শিক্ষকের মানসিক চাপের অভিযোগ, মেডিকেল শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘিরে রহস্য
কুমিল্লায় একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে অর্পিতা নওশিন (২২) নামে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে হোস্টেলের কক্ষ থেকে তাকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে সহপাঠীরা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ওই কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের শিক্ষক ডা. মুনিরা জহিরের রোষানলে পরে ট্যাবলেট সেবন করে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ছাত্রী অর্পিতা নওশিনের মৃত্যুর সঠিক কারণ অনুসন্ধানে কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে ৩ সদস্যের একটি তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৭ কর্মদিবসের মধ্যে তাদেরকে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
অর্পিতা নওশিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলায় অবস্থিত কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি খুলনা সদর উপজেলায়। তিনি খুলনার সরকারি করনেশন গার্লস হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং খুলনা কলেজিয়েট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কেসিসি উইমেন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে কুমিল্লার বেসরকারি সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন।
শনিবার (৪ এপ্রিল) কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই শিক্ষার্থীর মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এ ঘটনায় কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
এদিকে অর্পিতা নওশিনের মৃত্যুর পর অ্যানাটমি বিভাগের ওই শিক্ষক ডা. মুনিরা জহির গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন। তিনি কারো কল ধরছেন না। ফোনও বন্ধ রাখছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নওশিনের একাধিক সহপাঠী বলেন, ‘প্রথম বর্ষ থেকেই কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের শিক্ষক ডা. মুনিরা জহিরের রোষানলে পড়েন নওশিন। প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষায় অন্যান্য সব বিষয়ে পাস করলেও অ্যানাটমিতে ফেল করেন তিনি। এরপর গত তিন বছরে আরও চারবার একই বিষয়ে পরীক্ষা দিলেও প্রতিবারই অকৃতকার্য হন। প্রথম বর্ষে থাকতেই প্রকাশ্যে তাকে ফেল করানোর হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তবে ঠিক কী কারণে ওই শিক্ষক এমন আচরণ করেছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। তাকে প্রতিনিয়ত মানসিক চাপে রাখার কারণে নওশিন ১০৯টি ট্যাবলেট সেবন করে আত্মহত্যা করেছেন।’
২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী জানান, গত ৮ মার্চ চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তাদের ব্যাচের তৃতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। একই সেশনের অন্য শিক্ষার্থীরা এখন পঞ্চম বর্ষে পড়লেও নওশিন এখনো প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষাতেই আটকে আছেন।
নওশিনের ভাই শাহরিয়ার আরমান সাংবাদিকদের বলেন, আমার বোনের আত্মহত্যা করার মতো মানসিকতা ছিল না। কলেজের মানসিক চাপই তাকে এই পথে ঠেলে দিয়েছে। প্রথম বর্ষ থেকেই তাকে মানসিকভাবে নিপীড়ন করা হয়েছে। সবাই পাস করলেও আমার বোনকে একটি বিষয়ে আটকে রাখা হয়েছে। তার সমস্যা কী, সেটাও কেউ বলেনি। বৃহস্পতিবারও তার সঙ্গে কথা হয়েছে। ফরম পূরণের জন্য টাকা চেয়েছিল। আমি আশ্বস্ত করেছিলাম টাকা পাঠাবো। এমন খবর পাবো, কখনো ভাবিনি।
এ বিষয়ে জনতে অভিযুক্ত শিক্ষক ডা. মুনিরা জহিরকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ফজলুল হক বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৭ মিনিটে ওই শিক্ষার্থীর অসুস্থতার খবর পাই। এরপর জরুরি বিভাগে থাকা সব চিকিৎসককে প্রপার ট্রিটমেন্টের অনুরোধ জানাই। তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান সে মারা গেছে। সঙ্গে সঙ্গে আমি ও পরিচালক হাসপাতালে ছুটে যাই। নওশিনের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে তার ভাই শাহরিয়ার আরমান বিকেলে মরদেহ নিয়ে গেছেন। এ ঘটনায় আমাদের পক্ষ থেকে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছি। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে তাদেরকে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
অ্যানাটমি বিভাগের অভিযুক্ত শিক্ষক ডা. মুনিরা জহিরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঘটনার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে কথা হচ্ছে। এজন্যই আমরা তদন্ত কমিটি করেছি। যদি এ ঘটনায় কেউ যুক্ত থাকেন, তদন্তে প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল মোস্তফা বলেন, এ ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে শিক্ষার্থীর মরদেহ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। যেহেতু অভিযোগ উঠেছে পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে।
জাহিদ পাটোয়ারী/এফএ/এমএস