটু বসিলাম। আমাদের পুকুরের পাড়টি যেন ঠিক এক স্বর্গের দরজা—এখানে কিছুক্ষণ বসিলে পুকুরের আলো-বাতাসের খেলায় মত্ত হইয়া যে কোন ব্যক্তির প্রাণ মুহূর্তের মধ্যে জুড়াইয়া শীতল হইয়া যাইবে। তাছাড়া পুকুর পাড়ে বসিলে আমি তাহার সান্নিধ্য যেন পাই। কারণ প্রচেতাদের শহরের বাসাটিও ঠিক পুকুরের উত্তর-পাড়ে অবস্থিত।

ভাবিয়া কহিলাম, ও পুকুর মশাই!
জান তুমি নিশ্চয়ই সবি
তাহার প্রেমে এখন আমি কবি
কেমনে তাহার দেখা আমি পাই?

যদি পার তুমি বলিও তাহারে
ভাবি সর্বক্ষণ তারি বিনে আহারে
না কাটে দীর্ঘদিন—দীর্ঘরাত
তাহার প্রেমে মোর হিয়া কুপোকাত।

যখনই কভু বইত প্রেমঝড় মনে, আসিতাম দৌড়ে এসে সমানে, পুকুর পাড়ের নিস্তব্ধতায়, তাহার দর্শন বিনে আমি অসহায়। আজ সন্ধ্যায় বহুক্ষণ ধরিয়া আমাদের পুকুর পাড়ে বসিয়াছিলাম। কিন্তু মোর হৃদয়ের ঝড় ইহার স্বর্গীয় শীতল বাতাসেও শান্ত হইল না। রাত্রিবেলায় আমাদের পুকুর-পাড়ে আকাশি গাছের চিকন ডালের ভিতর দিয়ে দেখা যায় মহান সেই চাঁদমামা। কেন জানি ঐ রাতে চাঁদ মামা আকাশি গাছের পাতার আড়ালে লুকোচুরি খেলিতেছিল। আমি তৎকালে বুঝিতে পারিলাম, কেন চাঁদ মামা সেই রাতে আমার সাথে লুকোচুরি খেলেছিল। চাঁদ মামা নিশ্চয়ই আমার করুণ অবস্থা দেখিয়াছিল—ভেবেছিল যে ভাগিনার এখন প্রচেতাহীন দুরবস্থা চলিতেছে। তিনি হয়ত অনুমান করিতে পারিয়াছিলেন যে, আমি তাহার কাছে ভাগিনা হিসেবে কোন আবদারটি করিতে পারি। তাই চাঁদ মামা আমার সে আবদার মিটানোর পরিবর্তে আমার সাথে লুকোচুরি খেলিতেছিল।

এদিকে মা ডাকিতেছে—‘রুদ্র তুই অন্ধকারে পুকুরের সামনে কী করছিস?’
‘কিছু না মা’ এই বলিয়া সোজা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিলাম।
একটু পর হাতে দশম শ্রেণীর বাংলার পাঠ্যবই নিয়া পড়িতে বসিলাম। তৎসত্ত্বেও পড়াতে মনোযোগ আমার নাই।

এভাবে মাস দুয়েক পার হইয়া গেল। অকস্মাৎ একদিন সে সুদূর আমেরিকা হইতে জন্মদাতার ফোন আসিল। জন্মদাতা যুক্তরাষ্ট্রে যাইবার পর প্রতি দুই বা তিন মাস অন্তর পাশের বাড়ির ছেলে নিকুম্বের কর্মশালাতে ফোন দিত—এরপর নিকুম্ব তাহার ফোনটি ব্যবহার করিবার জন্য আমাদের বাড়িতে আনিত। এভাবেই মাতাশ্রী জন্মদাতার সহিত আলাপ করিত। জন্মদাতা থাকিতেন যুক্তরাষ্টের নিউইয়র্ক শহরে। আমাদের গ্রামে তখন একটি মুঠোফোন ছিল—সেটি ছিল ঐ নিকুম্বেরই। প্রত্যেক মিনিটের জন্য নিকুম্ব প্রায় দেড়শ’ টাকা নিত—উপরন্তু নেটওয়ার্কের শক্তিহীনতা ছিল। আমেরিকা হইতে জন্মদাতার বিবৃতি ও নীতি-বচন পরিষ্কার শোনা যাইত না। তাই ঐদিন তিনি মাতাশ্রীকে আদেশ করিলেন আগামীকাল বসুরহাটে যাইবার জন্য—এবং শহরের একটি ফোনের বিপণীতে যাইয়া তাহাকে ফোন দিবার জন্য। মাতার নিকট এই সংবাদ শুনিয়া আনন্দে লাফাইতেছিলাম। হিয়াতে যেন এক বিশাল আনন্দের উচ্চ জোয়ার আসিল। বহুদিন হইল আমি আমার প্রাণের মানুষটিকে দেখিতে পারিনি। আগামীকাল প্রচেতাকে আরেকবার দেখিতে পারিব বলে আনন্দে আমার মন জুতা বিনে নাচিতেছিল—আমার মাথার ভিতরে যেন লক্ষীপূজার আতশবাজি ফুটিতেছিল।

