চাকা ঘোরে কিন্তু ভাগ্য ফেরে না মৃৎশিল্পীদের
সুনিপুণ হাতে মাটি দিয়ে তৈজসপত্র তৈরি করছেন মৃৎশিল্পী/ছবি: জাগো নিউজ
একসময় মাটির তৈরি জিনিসপত্র ছিল সংসারের নিত্যদিনের সঙ্গী। স্বাস্থ্যসম্মত, পরিবেশবান্ধব ও সহজলভ্য হওয়ায় প্রায় প্রতিটি পরিবারই মাটির তৈজসপত্র ব্যবহার করতো। তবে কালের বিবর্তনে ধাতুর তৈরি তৈজসপত্রের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মাটির তৈজসপত্র এখন বিলুপ্তপ্রায়।
শিল্প বিপ্লবের কারণে মৃৎশিল্প হারাতে বসলেও দেশের কিছু স্থানে এখনো বংশপরম্পরায় বেঁচে থাকার তাগিদে কেউ কেউ ধরে রেখেছেন মৃৎশিল্পের এই পেশা। গাইবান্ধায় অস্তিত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে আছে এমনই কিছু কুম্ভকার সম্প্রদায়ের পরিবার।
তুলনামূলক কম দামে অধিক টেকসই সিলভার, মেলামাইন ও প্লাস্টিক সামগ্রীর দাপটে এক সময়ের চাহিদার তুঙ্গে থাকা মৃৎশিল্প কালের বিবর্তনে বিলুপ্তির পথে। ফলে মৃৎশিল্পের কারিগরদের অর্ধাহারে-অনাহারে দুর্বিষহ দিন কাটছে। সংসার চালাতেও হিমশিম খাচ্ছেন তারা। ভালো নেই তাদের সামাজিকসহ পারিপার্শ্বিক অবস্থানও।
আগে অনেক মানুষ মাটির কাজ করতেন। এখন তরুণরা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। মাটির জিনিসের চাহিদা কমে যাওয়াই এর মূল কারণ। প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই মৃৎশিল্প এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে। বৈশাখী মেলা ঘিরে সাময়িক চাহিদা বাড়লেও সারা বছরের চিত্র হতাশাজনক। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা ছাড়া এই শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পূর্বপুরুষদের পেশা ধরে রাখতে এখনো অনেক পরিবার তাদের হাতের নান্দনিক ছোঁয়ায় মাটির থালা-বাসন, হাঁড়ি-পাতিল, ঘটি-বাটি, বদনা, পুতুল, ফুলের টব, ফুলদানি, জীবজন্তু, পাখিসহ বাংলার চিরাচরিত সব নিদর্শন তৈরি করছে। কিন্তু বাজারে মৃৎশিল্পের কদর কমে যাওয়ায় পেশাগত পরিবর্তনের কারণে তা অনেকটাই কমে গেছে। জেলার সাতটি উপজেলায় অসংখ্য কুমারপাড়া থাকলেও, আগের মতো মাটির জিনিসপত্র তৈরির ধুম নেই। কুমারপাড়াগুলোয় সুনসান নীরবতা।
আরও পড়ুন:
বিলীনের পথে মাটির খেলনা, কুমারপল্লিতে বিষাদের ছায়া
বিশ্ব ঐতিহ্যের জামদানি বুনেও কষ্টে তাঁতির জীবন
দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র না থাকায় হতাশ উদ্যোক্তারা
বাপ-দাদার পেশাকে আঁকড়ে ধরে আছেন হাজার প্রতিকূলতার মধ্যেও। তবে বাঙালির প্রাণের বৈশাখী মেলাকে ঘিরে বিভিন্ন পালপাড়ায় মৃৎশিল্পীদের কর্মচাঞ্চল্য দেখা দেয়। বৈশাখী মেলাই এখন তাদের প্রধান ভরসা।

সম্প্রতি গাইবান্ধা জেলার রামচন্দ্রপুর, ভেলাকোপা, সাহাপাড়া, নারায়ণপুর ও রসুলপুর এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের সহযোগিতা করতে ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। বেশ কয়েকবার তাদের ঋণ দিয়ে শিল্পকে টিকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তাদের ঋণ দিলে, জিনিসপত্র বিক্রি করে পরিশোধের কোনো সক্ষমতা নেই। কারণ মানুষ আর মাটির জিনিসপত্র কিনতে চায় না। এটা মূল সমস্যা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাইবান্ধা জেলার বহু পরিবার এখনও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ পেশার সঙ্গে জড়িত। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিক, মেলামাইন ও স্টিলের পণ্যের ব্যবহার বাড়ায় মাটির তৈরি জিনিসের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে সারা বছর কাজের সুযোগ না থাকায় বৈশাখী মেলাকেই কেন্দ্র করে কিছুটা আয়-রোজগারের আশা করেন তারা।
