চেয়েছিলাম সফল কৃষক হতে : মোহাম্মদ নূরুল হক

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ , লেখক ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৩:৪৭ পিএম, ১৯ নভেম্বর ২০২০

মোহাম্মদ নূরুল হক—কবি, প্রাবন্ধিক, ছোটকাগজকর্মী ও সংবাদকর্মী। ১৯৭৬ সালের ১২ জুন নোয়াখালীর সুবর্ণচরে তার জন্ম। এ পর্যন্ত তার দশটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি কবিতা, সাতটি প্রবন্ধের। সম্প্রতি প্রবন্ধ শাখায় বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার ২০২০ পেয়েছেন তিনি। তার পুরস্কারপ্রাপ্তি এবং সাহিত্যের বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সালাহ উদ্দিন মাহমুদ—

লেখালেখির শুরুর গল্পটি শুনতে চাই—
মোহাম্মদ নূরুল হক: আমি তো দরিদ্র কৃষকের ছেলে। ছোটবেলায় কৃষিকাজের ফাঁকে-ফাঁকে লেখাপড়া করেছি। হয়তো ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়েছি একটানা। ক্লাস ফোরে উঠেছি মাত্র, কিন্তু এরপর তিন বছর আর স্কুলের চৌকাঠই মাড়াইনি। চলে গেছি হাফেজি পড়ার জন্য। যখন পুরোদস্তুর হাফেজ, তখন আমার মনটা হুহু করে উঠলো স্কুলের জন্য। আবার গিয়ে ভর্তি হলাম স্কুলে। তাও যেখানে শেষ করেছিলাম, সেখানে গিয়েই ফের শুরু। মাঝখানে মাদ্রাসায় পড়ার সময় ধর্মীয় শিক্ষার বাইরে কিছুই পড়ার ছিল না। তবে, এই সময়ে এই বাড়ি সেই বাড়ি গেলে, মাঝে মধ্যে পেয়ে যেতাম, ‘ছয়মুলুক বদিউজ্জমান’, ‘হাতেম তায়ী’, ‘বিষাদ সিন্ধু’। তা পড়তাম। এছাড়া, বাবার নির্দেশেও প্রায় দুপুরে ‘বিষাদ সিন্ধু’ পড়ে তাকে শোনাতে হতো।

তবে, তখনো বুঝতে শিখিনি যে, এসব গল্প মানুষের রচিত। তখন মনে হতো এসব গল্প ঐশী রচনা। পরবর্তী সময়ে ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়ই প্রথম বুঝতে পারি, আমরা যেসব গল্প-পদ্য-গদ্য পড়ি, সেগুলো কোনো দেবতার রচনা নয়, আমাদের মতোই রক্তমাংসে গঠিত মানুষের লেখা। আর কী আশ্চর্য! তখনই মনে হলো, আরে চাইলে তো আমিও লিখতে পারি! ধীরে ধীরে রাফখাতায় তিন চার পৃষ্ঠাজুড়ে একেকটা গল্প লেখা শুরু করি। এভাবেই বলা যায়, লেখালেখির শুরু।

সম্প্রতি ‘বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার’ পেলেন, পুরস্কারপ্রাপ্তির অনুভূতি জানতে চাই—
মোহাম্মদ নূরুল হক: পুরস্কারকে অনেকেই লেখালেখির স্বীকৃতি মনে করেন। হয়তো তাদের অনুমান বা ধারণাই ঠিক। কিন্তু আমার কখনোই স্বীকৃতি মনে হয় না। পুরস্কার যদি স্বীকৃতিই হয়, তাহলে আমাদের যেসব অগ্রজ বাংলা অ্যাকাডেমি বা রাষ্ট্রীয় কোনো পুরস্কার পাননি, তাদের কী হবে? প্রয়াত আবিদ আজাদ, আহমদ ছফা কিংবা এই সময়ের ময়ূখ চৌধুরী তো কোনো পুরস্কার পাননি। অথচ তাদের সমকালীন চিন্তক-কবিদের মধ্যে তারা কতটা অগ্রসর, পাঠক মাত্রই জানেন।

আমার মনে হয়, পুরস্কার হলো, একজন লেখকের প্রতি পুরো মানবজাতি কিংবা বিশেষ জনপদ কিংবা গোষ্ঠীবিশেষের ভালোবাসা। মানুষ তো ভালোবাসারই কাঙাল। ভালোবাসা পেলে মানুষ সবকিছুকেই তুচ্ছ মনে করে। ভালোবাসার জন্য মানুষ রাজত্বও ত্যাগ করে। লেখকও তো এই ভালোবাসার কাঙাল মানুষই। সুতরাং ভালোবাসা পেলে নিজেকে ভালোবাসার পাত্র বলেই মনে হয়। মনের ভেতর নতুন নতুন চর জেগে ওঠে। সেখানে পলি জমে। সেই পলিতে ফসল উৎপাদনের স্বপ্নও বোনেন কেউ কেউ। আমার কাছে আপাতত পুরস্কারপ্রাপ্তির বিষয়টি এমনই।

