চাকরির পেছনে না ছুটে বরই চাষে সফল দুই ভাই
বরই চাষের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন দুই ভাই, ছবি: জাগো নিউজ
চাকরির পেছনে না ছুটে বেকারত্বকে জয় করে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ভেন্নাবাড়ি গ্রামের দুই ভাই প্রবীর বাকচি ও অপূর্ব বাকচি। পৈতৃক জমিতে উচ্চ ফলনশীল বরই চাষের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন তারা। তাদের ১৪০০ বরই গাছ পুরো জেলার কৃষি উদ্যোক্তাদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ৫-৬ বছর আগে কৃষির প্রতি আগ্রহের মাধ্যমে এ উদ্যোগ শুরু হয়। বর্তমানে তারা এর মাধ্যমে লাখ লাখ টাকার ব্যবসা গড়ে তুলেছেন।
জানা যায়, প্রথমদিকে প্রবীর ও অপূর্ব বিভিন্ন ফলের চাষ শুরু করেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফলের চাষ ব্যর্থ হয়। এতে তারা হতাশ হয়ে বসে থাকেননি। পরে বরই চাষে লাভবান হওয়া যায় এমন ভিডিও দেখে উৎসাহ পান। চাষপদ্ধতি জানার পর চুয়াডাঙ্গা থেকে বিভিন্ন জাতের বরইয়ের চারা এনে জমিতে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। ২০২০ সালে চারা রোপণ করে প্রথম বছরেই আশানুরূপ ফল পান। এখন গাছগুলোতে ঝুলে আছে ভারত সুন্দরী, কাশ্মীরি আপেল, বল সুন্দরী, থাই আপেলসহ বিভিন্ন জাতের বরই। এ বছর বাম্পার ফলন হয়েছে।

বরই চাষি অপূর্ব বাকচি বলেন, ‘আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের। বাবা ছিলেন কাপড় ব্যবসায়ী। অনেক পরিশ্রম করে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। কয়েকবার চাকরির পরীক্ষা দিয়েছি। কিন্তু সোনার হরিণ ধরতে পারিনি। বয়সসীমা শেষ হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিই কৃষিকাজের মাধ্যমে নিজেকে স্বাবলম্বী করতে। তাই নিজেদের ১২ বিঘা ও অন্যের ১০ বিঘা জমি লিজ নিয়ে শুরু করি ফল চাষ। এর মধ্যে একটি পুকুরও আছে। পুকুরে চাষ করা হয়েছে চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছ।’
তিনি বলেন, ‘পুকুরপাড়ে সবজি ও জমিতে লাগাই বিভিন্ন জাতের বরই গাছ। এর মধ্যে ৬০০ গাছ প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা যায়। এখন ৮০০ গাছে ফল ধরেছে। এ বছর প্রায় ৪০০ মণ বরই উৎপাদন হবে। এরই মধ্যে প্রায় আড়াইশ মণ বিক্রি হয়েছে। গাছে যা আছে তাতে আরও দেড়শ মণ বিক্রি করা সম্ভব। আকারভেদে প্রতি কেজি ৫০-২০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। গড়ে ১০০ টাকা ধরলেও বিক্রি হবে ১৬ লাখ টাকা। এরই মধ্যে প্রায় ১০ লাখ টাকা বিক্রি হয়েছে। নিজেদের পরিশ্রম বাদে ব্যয় হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ টাকা। খরচ বাদে প্রায় ১২-১৩ লাখ টাকা লাভের সম্ভাবনা আছে।’

প্রবীর বাকচি বলেন, ‘স্থানীয় বাজারে আমাদের বরইয়ের ব্যাপক চাহিদা আছে। পাইকারী ব্যবসায়ীরা আমাদের ক্ষেত থেকে বরই কিনে নিয়ে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি করে থাকেন। নিজেরাই ক্ষেতের পরিচর্যা করি এবং সংগ্রহ করে সেগুলোকে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করি। পরিবারের সদস্যরাও এ কাজে সাহায্য করে। এতে কাজের গতি বেড়েছে। তাই আমি বলবো, চাকরির পেছনে না ঘুরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মনিয়োগ করলে লাভবান হওয়া সম্ভব।’
ভেন্নবাড়ি গ্রামের শ্যামল কান্তি বিশ্বাস বলেন, ‘অপূর্ব ও প্রবীর বরই চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন। তাদের চাষাবাদ দেখে আশা করেছি, আগামীতে তাদের মতো আমিও চাষাবাদ করবো।’ এমন উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন সাতপাড় গ্রামের বাসিন্দা বিমল বিশ্বাস, অরবিন্দু সরকার, সিংগা ইউনিয়নের পংকজ মন্ডল, সাধু মন্ডল ও প্রবীর দত্ত। তারাও এ চাষ সম্পর্কে জানেন এবং নিজেদের কৃষিকাজে সম্পৃক্ত করার ইচ্ছা পোষণ করেন।

- আরও পড়ুন
মাগুরায় বরই চাষে শিক্ষকের সফলতা
গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মামুনুর রহমান জানান, প্রবীর ও অপূর্ব বাকচির বরই চাষের উদ্যোগ স্থানীয় যুবকদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। দুই ভাই বরই চাষ করে ভালো লাভবান হয়েছেন। তাদের দেখাদেখি অনেকেই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যাতে উন্নত প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা দিয়ে ভালো ফলন পেতে পারেন।
তিনি বলেন, ‘জেলার কৃষকেরা সুষ্ঠু পরিকল্পনা মেনে বরই চাষ করলে তা শুধু আর্থিক স্বাবলম্বন আনবে না বরং পুষ্টির চাহিদা পূরণেও সহায়ক হবে। বর্তমানে গোপালগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে প্রায় ৯০ হেক্টর জমিতে বরই চাষ হচ্ছে। এ ধারা ধরে রাখলে অনেক কৃষক লাভবান হবেন। কৃষির মাধ্যমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন।’
এসইউ