হাসান মাহাদির গল্প: পরাধীন স্বপ্ন

সাহিত্য ডেস্ক
সাহিত্য ডেস্ক সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:৩৯ পিএম, ২৩ জুলাই ২০২৩

ধনাগোদার কোল থেকে বেরিয়ে আসা বোয়ালজুড়ি খাল। বর্ষায় বেশ দেখা যায়। একেবারে নদীর মতোই। কিন্ত শীত কিংবা গ্রীষ্মে একেবারেই প্রাণ যায় যায় অবস্থা। এর কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বিশাল বাজার। মিশরকে যেমন নীল নদের দান বলা হয়; তেমনই এ বাজারকেও বোয়ালজুড়ির দান বললে ভুল হবে না। পাকা রাস্তা থাকা সত্ত্বেও বাজারের অধিকাংশ মালামাল ট্রলারের মাধ্যমেই আসে।

বাজারের অধিকাংশ মুদি দোকানি হিন্দু। বিশেষ করে পুরোনো মুদি দোকানগুলো হিন্দুদের। এরকমই একটি দোকান আছে সুমিতদের। সবাই একনামে চেনে অমিত সাহার মুদির দোকান। অমিত সাহা সুমিতের বাবার নাম। বেশ বেচাকেনা হয়। সাইনবোর্ডে লেখা আছে ‘পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা’। সেই সুবাদে আশপাশের দু-তিন গ্রামের খুচরা মুদি দোকানিরা অমিত সাহার দোকান চিনতে ভুল করে না।

সুমিতদের নিজস্ব ভিটা। একেবারে খাল ঘেঁষেই। নিচতলায় দোকান, দোতলায় বাসা। সুমিতের রুম থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকার শব্দ শোনা যায়। একটু কান পাতলেই পানির কল কল ধ্বনি শোনা যায়।

সুমিতরা দুই ভাই, এক বোন। সুমিত সবার বড়। বোনটা সবার ছোট। ভাইটি ক্লাস সেভেনে পড়ে। বোনটা সবেমাত্র স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। বেশ ভালো ছাত্র সুমিত। মাধ্যমিকে অল্পের জন্য ‘এ প্লাস’ মিস হয়েছে। সুমিতদের পরিবারে সে-ই একমাত্র মাধ্যমিক পাস। ছেলের পড়াশোনায় মনোযোগ দেখে মা বেশ গর্ব করেন। কিন্তু বাবা চান, সে দোকানের কাজে তাকে সাহায্য করুক। বাবার মন্তব্য, ‘লেখাপড়া করে কিছু করা যায় না।’ কিন্তু সুমিত চায়, সে খুব বড় হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ করে সিএ করবে। নিজে নিজে ভেবে অবাক হয়, সহপাঠী আমান পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও টাকার জন্য বই কিনতে পারে না। কী অদ্ভুত! তার বাবার টাকা-পয়সা থাকা সত্ত্বেও পড়াশোনায় তার তিক্ততার কারণ খুঁজে পায় না।

বন্ধুদের অনেকেই তোলারাম কলেজ, নটর ডেম কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলেও বাবার রক্ষণশীলতার কারণে সুযোগ থাকার পরও ভর্তি হতে পারেনি সুমিত। মনে মনে ভাবে, সৃষ্টিকর্তা বুঝি তার স্বপ্নগুলোকে ওড়াবার সুযোগ দেবেন না। তারপরও থেমে নেই। স্থানীয় কলেজে ভর্তি হয়েছে। নিয়মিত কলেজে যায়। আবার বাবার সঙ্গে দোকানেও বসে। যদিও দোকানে দুজন কর্মচারী আছে। তারপরও তাকে বসতে হয়। প্রচুর ভিড় থাকে দোকানে।

