হাওরপাড়ের কৃষকের কান্না শুনবে কে?
ফাইল ছবি
নুসরাত জাহান বৈশাখী
হাওরকন্যা নামে পরিচিত সুনামগঞ্জ জেলাটি দেশের সবচেয়ে অবহেলিত ও অনুন্নত একটি জেলা। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৩৭টির বেশি হাওর আছে এই জেলায়। অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। জেলার প্রায় ৬৩% জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়। সারাদেশে বোরো ধান উৎপাদনে শীর্ষ ১০টি জেলার মধ্যে সুনামগঞ্জ অন্যতম।
পরিতাপের বিষয় হলো, সারাদেশ যেখানে উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে; সেখানে এ জেলার মানুষের জীবন এখনো নানান সমস্যায় জর্জরিত ও বিপর্যস্ত। হাওরপাড়ের মানুষের জীবনে কান্না নতুন নয় বরং মৌসুম বদলালেই তাদের বুকভরা দীর্ঘশ্বাস আরও ঘন কুয়াশার মতো নেমে আসে। বছরের পর বছর ধরে এ জেলার মানুষ প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। আবার প্রকৃতির নির্মমতাকেই সঙ্গী করে বেঁচে থাকতে হয়।
প্রকৃতির চেয়ে বড় যে অভিশাপ তাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে, তা হলো মানুষের তৈরি অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত বাঁধ, জলাবদ্ধতা আর উন্নয়নের নামে অবহেলা। হাওরের মানুষের কান্না আজ শুধুই বন্যার পানি নয় বরং এটি নীতিনির্ধারণের ব্যর্থতার দীর্ঘ শোকগাথা। হাওরে অপরিকল্পিত বাঁধ উন্নয়ন নয় বরং অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাওর অঞ্চলকে ঘিরে বছরের পর বছর নানা পরিকল্পনা আছে। প্রত্যেক প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল কৃষকের ফসল রক্ষা করা, আগাম বন্যা ঠেকানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। কিন্তু বাস্তব চিত্র যেন উল্টো। বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম, নকশা-বহির্ভুত কাজ, সময়মতো কাজ সম্পন্ন না হওয়া ইত্যাদি যেন স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর একই অভিযোগ, বাঁধ দুর্বল, ঠিকমতো কমপ্যাক্ট করা হয়নি, মানহীন সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে এবং ঠিকাদারেরা হাওর শুকানোর মৌসুম পর্যন্ত অপেক্ষা করেন না।
শেষ পর্যন্ত বাঁধ ভেঙে গেলে সব দোষ চাপানো হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর। অথচ মানুষের অদুরদর্শিতা না থাকলে অনেক ভাঙনই ঠেকানো সম্ভব। অপরিকল্পিত বাঁধের ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। কোথাও কোথাও বাঁধ এত উঁচু করে তোলা হয় যে, হাওরে জমে থাকা পানি বের হতে পারে না। ফলে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ জলাবদ্ধতা, যা কৃষকের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে এবং ডুবে যায় কৃষকের স্বপ্ন।
সুনামগঞ্জের কৃষকেরা একমাত্র ফসল বোরো ধান নিয়েই বছর পার করেন। এই এক ফসলই তাদের পরিবারকে টিকিয়ে রাখে। কিন্তু সেই ফসল যখন কাঁটার আগে পানির নিচে তলিয়ে যায়; তখন তারা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই ভোগ করেন না বরং মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েন। জলাবদ্ধতা এমনভাবে দাঁড়িয়েছে যে, ফসল পাকা হলেও মাঠে নামা যায় না, মেশিন নেওয়া যায় না। কৃষক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেন তাদের পরিশ্রমের সবুজ মাঠ প্রথমে হলুদ হয়, তারপর পানির স্রোতে ধুয়ে যায়।
