ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

রাজশাহী

শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য: নীরব প্রতিষ্ঠান, অসহায় মাউশি

সাখাওয়াত হোসেন | রাজশাহী | প্রকাশিত: ১২:৩৯ পিএম, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬

ক্লাসরুমে শিক্ষার মান পুনরুদ্ধারে শিক্ষকদের বেসরকারি কোচিং সেন্টার ও কিন্ডারগার্টেনের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হলেও তা প্রায় পুরোপুরি অগোচরে রেখেছে রাজশাহীর বিভাগীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। রাজশাহী অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এই আদেশ বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসনের নীরব অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে।

গত ৩ ডিসেম্বর মাউশির রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে এই নির্দেশনা জারি করা হয়। বিভাগের সব স্কুল ও কলেজকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে অঙ্গনের বাস্তব অবস্থা যাচাই করে কোচিং বাণিজ্যে জড়িত শিক্ষকদের নামের তালিকা পাঠাতে বলা হয়েছিল। কিন্তু মাউশি সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে সাড়া দিয়েছে।

গত বছরের জুন এবং সেপ্টেম্বর মাসে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে রাজশাহী বিভাগীয় পর্যায়ের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে এই নির্দেশনা জারি করা হয়। তবে নীরবতা এবং অমান্যতা স্পষ্ট করে দেখিয়েছে যে, রাজশাহীর শিক্ষা ব্যবস্থায় কোচিং ইন্ডাস্ট্রি কতটা গভীরভাবে গেঁথে গেছে। এখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং নিয়ন্ত্রক সবাই এমন এক চক্রে আবদ্ধ, যা ভাঙা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ বিষয়ে মাউশি রাজশাহীর আঞ্চলিক পরিচালক অধ্যাপক মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান আদেশ বাস্তবায়নে ব্যর্থতা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, বড় সংখ্যক শিক্ষক বাণিজ্যিক কোচিংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে বাস্তবসম্মত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা জানি অনেক শিক্ষক সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কোচিং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত কলেজে আসে না, তারা কোচিং সেন্টারে যায়। কিন্তু আইন প্রয়োগ করা অত্যন্ত কঠিন।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তবে আমি কী ব্যবস্থা নেব? সবাইকে কি শোকজ নোটিশ দেব? তারা যদি আবার নোটিশ উপেক্ষা করে, তখস আমি কী করবো?’

এদিকে মাউশির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক চাপ এই অভিযানের অন্যতম বড় বাধা। বেশিরভাগ শিক্ষক, বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পেয়েছেন এবং তারা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়। আমরা যখনই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাই, রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ থেকে হুমকির মুখোমুখি হতে হয়।

আরেকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্বীকার করেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার ব্যর্থতা এখন আর কোনো নীতিগত বিষয় নয় বরং এটি এখন তাদের নিজেদের পরিবারের জন্যও একটি বাস্তবতা।

তিনি বলেন, আমার ছেলেও কলেজে যায় না, সে কোচিং সেন্টারে যায়। যখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করি কলেজে যাওয়া হয় না কেন, সে বলে কলেজে ক্লাস নিয়মিত হয় না এবং শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকে না।

বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী, সরকারি এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনি বা কোচিং সেন্টার পরিচালনা করা নিষিদ্ধ। লঙ্ঘনকারীদের শনাক্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই এই নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু অধিকাংশ প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ, যারা নিজেরাও এই ব্যবস্থার অংশ, তারা সহযোগিতা করতে অস্বীকার করেছেন।

অনুসন্ধানে দায়িত্বশীল কয়েকজন প্রতিষ্ঠান প্রধান দাবি করেছেন, তাদের তত্ত্বাবধানে কোনো শিক্ষক কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নেই। কিন্তু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বক্তব্য এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

রাজশাহী শহরের এক কলেজছাত্র বলেন, ‘পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য কলেজে ক্লাস করা এখন প্রায় অর্থহীন। শিক্ষকরা সিলেবাস ঠিকঠাক শেষ করেন মূলত কোচিংয়ে। কলেজে ক্লাস অনিয়মিত এবং অতিরিক্ত তাড়াহুড়োয় শেষ করা হয়। তুমি যদি কোচিং না করো, তবে পিছিয়ে পড়বে।’

অভিভাবকরাও একই কথা বলেছেন। তারা কোচিংকে পছন্দের বিষয় নয়, বরং অনিবার্য আর্থিক বোঝা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

আবু সালেহ নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘আমরা কলেজ ফি, পরীক্ষার ফি দিই, তারপর আবার একই শিক্ষকদের কোচিং ফি দিই। কিন্তু আমার সন্তান যদি কোচিং না করে, তাহলে ক্লাসে তাকে উপেক্ষা করা হয়।’

অন্যদিকে রাজশাহীর অধিকাংশ কোচিং সেন্টার অতিরিক্ত ফি আদায় করছে। অনেক সময় ভর্তির সময়ই পুরো বছরের ফি আদায় করা হয়। বিষয় ও প্রতিষ্ঠানভেদে শিক্ষার্থীদের ৩০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত এককালীন পরিশোধ করতে হয়, যা পরিবারগুলোর জন্য বড় আর্থিক চাপ।

শিক্ষাবিদরা মনে করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক সমর্থন এবং প্রশাসনিক সাহসের অভাবেই এই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক দীপক দাস বলেন, ‘ক্লাসরুমে শিক্ষার মান না থাকা, জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রবল প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষকদের দ্রুত ধনী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে।’

তিনি বলেন, ‘যদি কর্তৃপক্ষ এক-দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিত, তাহলে অন্যদের মধ্যে ভীতি তৈরি হতো। মূলত নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা এবং শিক্ষকদের নৈতিক অবক্ষয়ই এই অশিক্ষামূলক প্রথা টিকিয়ে রেখেছে, যা সমস্যার মূল কারণ।’

এফএ/এএসএম