একদিন বর্ষাকালে অকস্মাৎ একটি কুনোব্যাঙ আমার মোজার ভিতরে প্রবেশ করিয়াছিল—অতঃপর কুনোব্যাঙটি মোজার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য যে লাফালাফি করিয়াছিল আজ আমার মন প্রচেতাকে আগামীকাল দেখিবে বলে ঠিক তেমনটি লাফালাফি করিতেছে। সারারাতে তাই আমার ঘুম হয়নি। অরুণোদয়ের পূর্বেই বিছানা হইতে উঠিয়া পড়িলাম। মাতাশ্রী কিছুক্ষণ পর ঘুম থেকে উঠিয়া প্রাতঃকর্ম সেরে নিল। প্রাতঃকালীন নাস্তা খাওয়া শেষ করিয়া কবীরের রিকশায় চড়ে বসুরহাটের উদ্দেশে মা, কনিষ্ঠ সহোদরা জলি এবং আমি চলিলাম।

বেলা তখন গনাগনতি নয়টা বাজে—আমাদের রিকশাটি প্রচেতাদের বাসার সামান্য দূরে থামিল। আর একটু হাঁটিলে জ্যাঠা মশাইদের বাসাটি। তাহারে দেখিব বলিয়া শ্যাম্পেন বোতলের ছিপির মত আমার মন ফাটিয়া যাইতে উদ্যত হইল। রিকশা হইতে আমরা সবাই নামিলাম। মা ও কনিষ্ঠ সহোদরা জলি হাঁটা শুরু করিল। আমি ইচ্ছে করে ছিলাম সবার পিছনে—ধীরে ধীরে হাঁটিতেছি আর প্রচেতাদের জানালার দিকে চোরের মত বারবার তাকাইতেছি। না আর্থিক কোন লোভ-লালসা আমার নেই—অত সাধারণ চোর আমি নই। মন চুরি করিতে চাই—যদি তাহার দেখা পাই। চলিতে চলিতে তাহাদের বাসার সামনের রাস্তাটি অতিক্রম করিলাম কিন্তু প্রিয় প্রচেতাদের জানালা খোলা থাকা স্বত্তেও তাহার বদন একটুখানির জন্যও দেখিলাম না। মোর হৃদয়খানি যেন অতি দুঃখে আকাশের তারা হইয়া আকাশ থেকে পড়িল। আশাহত তবু হইলাম না। এখনো তো অনেক সময় আছে। আমার চাই প্রচেতাকে শুধু একটি মুহূর্ত দেখিতে—তাহলেই আমার প্রাণ নরকের জ্বালা হইতে কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি পাইবে। আবার মনে পড়িল বৈকুণ্ঠনিবাসী আমার ঠাকুরদাদার কথা। তিনি একদিন বলিলেন, আমাদের গ্রামের উনার এক বন্ধুর করুণ মৃত্যু-কাহিনী। উনার সেই বন্ধু নাকি মৃত্যুশয্যাতে প্রায় চল্লিশ দিন কিছু না খাইয়া ছিল। ভদ্রলোকটি নাকি অপেক্ষা করিতেছিল তার একমাত্র ছেলেসন্তান কলকাতা থেকে ফিরিবার জন্য—এবং একমাত্র সন্তানের হাতে জল পান করিয়া মৃত্যুবরণ করিবার জন্য। প্রায় চল্লিশ দিন পর যখন মৃত্যুপথযাত্রী ভদ্রলোকের একমাত্র ছেলেসন্তান কলকাতা থেকে আসিয়া উনার মুখে এক চামচ জল দেন; ঠিক তখনই উনার মৃত্যু হয়। আজ আমারও যে সে অবস্থা। আমার পরান যেন তাহার দর্শন বিনে মৃত্যুশয্যাসায়ী—যদি শুধু একবার তাহারে আবার দেখিতাম। তাহলে এই পরানটি আরও কয়েকটা দিন বাঁচিত।

