বাঁশ শিল্পে বিষাদের ছায়া

এমদাদুল হক মিলন এমদাদুল হক মিলন , দিনাজপুর
প্রকাশিত: ১২:৪৩ পিএম, ০৮ এপ্রিল ২০২৬
এক সময়ের দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। বাপ-দাদার পেশাকে কোনোরকম টিকিয়ে রেখেছেন এ শিল্পের কিছু কারিগর। সেই চিত্র ধরা পড়ে বোচাগঞ্জ উপজেলার সেতাবগঞ্জ হাটে। সোমবার দুপুরে সেতাবগঞ্জ হাট থেকে তোলা ছবি।

এক সময়ের সমৃদ্ধ দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। বাঁশের তৈরি পণ্যের চাহিদা হ্রাস, কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা ও প্লাস্টিক পণ্যের ব্যাপক আধিপত্যের কারণে এই গ্রামীণ শিল্পটি তার জৌলুস হারাচ্ছে। এতে কারিগররা তাদের পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছেন, যা এই শিল্পের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

দিনাজপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে একসময় বাঁশ শিল্পের রমরমা অবস্থা ছিল। বাঁশ দিয়ে তৈরি হতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এসবের মধ্যে ছিল কুলা, ডালা, চালুন, ঝুড়ি, মোড়া, খেলনা, ডালি, বিভিন্ন সজ্জার সামগ্রী, মাছ ধরার ডার্কি, ডিড়ই, বেনা, খলই প্রভৃতি। এসব পণ্যের চাহিদা ছিল ব্যাপক, বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের হাট-বাজারগুলোতে ব্যাপকভাবে এর বিক্রি লক্ষ্য করা যেত। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় ও সহজলভ্য প্লাস্টিক পণ্যের আগমনে বাঁশের তৈরি পণ্যের বাজার সংকুচিত হয়ে পড়েছে। প্লাস্টিকের তৈরি জিনিসপত্র দামে সস্তা ও টেকসই হওয়ায় ক্রেতারা সেদিকেই বেশি ঝুঁকছেন।

জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে গিয়ে বাঁশ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন রকমের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বেচাকেনা করতে দেখা গেছে। তবে হাটে দিনদিন এসব সামগ্রীর বিক্রি কমছে বলে জানান ক্রেতা-বিক্রেতারা।

আমার বাপ-দাদারা এ ব্যবসা করেছে, এখন আমিও করছি। আগের থেকে এখন আর পোষায় না। বাঁশের দাম বেশি, হাজিরা মূল্য বেশি। আমরা সপরিবারে এ কাজ করি। এখনও এই পেশা ধরে আছি। যেহেতু বাপ-দাদাদের ঐতিহ্য, এভাবেই চলছি। খাজনা, বাড়ি ভাড়া, ঘর ভাড়া মিলে পোষায় না, শুধু পেশা হিসেবে ধরে আছি।

সোমবার (৬ এপ্রিল) বোচাগঞ্জ হাটে কথা হয় এই শিল্পের কয়েকজন কারিগরের সঙ্গে। তারা জানান, বাঁশের তৈরি একটি পণ্য তৈরি করতে যে সময় ও শ্রম লাগে, তার তুলনায় তারা ন্যায্য মূল্য পান না। উপরন্তু কাঁচামাল হিসেবে বাঁশের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। একসময় স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত বাঁশ পাওয়া গেলেও বন উজাড় হওয়া ও অপরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের কারণে এখন বাঁশ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক সময় দূরদূরান্ত থেকে চড়া দামে বাঁশ কিনতে হয়, যা উৎপাদন খরচ আরও বাড়িয়ে দেয়।

বাঁশ শিল্পে বিষাদের ছায়া

আরও পড়ুন:
বিলীনের পথে মাটির খেলনা, কুমারপল্লিতে বিষাদের ছায়া
বিশ্ব ঐতিহ্যের জামদানি বুনেও কষ্টে তাঁতির জীবন
দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র না থাকায় হতাশ উদ্যোক্তারা

কারিগরদের একজন রতন পাল (৫০), যিনি ৪০ বছর ধরে এই পেশায় আছেন, আক্ষেপ করে বলেন, ‘আগে বাঁশের কাজ করে সংসার ভালোই চলতো। এখন আর চলে না। ছেলেমেয়েরা এই কাজ শিখতে চায় না, কারণ এতে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। বাধ্য হয়ে অন্য কাজ খুঁজতে হচ্ছে।’ তার মতো আরও অনেক কারিগর এখন দিনমজুরের কাজ করছেন বা ইজিবাইক চালাচ্ছেন।

শিবচরণ নামে আরেক কারিগর বলেন, ‘এখন বাঁশের দাম খুব বেশি। বেচাকেনা খুব একটা হয় না। মালের দাম কম, জাত ব্যবসা তাই করতে হয়। ছাড়তে পারি না এ ব্যবসা। লাভ কম হোক বেশি হোক করতে হয় ব্যবসা। এই ব্যবসা আমরা ছোট থেকে শিখেছি। আমার বাপ-দাদারা করেছে, তাদের দেখে আমি শিখেছি। আমরা কুলা, ডালি, হাঁস ঢাকা চালা, পাখা ইত্যাদি তৈরি করি। ৩০ বছর থেকে ব্যবসা করছি।’

