রুদ্র-প্রচেতা : পর্ব ১১

ড. রাজুব ভৌমিক
ড. রাজুব ভৌমিক ড. রাজুব ভৌমিক , কবি ও লেখক
প্রকাশিত: ০১:৩১ পিএম, ২০ মে ২০২০

সাজুদের দোকানে প্রদোষকালে আমি চা পান করিতেছিলাম। অকস্মাৎ প্রচেতাদের বাসা হইতে সজোরে কার যেন কান্নার করুণ শব্দ ভাসিয়া আসিতেছিল। বক্ষে যেন কেউ একজন ভীমের ঘুষি মারিল—সে অনুভূত হইল। কিছু না ভাবিয়া প্রচেতাদের ঘরের সামনে পর্যন্ত হাঁটিয়া যাইলাম আর দেখিলাম প্রচেতার মাতা কান্তা বিলাপ করিয়া কাঁদিতেছিল। কেন তিনি বিলাপ করিয়া কাঁদিতেছিলেন তা প্রথমে বুঝিতে পারিলাম না। পাড়ার একজনকে জিজ্ঞেস করিবার পর পরক্ষণে জানিতে পারিলাম যে, প্রচেতার বাবা বিশ্ববাবু গাড়ি দুর্ঘটনায় এই ধরা ত্যাগ করিয়াছে। এমন সংবাদ শুনিয়া মাথায় যেন বাজ পড়িল। মনটা হঠাৎ ভীষণ খারাপ হইয়া গেল। মুহূর্তেই পাড়ার সব মানুষ তাহাদিগের বাসার সামনে একত্রিত হইয়া গেল। সবার ভিড়ে আমি শুধু কয়েকজনের কান্নার শব্দ শুনিতে পাইতেছিলাম কিন্তু প্রচেতাকে দেখিতেছিলাম না। ভাবিলাম প্রচেতা না জানি এখন কত কষ্ট পাইতেছে। তাহাকে দেখিবার প্রচণ্ড বাসনা জাগিল। কে জানে হয়ত পরিচিত মুখ দেখিলে তাহার মনটি সামান্য ভালো হইয়া যাইতে পারে। অনেক চেষ্টার পর আমি প্রচেতাকে দূর হইতে দেখিতে পারিলাম। প্রচেতা তাহাদিগের ঘরের এক কোণে দাঁড়াইয়া কাঁদিতেছে। কিন্তু তাহার কান্নার কোন শব্দ হইতেছিল না। পাড়ার মাস্টার অশোকবাবু অশ্বকণ্ঠে কহিতেছিলেন, ‘এই মাইয়াটা ভালো করিয়া কান্না করিতে পারিতেছে না। পরে যে ভীষণ কষ্ট হইবে। কান রে মা—তুই ভালো করিয়া কান।’

সেদিন আমি বুঝিতে পারিলাম না, কেন পাড়ার মাস্টার মশাই প্রচেতাকে ভালো করিয়া কাঁদিতে বলিয়াছেন। এখন সব বুঝিতে পারিলাম। মানুষের জীবনে আসা দুঃখগুলো নৌকার তলায় ফুটার মত—মাঝে মাঝে এই ছিদ্রগুলো কালেভদ্রে ফুটিয়া মাঝির জ্বালাতন বাড়ায়। নৌকার তলায় ছোট ছোট ছিদ্রগুলো দিয়া পানি প্রবেশ করিলে সহজে মেরামত করা যায়। মেরামত করিলেও দাগ কিন্তু চিরতরে থাকিয়া যায়। তবে নৌকার কর্মযাত্রা অব্যাহত থাকে। কিন্তু নৌকার তলার ছিদ্র যদি একটু বড় হয় সেগুলো দিয়ে প্রবল গতিতে পানি ঢুকিয়া পড়ে। আর নৌকার মাঝিকে ছিদ্র দিয়া পানিগুলোকে নিয়মিত কোন একটা পাত্রের মাধ্যমে সেচে নিতে হয়। তা না হইলে সেই নৌকাটি একসময় ডুবিয়া যায়। তেমনি আমাদের জীবনে যখন ছোট ছোট দুর্ঘটনা আসে, সেগুলো সহজেই ভুলে থাকা যায় কিন্তু আমাদের স্মৃতিতে একটি দাগের মত জমা হইয়া রয়। অন্যদিকে জীবনের বড় বড় দুর্ঘটনাগুলো নৌকার তলায় হওয়া বড় ছিদ্রের মত আমাদের প্রতিনিয়ত ডুবাইতে থাকে। তাই এই দুঃখের জমানো ব্যথা নৌকায় প্রবেশ করা পানির মত কান্না করিয়ে সেচ করিয়া নিতে হয়। তাহা না হইলে সেই দুঃখের পানিতে আমাদেরকে ডুবিয়া মরিতে হয়।

