তারেক রহমানকে দেখতে লাখো মানুষের ভিড়
ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। রোদের তাপ, ধুলো আর ভিড়ের ক্লান্তি উপেক্ষা করে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা লাখো নারী-পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধ। কারও কোলে শিশু, কারও হাতে বৃদ্ধ মায়ের হাত- আবার কেউ বা বাবার ঘাড়ে। সবার চোখে একটাই প্রত্যাশা- এক নজর তারেক রহমান।
দীর্ঘ ২০ বছর পর শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টায় সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্প পার্ক এলাকায় নির্বাচনি এক জনসভায় উপস্থিত হন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এদিন সকাল থেকে সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে মানুষ জনসভা স্থলে সমবেত হতে থাকে। তবে সময় গড়ালেও মাঠ ছাড়েনি জনতা। অপেক্ষা যেন এখানে ক্লান্তি নয় বরং এক ধরনের আবেগে পরিণত হয়েছিল।
জনসভাস্থলে অনেক নারীকে দেখা গেছে চোখে পানি নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে। কেউ বলছিলেন, জানি না কখন আসবেন, তবু না দেখে যাব না। বৃদ্ধদের কেউ লাঠি ভর দিয়ে, কেউ নাতির হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন দীর্ঘ সময়। শিশুদের মাঝেও ছিল উৎসুক দৃষ্টি। চারপাশের স্লোগান আর উত্তেজনায় তারা যেন বুঝে নিয়েছে, আজকের দিনটা একটু আলাদা।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বিকেল ৩টা ৩৪ মিনিটে যখন তারেক রহমান মঞ্চে উঠলেন। মুহূর্তে জনসভাস্থল রূপ নেয় আবেগের সাগরে। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। অনেককে দেখা যায় মোবাইল ফোন উঁচিয়ে ধরে সে মুহূর্ত ধরে রাখার চেষ্টা করতে, কেউ আবার চোখ ভেজা অবস্থায় নীরবে তাকিয়ে থাকেন মঞ্চের দিকে।
২০ মিনিটের বক্তব্যে তারেক রহমান শুরুতেই বলেন, সিরাজগঞ্জের মেরিকে আপনেরা সবাই চেনেন, মেরি ভোট ডাকাতির প্রতিবাদ করতে গিয়ে দৃষ্টি হারিয়েছে। এ রকম হাজারও মেরি বাংলাদেশে রয়েছে। গত ষোলো সতোরো বছর ধরে তারা রাজনৈতিক, ভোট ও কথা বলার অধিকার নিয়ে প্রতিবাদ করেছে। এ প্রতিবার করতে গিয়ে অনেকে জীবন হারিয়েছেন। এসব মানুষের আত্মত্যাগ যদি আমাদের মূল্যায়ন করতে হয়। তাহলে শুধু মাত্র এ জনসভা করলে আমাদের হবে না। তাদের প্রতিবাদ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের যে অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল সেটার বিরুদ্ধে। এ অধিকারকে যদি প্রয়োগ ও ফিরিয়ে আনতে হয়, তাহলে অবশ্য আগামী ১২ তারিখে প্রত্যেককে সোচ্চার হতে হবে। ১২ তারিখে যদি ধানের শীষে সিল মারার মাধ্যমে জবাব দিতে পারেন, তবে স্বৈরাচাররা সেই জবাব পাবে। আমরা যারা বিএনপি করি, তারা শান্তিতে বিশ্বাস করি।
সব ধর্ম-বর্ণের মানুষকে নিয়ে আমরা এক সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে চাই। আমাদের কাছে মুখ্য হচ্ছে সে বাংলাদেশের নাগরিক। আমাদের কাছে ধর্ম ও জাত-পাত মুখ্য নয়। আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে চাই।
তারেক রহমান বলেন, আমরা যদি দেশে জনগণের শাসন কায়েম করতে পারি। দেশে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার গঠন করতে পারি। তবেই সম্ভব দেশ ও জনগনের প্রকৃত সমস্যা সমাধান করা। সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় অনেক কাজ করার আছে। যে কাজ গুলো করলে এলাকার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। যে কাজগুলো করলে এলাকার উন্নয়ন হবে। আমরা আন্দোলন ও সংগ্রাম করে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছি। এখন আমাদের দেশ গড়তে হবে। আমাদের সবাইকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে।

সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় যেমন কৃষি আছে, তেমন একইভাবে ছোট ছোট মিল কারখানাও রয়েছে। কিন্তু এ মূহুর্তে কৃষিকে যেমন টেনে উঠাতে হবে, ঠিক তেমনি কৃষক ভাইদেরও পাশে দাঁড়াতে হবে। একই সঙ্গে লাখ লাখ তরুণ ও যুব সমাজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন শিল্প ও শিল্প পার্ক স্থাপনের মাধ্যমে আমাদের এ সমস্যা সমাধান করতে হবে।
যেহেতু উত্তরাঞ্চল কৃষির সঙ্গে জড়িত বেশি, কৃষিজীবী মানুষ এ অঞ্চলে বেশি। সে জন্য ঠাকুরগাঁও থেকে শুরু করে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত আমরা কৃষিনির্ভর শিল্প গড়ে তুলতে চাই। যে কৃষি নির্ভরশিল্প গড়ে তুললে এ এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।
তারেক রহমান আরও বলেন, আমরা যদি তাঁত শিল্পের লুঙ্গির কথা বলি তাহলে প্রথমে চোখের সামনে ভেঁসে উঠে সিরাজগঞ্জ ও পাবনা। এ এলাকার বহু মানুষ তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত। আমরা যদি তাঁত শিল্প নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারি, তাহলে তাঁত শিল্পের উৎপাদিত পণ্য সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হবো। আমরা আগামী দিনে তাই করতে চাই। ইনশাল্লাহ আগামীতে আমরা এটা বাস্তবায়ন করবো।
প্রিয় ভাই-বোনেরা আমাদেরকে আগামীতে আরও অনেক কাজ করতে হবে। আমাদের মা-বোনদেরকে স্বাবলম্বী করতে হবে। আগামীর ধানের শীষের সরকার মা-বোনদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এজন্য আমরা বাংলাদেশের প্রত্যেক মা-বোনদের কাছে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দিতে চাই। এতে তারা স্বাবলম্বী হবেন।
আমরা কৃষক ভাইদের পাশেও দাঁড়াতে চাই, এদেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষক। এদেশে কৃষকরা ভালো থাকলে একমাত্র বাংলাদেশের মানুষকে ভালো রাখা সম্ভব। কৃষকরা সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। তাদের এ পরিশ্রমের ফলে সারাদেশের মানুষ দু’বেলা ও তিনবেলা ভাত খেয়ে বেঁচে থাকে। আমরা এ কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের হাতে প্রয়োজনীয় সার, কীটনাশক ও ফসলের বীজ ঘরে ঘরে তুলে দিতে চাই। যাতে করে কোনো মধ্যসত্বভোগী বা ফরিয়া যেন সুবিধা না পায়। আর এজন্য আমরা কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড দিতে চাই।
বর্তমানে দেশের তরুণরা আইটি সেকশনে কাজ করে। এ সিরাজগঞ্জ ও পাবনার অনেক তরুণ ও যুবকরা এ কাজে জড়িত রয়েছে। তাদের আমরা বিশেষভাবে ট্রেনিং দিতে চাই। যাতে তারা তাদের কর্মকাণ্ড আরও ভালো করতে পারেভ। একইভাবে এ এলাকার বহু মানুষ বিদেশে যায়। কিন্তু বিদেশে যখন যায়, তখন তাদের কোনো ট্রেনিং থাকে না। আমরা সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার চালু করবো। যাতে বিদেশে গিয়ে তারা ভালো বেতনে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেন।
সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি রুমানা মাহমুদের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চুর সঞ্চালনায় জনসভায় তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার সংসদীয় আসনের দলীয় প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
এমএ মালেক/আরএইচ/এএসএম