৩০ বর্গ কিলোমিটারে ৩৬ ইটভাটা
মানিকগঞ্জের সিংগাইরের ৩০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বলধারা ইউনিয়নে রয়েছে ৩৬টি ইটভাটা। ছবি: জাগো নিউজ
মানিকগঞ্জের সিংগাইরের বলধারা ইউনিয়ন এখন যেন ইটভাটার এক বিশাল ভাগাড়। ৩০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ইউনিয়নে ৩৬টি ইটভাটার বিষাক্ত নিশ্বাসে থমকে গেছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। চকের উর্বর মাটি চলে যাচ্ছে ভাটায়, আর আকাশ ঢেকে যাচ্ছে কালো ধোঁয়ায়। যার ফলে, ফলন কমছে কৃষিজমিতে, ধ্বংস হচ্ছে গ্রামীণ রাস্তাঘাট আর চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্টে ভুগছে হাজারো শিশু ও বৃদ্ধ। মূলত ইটভাটার গ্রাসে হারিয়ে যেতে বসেছে একটি পুরো ইউনিয়ন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার ৪ নম্বর বলধারা ইউনিয়নের মোট আয়তন ৩০.৩১ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা রয়েছে মোট ২৯,০৮৫ জন। আর এই ইউনিয়নেই গড়ে উঠেছে ৩৬টি ইটভাটা। এর মধ্যে চলমান রয়েছে ২৬টি ইটভাটা। এর মধ্যে গত অর্থ বছরে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করেছিলেন ১৫টি ভাটা। এবং চলতি অর্থবছরের ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করেছেন ১৮টি ইটভাটা।
স্থানীয়রা জানান, ইটভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা, চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন শিশু ও বৃদ্ধরা। কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, ফসলের ফলন কমে যাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ির আশপাশে ইটভাটা থাকায় স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ভাটার কার্যক্রম বেড়ে গেলে পুরো এলাকা ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। দিনের পর দিন সূর্যের আলো পর্যন্ত ঠিকমতো দেখা যায় না বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী।

বলধারা ইউনিয়নের মো. সোলাইমান মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, এই ইউনিয়নের রাস্তাঘাট আগে খুব ভালো ছিল। এই ইটভাটাগুলোর কারণে টলি গাড়ি চলার কারণে রাস্তাঘাট ভেঙে গেছে। আমাদের কথাবার্তা তারা মানে না। মাটি কাটার কারণে ইউনিয়নটাই নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষেতের ফসলগুলো বাজারে নিতে পারি না রাস্তা খারাপ হওয়ার কারণে।
৭০ বছরের বৃদ্ধ আওলাদ হোসেন। বাবার দেখানো পেশা কৃষি কাজের ওপর নির্ভরশীল। পরিবারের হাল ধরার মতো কোনো ছেলে না থাকায় নিজেই কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘‘এই ইট খোলার মালিকরা ভালো জমি কাইটা মাটি নিয়ে যাওয়ার কারণে আমাগো রাস্তার অনেক সমস্যা। আর ফসল আগের মত হয় না। আগে যে জমিতে আমরা ৫ মন ফসল পাইতাম এহল ওই জমিতে দুই থাইকা তিন মন পাই। আমাগো অনেক সমস্যা। এই ইটখোলা বন্ধ হলে আমাগো অনেক ভালো হয়। বাপু আমরা গরীব মানুষ আপরা প্রতিবাদও করবার পারি না। ঘরের টিনগুলোও নষ্ট হয়ে যাইতাছে। গাছে ফল ধরে না’’।
ইউনিয়নের চরমগড়া গ্রামের আজগোর আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই ইটভাটার কারণে রাস্তার অনেক ক্ষতি হইয়া যাইতেছে। ধুলোবালির কারণে ঘরের টিনগুলোও নষ্ট হয়ে যাইতেছে। চকে ফলন হয় না। চকের মাটি কাইটা নিয়া যায়। আমরা খুব অসুবিধার মধ্যে আছ’।
এ বিষয়ে সিংগাইর ইট ভাটার মালিক সমিতির সভাপতি ইলিয়াস হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের ইটভাটা যে ছিবনি আছে সেগুলোকে জিগজ্যাগ চিমনি বলা হয়। এই জিনিসগুলোর নিচে পানি দেওয়া থাকে, সেই পানিতে ইট পোড়ানোর যে ধোঁয়া, সেই ধোঁয়া ফিল্টার হয়ে বের হয়, এর ফলে ফসলের কোনো ক্ষতি হয় না। আর আমরা ইট তৈরির জন্য যে মাটি ব্যবহার করি, সেগুলো এক ফসলি জমির মাটি। তাছাড়া এগুলো বেশিরভাগ ইট ভাটার মালিকদের নিজেদের জমি।

বলধারা ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আফজাল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ইট ভাটার কারণে এই ইউনিয়নের ফসলের মাঠে তুলনামূলকভাবে ফলন কম হয়। ইট ভাটার ধোঁয়া যে ফসলে লাগে সেই ফসলের ক্ষতি হয়। মোট কথা ইট ভাটার কারণে চার ভাগের এক ভাগ ফসল কম পায় কৃষক।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন জাগো নিউজকে বলেন, এই ভাটাগুলো একদিনে গড়ে উঠে নাই, বিভিন্ন সময়ে গড়ে উঠেছে। একটি ইউনিয়নে কী পরিমাণ ইটভাটা থাকা প্রয়োজন এটার কোনো লিমিট নাই।
তিনি বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তর সে নিয়মনীতি রয়েছে, সেগুলো দেখেই ছাড়পত্র দিয়েছে। একটি ইটভাটা থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড এবং সালফার ডাই অক্সাইড নির্গত হয়। ইটভাটা যত কম থাকবে পরিবেশ ততটাই ভালো থাকবে। বেশি ইটভাটা থাকলে অবশ্যই পরিবেশের ক্ষতি হবে। এছাড়াও এই ইট ভাটার ধোঁয়ার কারণে যদি বায়ু দূষণ হয়, মানুষের ফুসফুস জনিত যে রোগ সেই রোগে মানুষ আক্রান্ত হবে এটাই আমাদের ধারণা।
কেএইচকে