ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

৫ হাজারে শুরু, এখন মাসে আয় ১ লাখ টাকা

প্রকাশিত: ১২:৩৩ পিএম, ০২ মার্চ ২০১৭

অভাব-অনটনের সংসার। অভাব ঘুচানোর তাগিদে হাঁসের ডিম থেকে বাচ্চা ফুটানোর পরিকল্পনা করেন। নিজের গহনা বিক্রির ৫ হাজার টাকা পুঁজি। সেই পুঁজিতে নতুন কিছু করার স্বপ্ন দেখেন।

এরপর হাঁসের ডিম কিনে তুষ (ধানের গুঁড়া) পদ্ধতিতে বাড়িতে হারিকেনের তাপ দিয়ে বাচ্চা ফুটানো শুরু করেন। নাম দেন লামলাম হ্যাচারি। আজ তিনি একজন সফল নারী। সফল নারী উদ্যোক্তা।

এ সফল নারী হচ্ছেন নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলা নজিপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ি (রঘুনাথপুর) গ্রামের বাচ্চুর স্ত্রী ফিরোজা বেগম। সততা, প্রবল ইচ্ছা শক্তি আর পরিশ্রমের মাধ্যমে হাঁসের ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে কাঁটা বিছানো পথ পেরিয়ে আজ তিনি সফল নারী। এ সফলতা উপজেলায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মডেল হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। জেলার সবাই তাকে আইকন হিসেবেই মানে।

সফলতা দেখে অনেক বেকার যুবক-যুবতী হাঁসের ডিম ফোটানোর দিকে উৎসাহিত হয়েছেন। তার হাত ধরে এলাকার বাবুল হোসেন, আজিজুল হক, হেলাল ও মিলনসহ ৩০ জন নারী-পুরুষ আজ বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন। স্বল্প সুদে ঋণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বাইরে রফতানি করা সম্ভব হবে।

প্রায় ১৫ বছর আগেও পারিবারিক আর্থিক অবস্থা ছিল খুব নাজুক। এক কক্ষবিশিষ্ট ঘরে ফিরোজা বেগম স্বামী ও তিন ছেলেকে নিয়ে বসবাস করেন। স্বামীর আয়ে সংসারের ভরণপোষণ কষ্টকর হয়ে উঠতো তার।

২০০২ সালে নিজের সীমিত পুঁজির টাকা দিয়ে হাঁসের ডিম কিনে প্রথমে ১০০টি ডিম নিয়ে তুষ পদ্ধতিতে বাচ্চা ফুটানো শুরু করেন। রংপুর জেলা থেকে এক ব্যক্তি তাদের বাড়িতে বেড়াতে এসে এ পদ্ধতি শিখিয়ে দেন।

পুঁজির অভাবে ব্যবসাটি আশানুরূপভাবে সম্প্রসারণ করতে পারছিলেন না। নিজের গহনা বিক্রি করে পাঁচ হাজার টাকা ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। ক্ষুদ্র আকারে হলেও ব্যবসা সম্প্রসারে যথেষ্ট পরিমাণে অবদান রাখতে সক্ষম হয় সেই গহনা বিক্রির টাকা।

হ্যাচারিতে ডিম সেডিং দেয়া, ডিমের পরিচর্যা করাসহ সব কাজ ফিরোজা বেগম নিজেই করতেন। আর স্বামী বাচ্চু ক্ষুদ্র পরিসরে বাচ্চা কেনাবেচা করতেন।

প্রতিদিন সকালে বাইসাইকেলযোগে ফেরি করে পাইকাররা বিভিন্ন গ্রামে বাচ্চা বিক্রি করেন। গ্রামবাংলার প্রতিটি পরিবারে কম বেশি হাঁস পালন করেন। তাই হাঁসের বাচ্চার চাহিদা বেশি, যা পরবর্তীতে ডিম ও মাংসের জোগান দেয়।

শুরু থেকেই ফিরোজা হ্যাচারি কর্তৃক ফোটানো বাচ্চা ব্যাপক চাহিদা লক্ষ্য করা যায়। তার সুনাম ধীরে ধীরে রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্দা, সিলেট, বরিশাল, রাজশাহী, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়াসহ সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

অর্ডার অনুযায়ী বাচ্চা সরবরাহ করতে গিয়ে ফিরোজা বেগম তিন ছেলে সন্তান, ফিরোজ হোসেন, ফারুক ও ফারহান এই উদ্যোগের সঙ্গে সামিল হয়।

আজ থেকে এক দশক আগেও যে পরিবারটির এক হাজার টাকার বেশি ব্যয় করা সম্ভব ছিল না। স্বল্প সময়ের ব্যবধানের গ্রামে একটি বাসস্থান তৈরি সত্যিই স্বপ্নের মতো। নিজের দৃঢ় মনোবল ও ইচ্ছা শক্তির জোরে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে ফিরোজা বেগম।

ফিরোজা বেগম বলেন, রাত দিন পরিশ্রমের ফলে সফলতা পেয়েছি। হ্যাচারি পরিধি যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে জনবল। বর্তমানে হ্যাচারিতে প্রতি মাসে গড়ে ২৫ হাজার দেশি-বিদেশি হাঁসের বাচ্চা ফুটানো হয়। প্রতি পিস হাঁসের বাচ্চা ৩০ টাকা ও বিদেশে ২৫ টাকায় বিক্রি হয়। প্রতি মাসে গড়ে সাত লাখ টাকা সম মূল্যের বাচ্চা বিক্রি হয়। এতে মাসে প্রায় এক লাখ টাকার মতো লাভ হয়।

ফিরোজা বেগম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া। পাশাপাশি স্বামী ও সন্তান আমাকে সার্বক্ষণিক পরামর্শ সহযোগিতা করেছে। ইতোমধ্যে ব্যবসায় সফলতা পেয়ে কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে একটি আধাপাকা বাড়ি করেছেন। যার সিংহভাগ অর্থ এসেছে সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের মুনাফা থেকে।

স্বামী বাচ্চু বলেন, হাঁস ও মুরগি ডিম থেকে বাচ্চা ফুটানো ও পালনের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে নিজের চাহিদা মিটিয়ে বাহিরে রফতানি করা সম্ভব। পাশাপাশি বেকারদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন হবে।

আব্বাস আলী/এএম/পিআর