অন্যরা স্কুলে যায়, আমার বোনটা চেয়ে চেয়ে দেখে
মাথায় উস্কো-খুস্কো চুল, পরনে ময়লাযুক্ত কাপড়, পায়ে ছেঁড়া চটি স্যান্ডেল। দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে রাস্তায়। জন্মের কয়েক মাস পরই বাবা মারা গেছে। মা আর ছোট বোনকে নিয়েই ১০ বছর বয়সী কিশোর রিহানের সংসার।
জীবন খুব কঠিন একটা পথ। এখানে প্রতি পদে পদে মানুষকে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়। আর কঠিন ও স্বার্থপর এই সমাজে কেউ কাউকে দেখার সুযোগ হয় না। সে কারণেই কিশোর বয়সে রিহানের কাঁধে দায়িত্বের বোঝা। এ দায়িত্ব নিয়েই রিহান ছুটছে অজানা গন্তব্যে। জীবন সংগ্রামের জন্য তাকে নামতে হয়েছে রাস্তায়। ছোট বোন আর মায়ের মুখে দু মুঠো খাবার তুলে দিতে রিহানকে ছুটতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
কিশোর বয়সে তার কচি হাতে কঠিন কাজ! যে বয়সে স্কুলে যাওয়ার কথা ঠিক সেই বয়সে খেলনা চড়কি বিক্রি করে সংসারের ঘানি টানছে রিহান।
রিহান ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী ইউনিয়নের বাঘইল ইপিজেড এলাকার মৃত মকবুল ঘরামীর মেজ ছেলে। সারাদিন ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্টেশনের ওভারব্রিজে ১০ টাকা মূল্যে চরকি বিক্রি করে সংসার চালায়।
মা আর ছোট বোনকে নিয়ে তাদের সংসার। তার বড় এক ভাই আছে। নাম শামিম হোসেন (১৯)। ঢাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করতে গিয়ে সেখানে বিয়ে করে সংসার করছে। শামিম সংসারের কোনো খোঁজখবর নেয় না। এমনকি জন্মধাত্রী মা ও ছোট ভাইবোনের খবরও রাখে না।
রিহান জানে না তার বাবা কবে মারা গেছেন। তবে মায়ের কাছে শুনেছেন, রিহান যখন মায়ের কোলে। তখন তার বাবা অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। এরপর শুরু হয় তাদের দুঃখের দিন। কোনোমতে খেয়ে না খেয়ে রিহান ও ছোট বোনকে বড় করেছেন মা।
একটু সহযোগতিার আশায় বড় ভাইকে ঢাকায় পাঠানোর পর নিজের পথ নিজে ধরেছেন। এখন আর সংসারের কোনো খোঁজখবর নেন না বড় ভাই। এমনকি কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগও করেন না।
অবশেষে উপায় না পেয়ে রিহান নিজেই রাস্তায় নেমেছে। সংসারে জোগান দিতে শিশু অবস্থায় হাতে তুলে নিল কঠিন কাজ। সে থেকেই চলছে রিহানের জীবন সংগ্রাম। প্রতিদিন স্টেশনের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে চরকি বিক্রি করছে। প্রতিদিন ৪০-৫০ টাকা করে উপার্জন হয় তার। মা খাদিজা খাতুন সুতা মিলে কাজ করেন। রিহানের এ অল্প আয় কিছুটা হলেও মায়ের সংসার চালানোর কাজে আসে।
রিহানের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের এ প্রতিবেদকের। লেখাপড়া করতে ইচ্ছে করে না প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে রিহান বলে, ‘ইচ্ছেতো করেই। আমার ইচ্ছে করে লেখাপড়া করে পুলিশ অফিসার হবো। তাতো এখন আর হবে না। টাকা-পয়সা কোথায় পাবো? আমার ছোট বোন সাঈদা খাতুনকে টাকার অভাবে মা স্কুলে দেয়নি। নতুন জুতা, স্কুলের পোশাক লাগে। এসব কোথা থেকে আসবে।’
রিহানের ভাষ্য, যেখানে আমাদের ঠিকমতো খাবারই জোটে না সেখানে পড়ালেখার খরচ পাবো কই। আমার ছোট বোনটারও খুব ইচ্ছা লেখাপড়া করার। কিন্তু কোনো উপায় নেই। আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়, যদি আয় বাড়তো তাহলে আমি আমার ছোটবোনকে পড়াতাম। বাড়ির আশপাশ থেকে ওর বয়সীরা স্কুলে যায়, তখন ছোট বোনটা চেয়ে চেয়ে দেখে। আমার খুব কষ্ট হয়। এই বলে চোখ মুছতে মুছতে সামনে হাঁটতে থাকে রিহান। কিছুদূর যেতেই রিহান ডাক দেয়, ওই চড়কি নেবেন, চড়কি।
আলাউদ্দিন আহমেদ/এএম/এমএস