একেকটি পরিবার মানে একেকটি গল্প, একেকটি ইতিহাস। ধান নষ্ট হলে শুধু ক্ষতিই হয় না; বরং ঋণ শোধ হয় না, নতুন বীজ কেনা হয় না, ঘরের মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয় না, স্কুল-কলেজ পড়ুয়া সন্তানের খরচ জোগানো হয় না। সর্বোপরি, নষ্ট হয়ে যায় কৃষকের ভবিষ্যৎ। অবহেলিত সুনামগঞ্জ যেন উন্নয়নের বাইরে এক জেলা।
হাওর অঞ্চলকে সব সময়ই ‘প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জেলা’, ‘পানির দেশ’, ‘মৎস্যভান্ডার’ বলে প্রচার করা হয়। কিন্তু জেলাটির মানুষের জীবনের বাস্তবতা যেন এই সৌন্দর্যের আড়ালে চাপা পড়ে আছে। সুনামগঞ্জে বড় বড় প্রকল্পের ঘোষণা হলেও বাস্তবায়ন দুর্বল, তদারকি কম এবং স্থায়ী কোনো সমাধান নেই। যেমন- হাওরের পানি ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন নিয়ে কথাবার্তা আছে কিন্তু সঠিক ড্রেনেজ ও নদী খনন নেই। বাঁধ নির্মাণে স্বচ্ছতা এখনো চ্যালেঞ্জ।
আগাম বন্যা আগেভাগে জানানোর জন্য স্যাটেলাইট মনিটরিং ব্যবস্থা উন্নত হলেও সুনামগঞ্জের কৃষক পর্যন্ত তথ্য পৌঁছে না। কৃষকের জন ঝুঁকিভিত্তিক বিমা বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখানো কার্যকর হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা এই জেলার ভোটাররা ভোট দেয় কিন্তু সেবা পায় না, ট্যাক্স দেয় কিন্তু নিরাপত্তা পায় না। রাজধানীতে বসে নীতিনির্ধারকরা হাওরের কথায় বক্তৃতা দেন, কিন্তু হাওরবাসীর কান্না শুনতে কেউ মাঠে নামেন না।
অসহায় মানুষের প্রশ্ন, কবে হবে এর স্থায়ী সমাধান। প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, এটা সবাই জানে। কিন্তু মানুষের তৈরি দুর্যোগ কেন বারবার ঘুরে আসে, কেন আগেই মেরামত করা হয় না, কেন জলাবদ্ধতা দূর করতে আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় না। কৃষকেরা কোনো দিন রাষ্ট্রের কাছে খুব বেশি কিছু দাবি করেননি। তারা শুধু চান তাদের একমাত্র ফসলটি যেন রক্ষা পায়, সারা বছরের পরিশ্রম বৃথা না যায়। তারা চান না দান-অনুদান, তারা চান টেকসই বাঁধ, সময়মতো কাজ এবং সঠিকভাবে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা।
হাওরের মানুষের কান্না যেন আর নতুন খবর না হয়। সবাই যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছে এই কান্নার সঙ্গে। প্রতি বছর দেখা যায়, অমুক হাওরের বাঁধ ভেঙেছে, তমুক জেলার ফসল তলিয়ে গেছে। কিন্তু বছরের পর বছর তো একই ঘটনা ঘটছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলো হলো পরিকল্পনার অভাব, অনিয়ম ও দুর্নীতি, তদারকির দুর্বলতা, নদী-হাওরের স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ব্যাহত হওয়া ও কৃষকের কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারণের আগোচরে থাকা।
যদি আজই সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়। তবে সুনামগঞ্জ নতুন করে দাঁড়াতে পারবে। এই অঞ্চলে শুধু ধান উৎপাদন নয় বরং পর্যটন, মৎস্য, কৃষি-বন অর্থনীতি সব খাতে বদলে যেতে পারে। কিন্তু এর জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। হাওরপাড়ের মানুষের কান্না শুধু তাদের কান্না নয় এটি দেশের কৃষি ব্যবস্থার অপূর্ণতার প্রতিচ্ছবি।
মনে রাখতে হবে, কৃষক বাঁচলে, দেশ বাঁচবে। আজ আমরা যদি তাদের পাশে না দাঁড়াই; যদি টেকসই সমাধান না দিই। তবে আগামী বছর একই কান্নার ঢেউ আবার আসবে। তাই কর্তৃপক্ষ যদি এই জেলার কৃষির বিষয়ে বিশেষ নজর দিতো, তাহলে এ দেশের মানুষ এবং কৃষির উন্নয়ন হতো। যা পরোক্ষভাবে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতো।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।
এসইউ