এমন এক দুর্বিষহ রাত—তবু তাহারে প্রাণ-ভরিয়া দেখিতে মন চায়। প্রচেতা দাঁড়াইয়া কাঁদিতেছে আর আমি দূর হইতে তাহারে মনের মাধুরী মিশিয়া দেখিতেছিলাম। এতেই আমার সংক্ষিপ্ত খারাপ মনটি মুহূর্তেই ভালো হইয়া গেল। কেমন এক পিশাচের মত প্রচেতার এই দুঃখের মাঝে এক অজানা সুখ অনুভব করিলাম। তবে এইটা জানি যে, সুখটি তাহার পিতার মৃত্যুর জন্য নহে—সুখটি হয়ত ছিল প্রচেতাকে অবাধ এবং পুরাদস্তুরভাবে দেখিতে পারার সুখ। হঠাৎ সাজু আমাকে কোন এক অদৃশ্য কারণে আমার ডান হাত ধরিয়া টানিতেছিল; তখনি প্রচেতা আমাকে দূর হইতে দেখিতে পায়। হয়ত সে অবাক হয়েছে আমার কষ্টশূন্য মুখটিকে দেখিয়া। হয়ত সে ভাবিয়াছে আমার জন্ম বুঝি কোন দৈত্যকূলে হইল। হয়ত সে আমাকে দেখিতে পারেনি কিন্তু সবি ছিল আমার কল্পনা। আমি সেই নিশিতে বিন্দুমাত্র নিদ্রা আনিতে পারিনি। বারবার প্রচেতার কষ্টের কথা ভাবিয়া দুই নয়নের জলে বালিশ দুটো ভিজিল। আবার মাঝে মাঝে তাহারে নিয়ে আমাদিগের ভবিষ্যৎ নিয়া ভাবিতেছিলাম। ইস—কেমন স্বার্থপরই না ছিলাম।

সকালবেলা জানিতে পারিলাম, প্রচেতাদের সবাই মিলিয়া তাহার পিতার লাশ নিয়া তাহাদিগের গ্রামের বাড়িতে গিয়াছে। আমি পূর্বে কখনো প্রচেতাদের গ্রামের বাড়িতে যাইনি। কেন জানি সেদিন প্রচেতাদের গ্রামের বাড়িতে যাইতে বড্ড ইচ্ছে করিতেছিল। এমন দুর্দিনে প্রচেতাকে একলা কিভাবে থাকিতে দেই? পূর্বেই জানিতাম সাজুদের গ্রামের বাড়ির পাশের গ্রামেই প্রচেতাদের বাড়ি। তাই আমি সাজুদের দোকানে আসিলাম। সাজুকে কোনমতে আমাকে প্রচেতাদের গ্রামের বাড়িতে যাইবার জন্য রাজী করাইতে সমর্থ হইলাম। অতঃপর সাজুদের দোকানের সামনে একটি রিকশায় উঠিয়া আমাদের যাত্রা শুরু করিলাম। প্রায় আধ ঘণ্টা অতিবাহিত হইল—এবং অবশেষে আমরা প্রচেতাদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছলাম। রিকশা হইতে নামিবার পর সাজু আমাকে প্রচেতাদের ঘর, পুকুরের ঘাট, শৌচাগার, নলকূপসহ যাহা সে সামনে দেখিতে পাইল তাহার সর্ব-বৃত্তান্ত বলিতে লাগিল। যদিও আমি দূর হইতে প্রচেতাদের বাড়ি হইতে বিলাপের কান্না শুনিতে পারছিলাম—কিন্তু কান্নার শব্দে আমার মনোযোগ বিন্দুমাত্র ছিল না। আমি প্রচেতাদের পুকুরে কঙ্কালসার ঘাটটি দেখিয়া ভাবিলাম এই সে পূর্ণস্থান যেথায় আমার প্রচেতা প্রতিদিন স্নান করিত। ধন্য এই পুকুর-ঘাট—প্রচেতার স্পর্শ পাইল যে প্রতিদিন। তাহাদিগের নলকূপের হাতটি দেখিয়া কেন জানি মনে মনে বেশ হিংসে হইল। অতঃপর তাহাদিগের বাড়ির দিকে নজর পড়িতেই ভাবিলাম—ছোট্ট এই ঘরটিতে না জানি কত স্বর্গের সুখ বিদ্যমান। পায়ে হাঁটিয়া একটু সামনে অগ্রসর হইবার পর প্রচেতার বাবার মৃতদেহটি মাটির উপরে একটি বিছানার উপর দেখিতে পাইলাম। পাশে প্রচেতা দাঁড়াইয়া শব্দহীন কান্না করিতেছিল। কিছুক্ষণ আমি নিরবে দাঁড়াইয়া প্রচেতাকে কাঁদিতে দেখিলাম। মনটা তখন ভীষণ খারাপ হইয়া গেল—এবং আমার নয়নের জল টলমল করিতেছিল। তখন সাজুকে কহিলাম—‘চল সাজু, আমাদের দেরী হইয়া যাইতেছে।’ প্রচেতাকে এইভাবে ক্রন্দনরত অবস্থায় দেখিবার সাধ্য আমার নাই। তাই নিরবে আমি প্রস্থান করিলাম। বক্ষের ভিতর দুঃখে আমার কলিজা যেন দুইভাগ হইতে উপক্রম। এত কষ্ট আর সহ্য হইতেছিল না।

