ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

ছয় বছরেই ব্যবহার অনুপযোগী দুই গুচ্ছগ্রামের শত পরিবারের বাসস্থান

ইকবাল হোসেন মজনু | প্রকাশিত: ০৯:৫৫ এএম, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬

নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে আট কিলোমিটার দূরে চরআতাউরে নদীভাঙা অসহায় মানুষের আশ্রয়ে গড়ে তোলা দুটি গুচ্ছগ্রাম এখন জনমানবহীন। সরকার সেখানে একশ পরিবারকে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেও নির্মাণে অনিয়মে মাত্র ছয় বছরেই তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

রোববার (১১ জানুয়ারি) তমরদ্দি ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে চর আতাউরে গিয়ে দেখা যায় সারি সারি শূন্য ভিটায় দাঁড়িয়ে আছে ছাউনি ছাড়া ঘরের কাঠামো। দূর থেকে দেখে মনে হয় ঘরের কঙ্কাল। বৃষ্টির পানিতে ভিটার মাটি ধুয়ে গেছে অনেক আগে। এসব ঘরে এখন আর কোনো প্রাণের স্পন্দন নেই। জনমানবহীন হয়ে পড়েছে প্রতিটি ঘর।

স্থানীয়রা জানান, নদীভাঙনের শিকার ভূমিহীনদের পুনর্বাসনের জন্য সরকার এখানে ১২ একর জায়গায় দুটি গুচ্ছগ্রাম প্রতিষ্ঠা করে। এর একটি তরুবিথী, অন্যটি ছায়াবিথী। ২০১৯ সালে নির্মাণ শেষে প্রত্যেকটিতে ৫০টি পরিবারের থাকার সুব্যবস্থা করা হয়। চারটি নলকূপ, একটি পুকুরসহ দুই কক্ষবিশিষ্ট প্রতিটি বাড়িতে শৌচাগার, রান্নাঘর রাখা হয়। মোট ১০০ পরিবারকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় সেসব বাড়ি।

ঘরগুলো লোহার পাতের ওপর টিন দিয়ে তৈরি করা হলেও বাসিন্দাদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্টদের লুটপাটের কারণে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি ঘরগুলো এখন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। তাই অনেক পরিবার এখান থেকে অন্যত্র চলে গেছে। ঝড়ে টিনের চাল, বেড়া খুলে পড়ে এখন প্রায় ঘরের অস্তিত্ব বিলীন।

তরুবিথীর ৩১ নম্বর ঘরে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করেন সুমি বেগম নামে এক নারী। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, নদীভাঙনের কবলে পড়ে সব হারিয়েছি। ২০২০ সালের দিকে এখানে বসবাস শুরু করি। তিন বছর যেতে না যেতেই সামান্য ঝড়ো-বাতাসে ঘরটি দুলতে থাকে। চালের টিন উড়ে চলে যায়। আমার স্বামী ইটভাটার শ্রমিক, যাওয়ার কোথাও জায়গা নাই। তাই রশি দিয়ে বেঁধে চার সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি।

তরুবিথীর পাশেই ছায়াবিথী গুচ্ছগ্রাম। সেখানে ৫০টি পরিবারের মধ্যে এখন মাত্র সাতটি পরিবার বসবাস করে। অন্য ঘরগুলোতে দরজা, জানালা, বেড়া কিছুই নেই। ঘরগুলোতে কেউ এখন আর বসবাস করে না।

ছয় বছরেই ব্যবহার অনুপযোগী দুই গুচ্ছগ্রামের শত পরিবারের বাসস্থান

ছায়াবিথীর ৩৯ নম্বর ঘরে বসবাস করেন নিখি রানী দাস নামে এক নারী। তার স্বামী মৌসুমি শ্রমিক। জাগো নিউজকে নিখি রানী জানান, গত ৫ বছর ধরে এই চরে বসবাস করে আসছি। দুটি কলোনীতে একশ পরিবারকে সরকারিভাবে থাকার ঘর দেওয়া হয়। কিন্তু নদীর তীরে হওয়ায় ও কোনো ধরনের গাছপালা না থাকায় সামান্য ঝড়ে এসব ঘর ভেঙে গিয়ে থাকার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অনেক ঘরের পিলার খসে চিকন হয়ে গেছে। অসংখ্য ঘরের চালের টিন, বেড়া কিছুই নেই। তাই ভয়ে এখানে কেউ থাকতে চায় না।

নিখি রানী আরও জানান, এই চরে আসার আগে তাদেরকে অনেক সুযোগ সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সেই আশায় এখন গুড়েবালি। জীবিকার ব্যবস্থা করা হবে বলা হলেও ছয় বছরেও কিছু করা হয়নি। বসবাসের ঘরটি ভেঙে পড়লেও সরকারিভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অনেকে অন্যত্র চলে গেছে। কিন্তু আমারতো কিছু নেই। অন্যত্র জায়গা থাকলে এখানে থাকতাম না।

চরআতাউরে প্রথম থেকে বসবাস করে আসছেন খোকন মাঝি। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের মাধ্যমে এ ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়। কিন্তু নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করায় অল্প সময়ের মধ্যে এসব ঘর ভেঙে পড়েছে।

খোকন মাঝি আরও বলেন, এসব পরিবারের জন্য স্থাপন করা গভীর নলকূপগুলো বিকল হয়ে যাওয়ায় খাওয়ার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গুচ্ছগ্রাম দুটিতে মানুষের ব্যবহারের জন্য দুটি পুকুর খনন করা হলেও জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়ে তা সমতল হয়ে গেছে।

কলোনির বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুরুতে এখানে সব সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে কিছুই দেওয়া হয়নি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নাগরিক সুবিধার সবটুকু থেকেই এখানকার বাসিন্দারা বঞ্চিত। বর্তমানে পরিবারগুলো এখানে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এসব ভূমিহীনের একটাই চাওয়া, তাদের শেষ একমাত্র ঠিকানা এই ঘরগুলো যেন দ্রুত ব্যবহারের উপযোগী করে দেওয়া হয়।

হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বলেন, চর আতাউরের গুচ্ছগ্রামগুলোতে বসবাসকারীরা অনেক অসহায়। আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। এবারের শীতেও এসব পরিবারকে শীতবস্ত্র, ত্রাণসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

ইউএনও আরও বলেন, এরই মধ্যে কলোনির বসবাসকারীদের সুবিধার জন্য সেখানে একটি পুকুর খননের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সরকারিভাবে দেওয়া গুচ্ছগ্রামের ঘরগুলো মেরামতে কোনো বরাদ্দ এখনো পাওয়া যায়নি। আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানিয়ে ঘরগুলো মেরামতের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।

এফএ/এমএস