পুরস্কার নিয়ে অনেক রকম কথা শোনা যায়, এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?
মোহাম্মদ নূরুল হক: পুরস্কার নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলার কারণও নিশ্চয় তাদের কাছে আছে। কেউ পুরস্কারের বিরুদ্ধে বলেন, কেউ পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাদের এইসব বক্তব্য ব্যক্তিগত মত হিসেবেই মেনে নিতে হবে। তাদের এই অভিমত সর্বজনীন নয়। কখনো যদি কোনো পুরস্কারের বিরুদ্ধে কোনো সম্প্রদায় সম্মিলিতভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, একই সঙ্গে জনমত গড়ে তুলতে পারে, তাহলেই কেবল সেই মত ব্যক্তিগত অভিমত থেকে জনমতে উত্তীর্ণ হতে পারে। কিন্তু বাংলা অ্যাকাডেমিসহ অন্যান্য পুরস্কার মাঝেমাঝে এমন ব্যক্তিকে দেওয়া হয়, মনে হয়, ওই ব্যক্তি নিজেও বিব্রত বোধ করেন পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকায় নিজের নাম দেখে।

আগামী বইমেলায় আপনার নতুন কী বই পাচ্ছি?
মোহাম্মদ নূরুল হক: মনে হয় তিনটি বই আসবে। কলামের বই, ‘বাক-স্বাধীনতার সীমারেখা’, আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ড ‘জীবনের যতিচিহ্নগুলো’ ও কবিতার বই, ‘লাল রাত্রির গান’।

ছোটবেলায় কী হতে চেয়েছিলেন?
মোহাম্মদ নূরুল হক: সফল কৃষক ও শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম। আমাদের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে সবাই হয় কৃষক, না হয় শিক্ষক। দুই-একজন ব্যবসায়ী। তবে, অবারিত ধানক্ষেত, সবুজ প্রান্তর দেখে দেখে কেবলই মনে হতো বড় হলে আমিও চাষি হবো। চাষিদের মনে কোনো দুঃখ নেই। তারা কত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে, কিন্তু ধানক্ষেতে ধানের রোপণ করতে করতে কিংবা পাকা ধান কাটতে কাটতে তারা কোরাস ধরে গান করে। আহা সেই গান। এখনো কানে বাজে। তো সেই গান শুনতে শুনতে নিজেকে ভবিষ্যতের সফল কৃষক হিসেবে দেখতাম মনে মনে। আর এই কৃষক হওয়ার জন্যই বারবার স্কুল থেকে পালিয়ে গেছি। বারবার নানাবাড়ির রাখালের সঙ্গে গরু-মহিষের পাল নিয়ে চর থেকে চরে ঘুরে বেড়িয়েছি। মহিষের পিঠে চড়ে নদী পার হয়েছি। গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে ঘুরে সারা দুপুর, সারা বিকেল কাটিয়েছি।

শিক্ষক হবো, এই স্বপ্নও লালন করেছি। সেই স্বপ্ন থেকেই হয়তো, খুব ছোটবেলায় টিউশনি করতাম। অন্যরা টিউশনি করতে গিয়ে পড়াতো নিচের ক্লাসের ছাত্র, আমি পড়াতাম ক্লাসমেটদের। আমার মনে হতো, জুনিয়রদের পড়িয়ে কিছু টাকা পাওয়া যায়, কিন্তু তাতে প্রচুর সময় নষ্ট। কিন্তু ক্লাসমেটদের পড়ালে টাকা পাওয়ার পাশাপাশি নিজে ভালোমতো প্রস্তুত হওয়া যায়।

খুব ছোটবেলা থেকে আইনজীবী, পুলিশ আর সাংবাদিকদের কেন যেন ঘৃণা করতাম। হয়তো এই কারণে যে, আইনজীবীরা ভালো মানুষদের বিপক্ষেও আদালতে দাঁড়ান। পুলিশ কথায় কথায় মানুষকে পেটায়, হাতকড়া পরায়, আর সাংবাদিকরা প্রায় আসল ঘটনা চেপে গিয়ে মনগড়া কথা লেখে। আমার ছোট্টমন তাদের প্রতি বিষিয়ে উঠেছিল। তাই ওই শিশুমনেরই শপথ ছিল, যদি কৃষক কিংবা শিক্ষক হতে না পারি, জীবনে আর যাই হই, এই তিন পেশায় যাবো না। কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস! শিক্ষক তো হতেই পারিনি, কৃষকও না। যেই তিন পেশাকে অপছন্দ করতাম, তার মধ্যে পুলিশ ছাড়া বাকি দুই পেশায় আছি গত ২৫ বছর ধরে।

লেখালেখি নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
মোহাম্মদ নূরুল হক: আমি তো আনন্দের জন্যই লিখি। যা লিখে আনন্দ পাই, তাই লিখি। তাই দেখবেন, কখনো নিরেট শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ লিখছি, তো ফের আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে কলম ধরছি। আবার এমনও হয়েছে রাজনীতি-সংস্কৃতি-সমাজ-শিক্ষা নিয়েও লিখছি নিবন্ধ।

দীর্ঘ পরিকল্পনা করে একটি প্রবন্ধ লিখছি, শেষ হতে আরও তিন চার বছর লাগতে পারে। ওই প্রবন্ধে বাঙালির নিজস্ব নন্দনতত্ত্ব দেওয়ার চেষ্টা করবো। এর বাইরে সাহিত্যবিষয়ক গদ্যের চেয়ে সমকালীন বিভিন্ন বিষয়ে কলাম লেখার ইচ্ছা আছে।

এসইউ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]