ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

না.গঞ্জে বোমা হামলার ১৫ বছর : ধীরগতিতে চলছে বিচার

প্রকাশিত: ০৯:১৬ এএম, ১৬ জুন ২০১৬

আজ (১৬ জুন) বৃহস্পতিবার। নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বর্বরোচিত বোমা হামলার ১৫ বছর। চাঞ্চল্যকর এ বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলায় আদালতে চার্জশিট দেয়া হলেও বিচার কাজ চলছে ধীরগতিতে।

তবে স্বজন হারানো ব্যথা বুকে চাপা দিয়ে এখনো নীরবে কাঁদছে বোমায় ক্ষত বিক্ষত হওয়া নিহতের স্বজনরা। নীরব এ কান্নার যেন শেষ না হয়। তবে সেদিন ঘাতকদের একমাত্র নিশানা নারায়ণগঞ্জ ৪ আসনের সাংসদ একে এম শামীম ওসমান প্রাণে বেঁচে গেছেন।
 
১৬ জুনের বোমা হামলার ঘটনার প্রধান আসামি হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানের বিরুদ্ধে সারাদেশে অনেক মামলা থাকায় যথাসময়ে তাকে নারায়ণগঞ্জ হাজির করা হচ্ছে না। এতে করে বার বার সাক্ষ্যগ্রহণ পেছাচ্ছে। আর এতে করে মামলার দীর্ঘসূত্রিতাও বাড়ছে।

নারায়ণগঞ্জ আদালতের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট কেএম ফজলুর রহমান জানান, মুফতি হান্নানের বিরুদ্ধে সারাদেশে ৫১টি মামলা রয়েছে। তবে মাঝে মধ্যে তাকে হাজির না করায় সাক্ষ্যগ্রহণ কখনো কখনো বিলম্ব হচ্ছে।

তিনি আরো জানান, সঠিকভাবেই মামলার বিচার কাজ চলছে।
     
এদিকে, ১৫ বছর ধরে নিহতের পরিবারের লোকজন চোখের জল ফেললেও তাদের অনেকের অভিযোগ, এ ঘটনা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দল রাজনীতি করেছে। রাজনৈতিক কূট কৌশলের ফাঁদে মামলা পাল্টা মামলায় আপনজন হারিয়েও মামলা করতে পারেনি স্বজনরা। ফলে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘাতকদের বিচার কাজটি সম্পন্ন হয়নি আজও।
 
এদিকে, চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলার ১২ বছর পর ২০১৩ সালের ২ মে আদালতে চার্জশিট দিয়েছে মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি। চার্জশিটে ৬ জনকে অভিযুক্ত ও ৩১ জনকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

চার্জশিটে অভিযুক্ত ৬ জন হলেন- নারায়ণগঞ্জে ক্রসফায়ারে নিহত যুবদল ক্যাডার মমিনউল্লাহ ডেভিডের ছোট ভাই শাহাদাতউল্লাহ জুয়েল, হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, জঙ্গি নেতা ওবায়দুল্লাহ রহমান, ভারতের দিল্লী কারাগারে আটক সহোদর আনিসুল মোরসালিন, মুহিবুল মুত্তাকিন ও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ১২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু।
 
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডি নারায়ণগঞ্জ অফিসের সহকারী পুলিশ সুপার এহসানউদ্দীন চৌধুরী জানান, ৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল মামলায়। তার মধ্যে মমিনউল্লাহ ডেডিভ ও কাজল নামের দুইজন ইতোমধ্যে মারা গেছেন। এ কারণে ৬ জনকেই মূল অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেয়া হয়েছে।
 
জানা গেছে, ২০০১ সালের ১৬ জুন ভয়াবহ বোমা হামলায় ২০ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলায় ২০১৩ সালের ২ মে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আদালতে চার্জশিট জমা দেন।

এ দুটি মামলায় বাদীসহ ৭ জনকে সাক্ষী করা হলেও গত ২১ জানুয়ারা বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পূরক চার্জশিটে আগের চার্জশিটভূক্ত আসামি অভিন্ন রেখে শুধু সাক্ষীর সংখ্যা বাড়ানো হয়। সম্পূরক চার্জশিটে ৮জন তদন্তকারী কর্মকর্তার পাশাপাশি ৩৭ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।
 
চার্জশিটভুক্ত ৬ জনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জে ক্রসফায়ারে নিহত যুবদল ক্যাডার মমিনউল্লাহ ডেভিডের ছোট ভাই শাহাদাতউল্লাহ জুয়েল ও হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান গ্রেফতার রয়েছেন।

পলাতক রয়েছে ওবায়দুল্লাহ রহমান। ভারতের দিল্লী কারাগারে আটক রয়েছেন সহোদর আনিসুল মোরসালিন ও মুহিবুল মুত্তাকিন। আর জামিনে আছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু।
 