জ্যাঠা মশাইদের বাসার ভিতর আমরা প্রবেশ করিলাম। কিন্তু এই মনে কত দুঃখ তাহা কাউকে দেখিবার নয়। বুকটা যেন গ্রীষ্মকালের মাঠের মত ফেটে চৌচির হইয়াছে। কিছু না বলিয়া চুপ করে জ্যাঠা মশাইদের বাসার ভিতর একটি চেয়ারে বসিয়া পড়িলাম। মা জেঠীমার সহিত আলাপ করিতেছেন। কিছুক্ষণ জ্যাঠা মশাইদের বাসাতে বসিয়া মা বলিলেন ফোনের বিপণীতে যাইতে হবে। আবার চলিলাম—আবার মনের ভিতর তাহাকে দেখিবার ছোট্ট আশা জাগ্রত হইল। ধীরে ধীরে প্রচেতাদের বাসার দিকে অগ্রসর হইলাম। এবারও প্রচেতাদের জানালা খোলা দেখিলাম—এবং দরজাটি আধো খোলা ছিল। প্রচেতাদের বাসার সামনে রাস্তার উপর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে প্রাণ সখিকে একটু দেখিবার চেষ্টা করিলাম—কিন্তু তাহারে দেখিলাম না।

সখির দর্শন বিনে হিয়া নীল আকাশের তলে
হইল কাল পাথর এই কলি কালে
বিষাদে কাঁদে মন
যেভাবে কবরে হয় বৃষ্টির নাচন
খোলা আকাশে যেমন হঠাৎ ধুলিকণা
বিষাদ মন মোর কিছু মানে না
শত দীর্ঘশ্বাস ক্ষত করে বুক না মানে কোন আইন
প্রেমকাব্যে রচিত আকুলতা ভরা শেষ লাইন।

নিস্তরজ, আমি তবুও আশাহত হইলাম না—কারণ তাহারে দেখিবার জন্য আজ যে আরও সুযোগ আছে। মাকে নিয়ে ফোনের বিপণীতে প্রবেশ করিলাম। ঘণ্টাখানেক আমরা সবাই মিলে জন্মদাতার সাথে ফোনে কথা বলিলাম। দ্বিপ্রহর হইল—মা বলিলেন, খাবারের দোকান থেকে কিছু খেয়ে বাড়িতে চলে যাইতে হবে। আমি আমার কান দুটিকে বিশ্বাস করিতে পারছিলাম না। মায়ের কথা শুনিয়া মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। মাতাকে বারবার বলিয়াছি, ‘জ্যাঠাদের বাসায় যাইব—ওখানে খাবো।’ প্রত্যেকবার মা বললেন, তিনি আজ আর জ্যাঠা মশাইদের বাসায় যাইবেন না—সরাসরি এখান হইতে গ্রামের বাড়িতে চলিয়া যাইবে। পরে জানিতে পারি, জেঠীমার সাথে কোন কি এক বিষয়ে মাতার দ্বিমত বা ঝগড়া হইয়াছিল। তাই মা ঐদিন জ্যাঠা মশাইদের বাসায় সেদিন পুনরায় যাইতে চায়নি।

অগত্যা কী আর করা? খাবারের দোকান থেকে বেরিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাইবার জন্য সবাই মিলে একটি রিক্শায় উঠিলাম। আমি তেমন কিছুই খাইনি—শরীরের ক্ষুধা মনের ক্ষুধার কাছে তুচ্ছ। তাই সেদিন হইতে আজ পর্যন্ত আমার শরীরের ওজন কমিতেছে। সেদিন হইতে এই শরীরকে সবসময় ততটুকু দিয়েছি; যতটুকু ছিল প্রয়োজন—তাহারে দেখিবার।

চলবে...

এসইউ/পিআর