এইভাবে বেশ কয়েকদিন অতিবাহিত হইয়া গেল। আমাদের পাড়ার সবার সাথে আমার বেশ ভাব ছিল। তবে আমার সমবয়সীরদের সাথে যতই না আমার ভাব ছিল, তার চেয়ে বয়স্কদের মধ্যে আমার অধিক ভাব ছিল। প্রতিদিন চায়ের দোকানে পাড়ার বয়স্কদের সাথে আড্ডা জমাইতাম। তাদের আমি যতটুকু সম্ভব সম্মান করিতাম—এবং বিনিময়ে তাহারাও আমায় বেশ স্নেহ করিত। কিছুদিনের মধ্যে আমাদের পাড়ায় কর্মকার দাদার সাথে আমার বেশ খাতির হয়। তিনি নামে কর্মকার হইলেও কিন্তু পেশায় একটি কাপড়ের দোকান চালাইত। তিনি বয়সে আমার পিতার সমতুল্য—কিন্তু আমার সাথে সবসময় বন্ধুসুলভ আচরণ করিত। তাহার পরিবারের সবার সাথে আমার বেশ ভাব ছিল। সবাই আমাকে অনেক স্নেহ করিত। একদিন কর্মকার দাদার সাথে তাহাদিগের বাসার সামনে দাঁড়াইয়া গল্প করিতেছিলাম। অনেকক্ষণ গল্প করিবার পর হঠাৎ আমার এবং প্রচেতার প্রেম উনাকে বিস্তারিত কহিলাম। তিনি আমাকে বেশ সমর্থন করিলেন—এবং প্রতিদানে তাহার জীবনের ব্যর্থ ভালোবাসার ঘটনাও বিস্তারিত বলিলেন। তিনি আমাকে প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে বিস্তর উপদেশও দিলেন। তিনি কহিলেন, ‘রুদ্র—এখন তোর সামনে এইচএসসি পরীক্ষা। পরীক্ষাতে কেমনে ভালো করবি তাতে মনোযোগ দিস। প্রচেতা তো চলে যাচ্ছে না। আর আমরা তো সবাই আছি।’ আমার এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে কোন চিন্তা নেই বললেই চলে। পড়ার টেবিলে বসিলেই প্রচেতার কথা মনে পড়িত—আর অমনি তাহাকে নিয়া স্বপ্নের রাজ্যে চলিয়া যাইতাম। আমি জানিতাম এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করিতে পারিব না। কারণ আমি কলেজে নিয়মিত যাইতাম না আবার বাসায়ও তেমন পড়িতাম না।

