সংকটে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, নিষ্ক্রিয় বন বিভাগ
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে প্রাণী বলতে এখন বানর, অজগর আর শূকরের দেখা মেলে। ছবি-জাগো নিউজ
৩০ বছর আগে ১৯৯৬ সালে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়াকে ঘোষণা করা হয় ‘জাতীয় উদ্যান’। তবে বিভিন্ন কারণে স্বকীয়তা হারাচ্ছে ১২৫০ হেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ এ বন। মূল্যবান গাছ, বাঁশ ও বেত চুরি এখন নিত্য ঘটনা। আগের চেয়ে কমে গেছে বনের ঘনত্ব। দখল হয়েছে অনেক বনভূমি। কমে এসেছে প্রাণীদের সংখ্যা। দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট।
নিয়ন্ত্রণ নেই সড়ক ও রেলপথের। এমনকি বনের সীমানা কতটুকু, তাও জানা নেই বন বিভাগের। সব মিলিয়ে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও বাস্তবে লাউয়াছড়া বন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না বন বিভাগ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশের সাতটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে অন্যতম লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। এটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এ বনে ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, চার প্রজাতির উভচর, ছয় প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি এবং ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। বন বিভাগের কাগজে-কলমে এগুলো উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এখন কী পরিমাণ প্রাণী আছে জানা নেই কারও।
সীমানা জানে না বন বিভাগ
জাতীয় এ উদ্যানের উল্লেখযোগ্য সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম সীমানা নির্ধারণ না করা। জাতীয় উদ্যান ঘোষণার পর দীর্ঘ ৩০ বছর অতিবাহিত হলেও এখনো সীমানা নির্ধারন করা যায়নি। জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের মাধ্যমে বন বিভাগ সীমানা নির্ধারনের উদ্যোগ কয়েকবার নেওয়া হলেও বাস্তবে তা রূপ নেয়নি। বনের পাশে যাদের জমি রয়েছে, তাদের অনেকেই বনের জমি দখল করে রেখেছেন। অনেকে আবার বনের জমি দখল করে গড়েছেন বাগান। মাঝেমধ্যে বন বিভাগ এসব জায়গা উদ্ধারে অভিযান চালালেও সীমানার চিহ্ন না থাকায় বাধাগ্রস্ত হয় উদ্ধারকাজ। পাশাপাশি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির সঙ্গেও বনের জায়গা দখল করেছেন অনেকেই।
‘বনের ভেতর সড়ক ও রেলপথ রয়েছে। এসব সড়ক ও রেলপথে সর্বোচ্চ গতিসীমা ২০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ নেই। ২৪ ঘণ্টা গাড়ি ও ট্রেন চলাচল করায় প্রতিনিয়ত প্রাণীরা গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ লাইন থাকায় স্পৃষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে অনেক প্রাণী’
সংরক্ষিত বন ঘোষণার পর থেকেই বনের চারপাশ খোলা ও বনের ভেতরে সড়ক থাকায় সহজেই গাছ, বাঁশ, বেতসহ মূল্যবান জিনিস চুরি হয়ে যাচ্ছে। গত দুই দশকে আশঙ্কাজনকভাবে চুরি বেড়েছে। এতে করে বনের ভেতরের ঘনত্ব ও প্রাণীদের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতরের দৃশ্য/ছবি-সংগৃহীত
বনের ভেতর সড়ক-রেলপথ
বনের ভেতর সড়ক ও রেলপথ রয়েছে। এসব সড়ক ও রেলপথে সর্বোচ্চ গতিসীমা ২০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ নেই। ২৪ ঘণ্টা গাড়ি ও ট্রেন চলাচল করায় প্রতিনিয়ত প্রাণীরা গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ লাইন থাকায় স্পৃষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে অনেক প্রাণী।
বনে প্রাণীদের খাদ্য সংকটও বেড়েছে। শুষ্ক মৌসুমে খাবারের পাশাপাশি পানির সংকট দেখা দেয় ছড়া শুকিয়ে যাওয়ার কারণে। এসময় খাবারের সন্ধানে অনেক প্রাণী লোকালয়ে চলে আসে। অনেক সময় মানুষেন আঘাতে মারা যাচ্ছে এসব প্রাণী। অথচ এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেই বন বিভাগের।
আরও পড়ুন:
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে প্রাণীদের অবাধ বিচরণ কমে গেছে, কারণ কী?