নৃশংস সেই বোমা হামলা

প্রসঙ্গত ২০০১ সালের ১৬ জুন শহরের চাষাঢ়াস্থ আওয়ামী লীগ অফিসে দেশের ভয়াবহ নৃশংস বোমা হামলায় মারা যান ২০ জন হতভাগ্য। সেদিন আহত হয়েছিল অর্ধ শতাধিক, অনেকেই বরণ করে নিয়েছে পঙ্গুত্ব, কেঁদে উঠেছিল নারায়ণগঞ্জবাসী।

ঘটনাস্থলে ১১ জন ও পরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর মৃত্যু হয় মোট ২০ জনের। এদের মধ্যে ১৯ জনের পরিচয় সনাক্ত করা হলেও পরিচয় মেলেনি এক নারীর। নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে এই ভয়াবহ স্মৃতি মনে করে আজও শিহরিত হয়ে উঠে এখানকার মানুষ।
 
সেদিন নিহত হয়েছিল শহর ছাত্রলীগের সভাপতি সাইদুল হাসান বাপ্পী, সহোদর সরকারী তোলারাম কলেজ ছাত্র-ছাত্রী সংসদের জিএস আকতার হোসেন ও সঙ্গীত শিল্পী মোশাররফ হোসেন মশু, সঙ্গীত শিল্পী নজরুল ইসলাম বাচ্চু, ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন ভাসানী, নারায়ণগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবিএম নজরুল ইসলাম।

এছাড়া স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা সাইদুর রহমান সবুজ মোল্লা, নারী আওয়ামী লীগ নেত্রী পলি বেগম, ছাত্রলীগ কর্মী স্বপন দাস, কবি শওকত হোসেন মোক্তার, পান সিগারেট বিক্রেতা হালিমা বেগম, সিদ্ধিরগঞ্জ ওয়ার্ড মেম্বার রাজিয়া বেগম, যুবলীগ কর্মী নিধু রাম বিশ্বাস, আব্দুস সাত্তার, আবু হানিফ, এনায়েতউল্লাহ স্বপন, আব্দুল আলীম, শুক্কুর আলী, স্বপন রায় ও অজ্ঞাত এক নারী।

নিহত নারীর পরিচয় পেতে তেমন কোনো চেষ্টা করেনি প্রশাসন। হামলায় শামীম ওসমানসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়। তার ব্যক্তিগত সচিব চন্দন শীল, যুবলীগ কর্মী রতন দাস দুই পা হারিয়ে চিরতরে বরণ করেছে পঙ্গুত্ব।
 
মামলা দায়ের

বোমা হামলার পর দিন খোকন সাহা বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় দুইটি মামলায় (একটি বিস্ফোরক অন্যটি হত্যা) জেলা বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক (বর্তমানে কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-আইন বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা কমিটির সভাপতি) অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারকে প্রধান করে বিএনপি ও এর অঙ্গ দলের মোট ২৭ জনকে আসামি করে।

ঘটনার দীর্ঘ ২২ মাস পর ২০০৩ সালের এপ্রিল মাসে বোমা হামলা ট্রাজেডি মামলা দুটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘উল্লেখিত ২৭ জনের কেউই চাষাড়া আওয়ামী লীগ অফিসে ১৬ জুন ২০০১ সালের বোমা হামলায় জড়িত নয়। যদি ভবিষ্যতে অত্র মামলার তথ্য সম্বলিত ক্লু পাওয়া যায় তবে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার ব্যবস্থা করতে হবে।’

দীর্ঘ প্রায় ৬ বছর মামলাটি হিমাগারে থাকার পর সিআইডির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ২ জুন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে মামলাটি নিষ্পত্তি করার জন্য সরকারকে আদেশ দেয়।

২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঘটনায় নিহত চা দোকানি হালিমা বেগমের ছেলে আবুল কালাম বাদী হয়ে শামীম ওসমান, তার ভাই নাসিম ওসমান, সেলিম ওসমানসহ আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও এর সহযোগী সংগঠনের ৫৮ নেতাকর্মীকে আসামি করে একটি মামলা করেন। পরবর্তীতে উচ্চ আদালত এ মামলাটি খারিজ করে দেয়।
 
দীর্ঘ একযুগ পর মামলার চার্জশিট প্রদান

মামলার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তদন্তাকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এর নারায়ণগঞ্জ অফিসের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) এহসান উদ্দীন চৌধুরী জানান,  ঘটনার দীর্ঘ ১২ বছর পর দু’টি মামলায় ২০১৩ সালের ২ মে ৬ জনকে অভিযুক্ত ও ৩১ জনকে অব্যাহতি প্রদান করে নারায়ণগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দু’টি মামলার প্রত্যেকটির ৯৪৭ পাতার চার্জশিট দাখিল করা হয়।

এসএস/পিআর

আরও পড়ুন