এদিকে সামনে বাংলা নববর্ষ—এবং এইচএসসি পরীক্ষা। পরীক্ষার জন্য আমার প্রস্তুতি তেমন ভালো না। সারাদিন প্রচেতার ভাবনায় আমার দিন গত হইত। পূর্বের মত প্রচেতাকে এখন আর প্রতিদিন দেখা সম্ভব হয় না। আমার কাছে প্রচেতার কম্পিউটার শিক্ষাপ্রদান বহুকাল আগেই সম্পন্ন হয়। কম্পিউটার শেখানোর পুরো সময়গুলোতে আমাদের মাঝে কোন প্রকার ভাবের আদান-প্রদানও হয়নি। আমি এখনো জানিতে পারিলাম না যে, প্রচেতা আমাকে আদৌ ভালোবাসে কি-না। তাহার মুখ থেকে ‘না’ শোনার ভয়ে কোনদিন তাহাকে জিজ্ঞেস করিবার সাহসও পাইলাম না।

সে বাল্যকাল হইতে আমি শিস দিয়ে গান করতে খুবই পছন্দ করিতাম। নিশিরাতে বাজার হইতে আমাদের বাসায় যাইবার সময় শিস দিয়ে কত প্রেমের গান গাইতাম। প্রচেতাদের বাসার সামনে দিয়া যাইবার সময় সে শিস যেন গভীর আবেগে ভরিয়া যাইত। শিস দিয়া প্রচেতাকে আমার প্রেমের বার্তা শুনাইতে চেষ্টা করিতাম। আমাদের সমাজে শিস দেওয়া একরকমের অপরাধই ছিল। কেউ শিস দিলে তাহাকে সমাজ তিরস্কার করিয়া খারাপ চরিত্রের তকমা লাগাইত। তাহা জানিবার পরেও আমি শিস দিতাম—কারণ তাহার হৃদয় কোণে পৌঁছার জন্য এই অপ্রত্যাশিত শব্দ তরঙ্গই আমার একমাত্র ভরসা ছিল। পাড়ার সবাই আমাকে বেশ ভদ্র এবং মার্জিত ছেলে বলিয়া জানিত। প্রচেতাকে খুব ভালো মেয়ে হিসেবে সবাই জানিত। একদিন দূর হইতে কর্মকার দাদার মুখে শুনিলাম, ‘এই পাড়াতে প্রচেতার মত ভালো মেয়ে একটাও নেই—এবং রুদ্রের মত ভালো ছেলে এখন দেখাই যায় না।’ তথাপি আমি তাহাকে আমার ভালোবাসার বার্তা পৌঁছাইতে শিস দিতাম। যদিও জানিতাম প্রচেতা ভাবিতেছে হয়ত পাড়ার কোন এক অভদ্র ছেলে হয়ত শিস দিতেছে। তাহা জানিবার পরেও শিস দিয়ে তাহাকে আমার মনে কথা খুলিয়া বলিতাম। তাতে হয়ত একটু মানসিক প্রশান্তি মিলিত।