লাউয়াছড়া উদ্যানে গাড়ি পার্কিংয়ে নিষেধাজ্ঞা, বিপাকে পর্যটক
লাউয়াছড়া উদ্যানে পানি সংকটে বন্যপ্রাণী
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে কমেছে গাছপালার সংখ্যা/ছবি-জাগো নিউজ
পর্যটক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটা সময় বনের ভেতরে বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের বৃহত্তম অভয়ারণ্য ছিল। বনে প্রবেশ করলে সহজেই এ প্রাণীর দেখা মিলতো। তবে এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। বনের ভেতর প্রাণী বলতে এখন বানর, অজগর সাপ আর বন্যশূকরের দেখা মেলে।
‘দ্রুততম সময়ে লাউয়াছড়া বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা উচিত। দখলকৃত জায়গা উদ্ধার করে বনের সীমানা চিহ্ন দেওয়া খুবই প্রয়োজন। প্রাণীদের প্রয়োজনে যা যা করণীয় তাই করতে হবে।’
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ঘুরতে আসা চট্টগ্রামের পর্যটক শাহান আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা কয়েকজন বন্ধু লাউয়াছড়া বনে ঘুরতে এসেছিলাম। তবে বনের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। বানর ছাড়া আর কোনো প্রাণী দেখা যায় না। পর্যটকরা যত্রতত্র ময়লা ফেলে রাখছেন। বনকে নিয়মতন্ত্র করতে হলে বন বিভাগকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
স্থানীয় আবিদ হাসান ও মুসা আহমেদ বলেন, ‘সময়ে যত যাচ্ছে বনের অবস্থা তত করুণ হচ্ছে। বনের ভেতর রেললাইন ও সড়কপথে প্রতিনিয়ত প্রাণীরা মারা যাচ্ছে। বন থেকে নিয়মিত গাছ-বাঁশ উজাড় হচ্ছে। বনের সেই আগের পরিবেশ আর নেই।’
বনে পর্যটকদের পদচারণা/ছবি-জাগো নিউজ
নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটক
গত কয়েকবছর ধরে বিভিন্ন ছুটিতে বিশেষ করে ঈদের সময় অতিরিক্ত পর্যটক আসছেন জাতীয় এ উদ্যানে। তবে কিছু সংখ্যক পর্যটক টিকেট কেটে প্রবেশ করলেও বেশিরভাগ পর্যটক বিনা টিকেটে প্রবেশ করেন। বনের চারপাশ খোলা থাকায় সহজেই পর্যটক ভেতরে ঢুকতে পারছে। এসব পর্যটক বন বিভাগের কোনো নির্দেশনা তোয়াক্কা না করেই যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলে রাখেন। বনের ভেতর হল্লাচিল্লা করেন। এতে করে প্রাণীদের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ বলছে, বনে খাবারের সংকট নেই। পাকা ধানের সময় শূকরের দল মাঝেমধ্যে ধান খেতে চলে যায়। বনের সীমানা নির্ধারণের জন্য সিলেট জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস চিঠি পাঠানো হয়েছে। এছাড়া সড়ক ও রেলপথ গাড়ি ও ট্রেনের সর্বোচ্চ গতিসীমা ২০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কেউ-ই এ নিয়ম মানতে চান না। আগত পর্যটকদের নির্দেশনার জন্য বেশকিছু বোর্ড লেখা আছে। বেশিরভাগ পর্যটক এ নির্দেশনা পড়লেও মেনে চলেন না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কার্য পরিষদের সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল জাগো নিউজকে বলেন, ‘দ্রুততম সময়ে লাউয়াছড়া বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা উচিত। বনের দখলকৃত জায়গা উদ্ধার করে বনের সীমানা চিহ্ন দেওয়া খুবই প্রয়োজন। প্রাণীদের প্রয়োজনে যা যা করণীয় তাই করতে হবে। তবে বনের প্রাণীদের কষ্ট দিয়ে কোনো কিছু করা যাবে না।’
আরও পড়ুন:
লাউয়াছড়ায় বেসামাল পর্যটক, বনে অস্থিরতা আতঙ্কে প্রাণীরা
লাউয়াছড়া: মানুষের আঁচড়ে প্রকৃতি ক্ষত-বিক্ষত
তিনি আরও বলেন, ‘বন থেকে গাছ, বাঁশ উজাড় হচ্ছে। বনের ঘনত্ব কমে এসেছে। এগুলো রক্ষা করা বন বিভাগের দায়িত্ব। বছরে ছয় মাস বনে পর্যটক প্রবেশ বন্ধ করতে হবে।’
প্রাণীদের সুরক্ষায় যা যা প্রয়োজন তাই করা হচ্ছে বলে জানান বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ কাজী নাজমুল হক।
বনের ভেতর দিয়ে চলে গেছে রেললাইন/ছবি-জাগো নিউজ
তিনি বলেন, ‘বনে অতিরিক্ত মানুষ প্রবেশ করছে যা নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। বনের ভেতর দিয়ে চলা সড়ক ও রেলপথ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কয়েকবার বন বিভাগ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে কেউ তা মেনে চলেন না।’
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম বলেন, ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সড়কপথে গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। পর্যটকের সংখ্যাও বেড়েছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।’
বনের সীমানা নির্ধারণে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে চিঠি পাঠানো হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বনের ভেতরে পর্যটককে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। পর্যটকরা যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করছেন।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান/ছবি-জাগো নিউজ
বনে প্রাণীদের খাবার সংকট হয় না দাবি করে এই কর্মকর্তা আরও বলেন, সাধারণত লতাপাতা খেয়ে প্রাণীরা বেঁচে থাকে।
তবে বন জরিপের বিষয়ে কোনো চিঠি পাননি বলে জানান সিলেট জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের ভারপ্রাপ্ত চার্জ অফিসার সোনিয়া সুলতানা।
তিনি বলেন, ‘লাউয়াছড়া বনের জরিপ নিয়ে বন বিভাগের পক্ষ থেকে আমি কোনো চিঠি পাইনি। চিঠি এলে অফিসে গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। আমাদের কাছে আবেদন করলে বন জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
এম ইসলাম/এসআর/জেআইএম