সুমিতের প্রতিদিনের রুটিনটা হলো সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে কোনোমতে নাস্তা খেয়ে হিসাববিজ্ঞান প্রাইভেটে যাওয়া। তারপর কলেজের ক্লাসে যোগ দেওয়া, ক্লাস শেষ করে কোনোমতে দু’লোকমা খেয়ে দোকানে যায়। নিজেদের দোকান। তারপরও কেমন যেন মনে হয় তার। তার কাছে মনে হয়, সে-ও যেন আর দু’জন কর্মচারীর মতোই।

আগামীকাল ক্লাসে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের ওপর একটি পরীক্ষা হবে। প্রতিদিনের মতো আজও দোকান থেকে এসে পড়ায় নিমগ্ন হয় সুমিত। একজন কর্মচারী ছুটিতে গেছে। বিধায় আজ বেশ খাটুনি হয়েছে সুমিতের। আর একটা অধ্যায় বাকি আছে। সুমিতের মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। বাকি অধ্যায়টা সকালে পড়বে বলে শুয়ে পড়ে।

সকালে পড়তে বসবে, এমন সময় শোনে কর্মচারী আজও আসবে না। তার ওপর বাবা এসে বললেন, ‘একটু দোকানে যা তো সুমিত। শরীরটা ভালো লাগছে না।’ তার মানে আজ সুমিতের কলেজে যাওয়া হবে না। পরীক্ষাও দেওয়া হবে না! মনের মাঝে বজ্রপাত শুরু হয়। ছেলের করুণ দৃষ্টি মাকে সব বুঝিয়ে দেয়। মা সান্ত্বনা দেন, ‘তুই পরীক্ষা শেষ করে তাড়াতাড়ি চলে আসিস। আমি ততক্ষণে পলাশকে ডেকে আনি।’
সুমিতের আর ডেটাবেজ চ্যাপ্টার পড়া হয় না। কিছুক্ষণ দোকানে থেকে কলেজে চলে যায় সুমিত। পরীক্ষা শেষ হবে বারোটায়। এগারোটা সাতান্ন বাজে। হঠাৎ ফোনটা কেঁপে ওঠে। নিশ্চয়ই বাবার ফোন। পরীক্ষা শেষ করে সোজা দোকানে চলে যায় সুমিত।

বৃহস্পতিবার। হাটের দিন। দোকানটা কেমন এলোমেলা দেখাচ্ছে। ব্যাগটা ফেলে শ্রান্তি-ক্লান্তি ভুলে কাজে লেগে যায় সুমিত। মাল-পত্র দিয়ে শূন্যস্থান পূরণ, ঝাড়ু দেওয়া, পেঁয়াজ বাছা এভাবে দু’ঘণ্টা কাজ করে সুমিত। ঘাড় ফেরাতেই দেখে মা পেছনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছেন। একটু হেসেই মনের মাঝে জমে থাকা মেঘগুলো আড়াল করে সুমিত। মাকে বোঝায়, তার কিছুই হয়নি। বেলা চারটায় তার গোসল ও আহার জোটে।

রাতে সুমিত ছুটি পায়। মনটা কেন যেন হু-হু করে কেঁদে ওঠে। ছাদে এসে রেলিং ধরে খালের প্রবাহমান পানির দিকে চেয়ে ভাবে, হে নদীর স্রোত, তুমি কত স্বাধীন! আমি যদি তোমার মতো হতে পারতাম। যদি সংকীর্ণ জীবনের পরাধীন স্বপ্নগুলোকে নিজের ইচ্ছেমতো ভাসাতে পারতাম। একবার জোয়ারে, একবার ভাটায়। খালের ওপারের পাটোয়ারী বাড়ির মসজিদের মিনারটা দেখা যায়। অন্ধকারে উঁচু-নিচু অনেক আবছায়ার মাঝেও মিনারের অবয়বটা দেখা যাচ্ছে। যেন এই মধ্যরাতে সব জঞ্জাল ছাড়িয়ে সুমিতের লালিত স্বপ্নটাই উঁকি দিচ্ছে।

এসইউ/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।