প্রচেতা সারাদিন তাহাদিগের ঘরের মধ্যে থাকিত—এবং বিনে প্রয়োজনে তাহাদিগের বাসা ছাড়িয়া বাহির হইত না। মাঝে মাঝে তাহাদিগের সকালের বাজার করিয়া দিই কিন্তু অধিকাংশ সময় তাহার সাথে এই দু’নয়নের মিলন হইত না। ভাবিতাম প্রচেতা কি আমায় কোন কারণে অবজ্ঞা করিতেছে? আবার ভাবিতাম সে আমাকে অবজ্ঞাই বা করিবে কেন? প্রচেতার ভ্রাতা সজলের সাথে আমার নিত্য আড্ডা চলিত। তিনি মাঝে মধ্যে প্রচেতার নানা গল্প বলিত। সেই গল্পগুলো আমি মন্ত্রমুগ্ধ হইয়া শুনিতাম। প্রচেতাকে তিনি আদর করিয়া ‘মনি’ ডাকিত। আমাদের বহুদিনের বন্ধুত্বে সজল দাদাকে কখনোই অনুমান করিতে দেইনি যে, আমি প্রচেতাকে ভালোবাসিতাম। একদিন সজল দাদাসহ স্কুলের মাঠে ঘাসের উপর বসিয়া নানা বিষয়ে গল্প করিতেছিলাম। তিনি দর্শনতত্ত্ব এবং সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করিতে পছন্দ করিতেন—আর আমি তাহার কথাগুলো বুঝিবার চেষ্টা করিতাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা বা উপন্যাসগুলো তাহার প্রিয় ছিল। তিনি সুযোগ পেলেই রবীন্দ্রসাগরে হনুমানের মত বিশাল একলাফ দিয়া ডুব দিতেন এবং সাথে আমাকেও টানিয়া ডুবানোর চেষ্টা করিতেন। রবীন্দ্রসাগরের মর্ম তখন বুঝিতাম না। তাই অযথা আমার নাকে-মুখে সে সাগরের জল ঢুকিত। এতে আমার মস্তিষ্কের ব্যথাটি লাফাইয়া উঠিত। সেদিন তিনি আমার মস্তিষ্কের ব্যথা বুঝিতে পারিয়া কিছুক্ষণ পর শিস দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করিতেছিলেন। তবে তিনি ভালোভাবে শিস দিতে পারিতেছিলেন না। তিনি আমাকে শিস দেওয়ার জন্য কহিলেন। আমিও শিস দিতে লাগিলাম। আমার শিস শুনিয়া তিনি কহিলেন, ‘রুদ্র—তুই তো দারুণ শিস দিতে জানিস। আমি যদি তোর মত শিস দিতে পারিতাম তাহলে কত মজাই না হইত।’ কিছুক্ষণ পর তিনি আবার কহিলেন, ‘তাহলে তুই সে ব্যক্তি যে প্রতিরাতে পাড়াতে শিস দেয়? এদিকে আমরা একরাতে ঘরে বসিয়া সবাই মিলে ভাবিতেছিলাম, কে এত সুন্দর করিয়া শিস দেয়। এখন বুঝিতে পারছি—এটা তোরই কাণ্ড।’ আমি খানিকটা হতভম্ব হইয়া গেলাম। তৎক্ষণাৎ সজল দাদাকে কী বলিব তাহা বুঝিতে পারিলাম না। উনি যদি আমাকে খারাপ ছেলে হিসেবে ভেবে নেয়—বা আমাকে এবং প্রচেতাকে নিয়ে কোনভাবে সন্দেহ করে? তবে সজল দাদার ভাব দেখিয়া বুঝিতে পারিলাম উনি এসবের কিছুই চিন্তা করিতেছিলেন না। তাই আমি কহিলাম, ‘দাদা—আমি শিস দিতে খুব পছন্দ করি কিন্তু সবার সমালোচনার ভয়ে শিস তেমন দেই না। লুকিয়ে রাতে সবাই ঘুমালে শিস দেওয়ার চেষ্টা করি। যাতে মানুষ আমাকে খারাপ কহিতে না পারে।’ আমার কথা শুনিয়া দাদা মুগ্ধ হইয়া কহিলেন, ‘ওদের কথা চিন্তা করিস নে। তোর মন চাইলে শিস দিবি।’ মনে মনে আমি ভাবিলাম—যাক, বড় একটি বিপদ হইতে রক্ষে পাইলাম। একদিকে দাদা আমাকে শিস দেওয়ার জন্য উৎসাহ দিল—এবং অন্যদিকে আমি এটা জানিতাম যে, ভবিষ্যতে যখন আমি শিস দিব; তখন দাদা অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রচেতাসহ তাদের বাসার সবাইকে বলিয়া দিবে যে, আমি শিস দিতেছি। তাহলে এখন থেকে প্রচেতা আমার শিসের কথা জানিবে—তা ভাবিয়া মম হৃদয়ে আনন্দের জোয়ার আসিল। আমার ধারণাটি সত্যি হইল। কিছুদিন পর প্রচেতার মাসি মুন্নি দিদি আমাকে ডাকিয়া নিশিতে আমার শিস দেওয়ার প্রশংসা করিলেন।