গাইবান্ধা সদর সাহাপাড়া এলাকার নারায়ণ বাবু পাল বলেন, বাবার হাত ধরেই এ পেশায় আসা। আগে মাটির চাকে কাজ করতাম, যা ছিল খুব পরিশ্রমের। এখন কিছুটা মেশিনের ব্যবহার শিখেছি। তবুও আগের মতো চাহিদা নেই।
নারায়ণপুরের মৃৎশিল্পী মাধবী রানী ও স্নিগ্ধা রানীসহ আরও অনেকে বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে মাটির কাজ শিখেছি। বিয়ের পরও এই কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু এখন আর আগের মতো বিক্রি হয় না। প্লাস্টিকের জিনিস আসায় মাটির কাজের কদর অনেক কমে গেছে।
রামচন্দ্রপুরের খোকন পাল বলেন, একসময় মাটির তৈরি জিনিসপাতির চাহিদা ছিল। এক কথায় গ্রামের প্রায় সবাই মাটির তৈরি জিনিসপাতি ব্যবহার করতো। মাত্র দুই যুগের ব্যবধানে তা যেন বিলুপ্তির পথে। শুধু বৈশাখ মাসকে ঘিরে সামান্য খেলনা তৈরি করি। অন্য মাসগুলোতে কেউ কিনতেই চায় না।
আরও পড়ুন:
পাহাড়ি নারীদের তৈরি পিনন-হাদির কদর দেশ পেরিয়ে বিদেশে
বিয়ের টোপর-কপালি গড়ে ৩০ বছর ধরে সংসার চলে মিঠুন কুমারের
বাঁশ শিল্পে বিষাদের ছায়া
নির্মল পাল বলেন, মাটির তৈরি জিনিসের কোনো দাম নেই এখন। তৈরি করলেও বেচা হয় না। শুধু বাপ-দাদার পেশার অস্তিত্ব টিকে রাখতে এ পেশা ধরে রেখেছি।

রসুলপুর এলাকার যতিন্দ্র নাথ বলেন, এটি আমাদের বাপ-দাদার পেশা। কিন্তু এখন এই কাজ করে সংসার চালানো কঠিন। খরচ বেড়েছে, লাভ কমেছে। তাই নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আসতে চায় না।
পালপাড়ার সুচিত্রা পাল বলেন, প্রায় ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে মাটির ব্যাংক ও খেলনা বানাচ্ছি। আগে অনেক বিক্রি হতো, এখন শুধু বান্নি মেলার সময় কিছুটা বিক্রি হয়।
শিক্ষক হারুন অর রশিদ বলেন, আগে অনেক মানুষ মাটির কাজ করতেন। এখন তরুণরা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। মাটির জিনিসের চাহিদা কমে যাওয়াই এর মূল কারণ। প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই মৃৎশিল্প এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে। বৈশাখী মেলা ঘিরে সাময়িক চাহিদা বাড়লেও সারা বছরের চিত্র হতাশাজনক। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা ছাড়া এই শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
গাইবান্ধা বিসিকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক আবদুল্লাহ আল ফেরদৌস বলেন, এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের সহযোগিতা করতে ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। বেশ কয়েকবার তাদের ঋণ দিয়ে শিল্পকে টিকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তাদের ঋণ দিলে, জিনিসপত্র বিক্রি করে পরিশোধের কোনো সক্ষমতা নেই। কারণ মানুষ আর মাটির জিনিসপত্র কিনতে চায় না। এটা মূল সমস্যা।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লোকমান হোসেন বলেন, যেহেতু এ পেশাটি তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা, সেহেতু তাদের পেশাকে টিকিয়ে রাখতে আমাদের কাছে সহযোগিতা চাইলে অবশ্যই তাদের সহযোগিতা করবো।
এমএন/এএসএম