বাঁশ শিল্পে বিষাদের ছায়া

ইশানিয়া গ্রামের আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমার বাপ-দাদারা এ ব্যবসা করেছে, এখন আমিও করছি। আগের থেকে এখন আর পোষায় না। বাঁশের দাম বেশি, হাজিরা মূল্য বেশি। আমরা সপরিবারে এ কাজ করি। এখনও এই পেশা ধরে আছি। যেহেতু বাপ-দাদাদের ঐতিহ্য, এভাবেই চলছি। খাজনা, বাড়ি ভাড়া, ঘর ভাড়া মিলে পোষায় না, শুধু পেশা হিসেবে ধরে আছি।’

বাঁশ শিল্প শুধু একটি অর্থনৈতিক খাত নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতিরও অংশ। এই শিল্প বিলুপ্ত হলে আমরা একটি ঐতিহ্য হারাবো। তাই এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কারিগরদের জীবনমান উন্নয়ন ও তাদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা জরুরি। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে দিনাজপুরের বাঁশ শিল্প কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলে-মেয়ে তিনজন। বড় ছেলেকে অন্য লাইনে দিছি, এই লাইনে পোষায় না। তাকে মোটরসাইকেল মেকার লাইনে দিছি। আর ছোট ছেলে আমার সাথে থাকে। মেয়ে লেখাপড়া করে। সেতাবগঞ্জ, কাহারোল, ঝুকুরঝাড়ি, দিনাজপুর, মঙ্গলপুর এই হাটগুলোতে আমি ব্যবসা করি।’বাঁশ শিল্পে বিষাদের ছায়া

আরও পড়ুন:
পাহাড়ি নারীদের তৈরি পিনন-হাদির কদর দেশ পেরিয়ে বিদেশে
বিয়ের টোপর-কপালি গড়ে ৩০ বছর ধরে সংসার চলে মিঠুন কুমারের
বাঁশ শিল্পে বাঁচার আশা

বাঁশ শিল্পে বিষাদের ছায়া

রতন সরকার বলেন, ‘কুলা, ঢাকি, পাখা, চালনসহ বিভিন্ন প্রকার বাঁশের তৈরি জিনিস নিজে বানিয়ে বিক্রি করি। এই ব্যবসা আগের থেকে চাহিদা কম। সাইজ অনুযায়ী ডালির দাম ৮০-১০০টাকা। এই ব্যবসা করে কোনোরকম সংসার চলে। ২৫ বছর থেকে এ ব্যবসা করি। সেতাবগঞ্জ, কাহারোল, জয়নন্দ এই হাটগুলোতে যাই।’

ফটিক চন্দ্র রায় নামে এক কারিগর বলেন, ‘লক্ষীপুরে আমার বাসা, আমি খোচাবাড়ি, জয়নন্দ, রেলবাজার, সেতাবগঞ্জ হাটে যাই। আমাদের বংশগত ব্যবসা এটা। আগে এই বাঁশের তৈরি পণ্যের প্রচুর চাহিদা ছিল। বর্তমানে এর চাহিদা সেরকম নাই। বাঁশের হিসেবে আমাদের মজুরির টাকাও আসে না। বংশগত ব্যবসা বলে ধরে আছি।‘

এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা মনে করেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই শিল্পকে বাঁচানো সম্ভব। নতুন নতুন ডিজাইন ও পণ্যের বৈচিত্র এনে শহুরে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা যেতে পারে। এছাড়া, বাঁশ চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করলে কাঁচামালের সংকট কিছুটা হলেও লাঘব হতে পারে।

বাঁশ শিল্পে বিষাদের ছায়া

উদ্যোক্তা মোসাদ্দেক হোসেন ও রাকিব হাসান বলেন, ‘বাঁশ শিল্প শুধু একটি অর্থনৈতিক খাত নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতিরও অংশ। এই শিল্প বিলুপ্ত হলে আমরা একটি ঐতিহ্য হারাবো। তাই এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কারিগরদের জীবনমান উন্নয়ন ও তাদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা জরুরি। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে দিনাজপুরের বাঁশ শিল্প কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।’

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) দিনাজপুরের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, কালের বিবর্তনে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। বাঁশ শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের প্রধান অফিস ঢাকায় এক থেকে তিনমাস মেয়াদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। কেউ প্রশিক্ষণ নিতে চাইলে আমরা সব ব্যবস্থা করবো। এছাড়াও এই শিল্পের জন্য ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। যারা ঋণ নিতে ইচ্ছুক আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সেটারও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিল্পটিকে নিয়ে আমাদের তদারকি বৃদ্ধি করবো।

এমএন/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।