প্রায় এক সপ্তাহ হইয়া গেল আমি প্রচেতাকে একটিবারের জন্যও দেখিনি। তাই মনটা ভীষণ খারাপ এবং অস্থির হইয়া কাকের মত আকাশে ঘুরিতেছিল। আজ বাংলা নববর্ষ। নতুন পোশাক পরিধান করিয়া প্রচেতাদের বাসার সামনে দিয়া হাঁটিয়া যাইতেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—প্রচেতাকে আজ নব্য-সাজে দেখিব। কিন্তু ইহাদের বাসার দরজা এবং জানালাগুলো বন্ধ দেখিলাম। দরজার তালাটি ঘুমন্ত মাথার মত ঝুলিতেছিল। ভাবিলাম বছরের প্রথমদিনে কেনই বা তাহাদিগের দরজায় তালা ঝুলিতেছে? পরে জানিতে পারিলাম, প্রচেতাদের সবাই এখন নববর্ষ উপলক্ষে গ্রামের বাড়িতে বেড়াইতে গেল। কিন্তু প্রচেতাকে আজ দেখিবার জন্য খুব মন চাইল। মনে হইতেছিল প্রচেতাকে আরেকটি দিন না দেখিলে শরীর হইতে প্রাণটি ফুড়ুৎ করিয়া চলিয়া যাইবে। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম যে আজ প্রচেতাদের গ্রামের বাড়িতে যাইব—এবং তাহাকে একটু নয়ন ভরিয়া দেখিব। ভাবিলাম সাজুকে নিয়া আজ প্রচেতাদের বাড়িতে যাইব। তাই আমি সাজুদের দোকানে আসিলাম এবং দাঁড়াইয়া সাজুর সাথে অনিচ্ছাকৃত গল্প করিতেছিলাম। কিছুক্ষণ পরে জানিতে পারিলাম যে আজ সাজুকে সারাটা দিন দোকান চালাইতে হইবে। কারণ সাজুর পিতা অনিমেষ বাবু গ্রামের বাড়িতে গিয়াছে। তাতে মনটা আরও খারাপ হইয়া গেল। প্রচেতাদের বাড়িতে তাহলে কাকে নিয়া যাইব? ইচ্ছে করিলে তো আমি স্বয়ং তাহাদিগের বাড়িতে হঠাৎ উপস্থিত হইতে পারি না। তাহলে তাহাদিগের মনে আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়া সন্দেহ জাগিবে। তাই সাথে একজন থাকিলে নানা অজুহাত দেখানো সম্ভব—এবং এতে তাহাদের সন্দেহও হইবে না।

কিছুক্ষণ পর কর্মকার দাদার ছেলে মিশু সাজুদের দোকানে আসিল। মিশুর বয়স বারো বা তেরো হইবে। সে আমাকে কাকা বলিয়া ডাকিত। আমাকে দোকানে আলস্যে বসিতে দেখিয়া মিশু কহিল, ‘কাকু, কী করিতেছেন? চলেন কলেজের আশেপাশে হইতে একটু ঘুরিয়া আসি। শুনেছি সেখানে না-কি নববর্ষের অনুষ্ঠান চলিতেছে।’ তখন আমার মাথায় একটি বুদ্ধি জাগ্রত হইল। আমি মিশুকে কহিলাম, ‘তার চেয়ে ভালো একটি বুদ্ধি আমার আছে। চল, আজকে রিকশায় করিয়া আমরা সারাদিন ঘুরিব। কী বলিস মিশু?’ রিকশায় উঠিয়া বেড়াইবার কথা শুনিয়া মিশু সাথে সাথে রাজী হইয়া গেল। ‘কিন্তু কাকা, আমরা কোথায় যাইব?’ মিশু কহিল। ‘দেখি আজ যতদূর যাওয়া সম্ভব রিকশায় করিয়া যাইব। নববর্ষ বলে কথা। এইদিন তো আর ফিরে আসবে না।’ আমি কহিলাম। মিশুকে আমার প্রকৃত উদ্দেশ্যটি বলিনি। কারণ তাতে নানা সমস্যার সৃষ্টি হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে। দুইজনে সঙ্গে সঙ্গে একটি রিকশায় উঠিলাম। প্রচেতাদের গ্রামের বাড়ির পথটি আমার পূর্বেই জানা ছিল। তাই রিকশার চালককে সেই পথে চালাইবার জন্য অনুরোধ করিলাম। আর মিশুকে বলিলাম, ‘এই পথে কোনদিন যাইনি রে মিশু। আজ দেখি কতদূর আমরা যাইতে পারি।’ মিশু জানাইল সে-ও কোনদিন এই পথে যায়নি। রিকশা চালককে ধীরে চালাইবার জন্য কহিলাম কিন্তু আমার মন প্রচেতাকে একটু দেখিবার জন্য ছটফট করিতে লাগিল।

চলবে...

এসইউ/পিআর