কুড়িগ্রামের বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণে নেই উদ্যোগ
আজও অরক্ষিত কুড়িগ্রামের বধ্যভূমি ও গণকবরগুলো। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনী নির্বিচারে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালায় এই জেলায়। এতে অসংখ্য নিরীহ মানুষ মারা যান। আগামী প্রজন্মের কাছে জেলার ইতিহাস তুলে ধরতে গণকবর ও বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ করার দাবি মুক্তিযোদ্ধাদের।
উলিপুর উপজেলার হাতিয়ায় ১৯৭১ সালের ১৩ নভেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী বর্বর হামলা চালিয়ে ৬৯৭ জন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে। বৃহত্তর রংপুর বিভাগের সবচেয়ে বড় গণহত্যার সেই ভয়াল স্মৃতি আজও ভুলতে পারেনি কুড়িগ্রামবাসী। এরপর থেকে কুড়িগ্রামের মানুষ ১৩ নভেম্বরকে হাতিয়া গণহত্যা দিবস পালন করে আসছে।
হাতিয়া গণহত্যায় শহীদদের স্মরণে নির্মিত দাগারকুঠি বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধটি ১৯৯৮ সালে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বিলীন হওয়ার পর অনন্তপুর বাজারে ইউপি কার্যালয়ের পাশে ছোট আকারে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। সেটিও ভাঙনের মুখে পড়লে দুই বছর আগে হাতিয়া বাজারে জেলা পরিষদের সহযোগিতায় আরেকটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়। তবে নতুন প্রজম্মের মাঝে এখনও গণহত্যার ইতিহাস তুলে ধরার উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
কুড়িগ্রাম কাঁঠালবাড়ী বধ্যভূমি : ১৯৭১ সালের ৯ জুন কুড়িগ্রাম শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে কাঁঠালবাড়ী বাজার ও আশপাশের ৬টি গ্রামে পাকবাহিনী তাদের দেশীয় দালালদের সহযোগিতায় নৃশংস হামলা চালিয়ে হত্যা করেছিল ৩৫ জন নিরপরাধ বাঙালিকে। পাকবাহিনী ওই দিন কাঁঠালবাড়ী বাজারের তিনদিক থেকে অতর্কিত আক্রমণ করে। অগ্নিসংযোগ করে বাজার ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামে। পরে সেখানে একটি বধ্যভূমি তৈরি করা হয়। কিন্তু নেই যথাযথ পরিচর্যা।
নাগেশ্বরী চর বেরুবাড়ী বধ্যভূমি : ১৯ নভেম্বর তিন প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে পাক হানাদার বাহিনীর মুখোমুখি গুলি বিনিময় হয়। গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা গুলি মোকাবেলা করেই পিছু হটতে হটতে দুধকুমার নদীতে চলে আসে। পাকিস্তানিদের ভারি অস্ত্রের গুলির কাছে মুক্তিযোদ্ধারা টিকতে না পেরে যে যার মতো করে নদী পার হয়। তিন-চার ঘণ্টার যুদ্ধে উভয়পক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটলে পাক আর্মি গোটা গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় এবং চর বেরুবাড়ী স্কুলের ক্যাম্পটি পাক আর্মি দখলে নেয়। স্কুল মাঠে ব্রাশফায়ার করে ২০-২৫ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করে। পরে এখানে নির্মিত হয় বধ্যভূমি। যেটি এখন অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে।
রাজিবপুর কোদালকাঠি বধ্যভূমি : ২৫ অক্টোবর অর্ধ শতাধিক নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালিকে গুলি করে হত্যা করে পাক হানাদার বাহিনী। ব্রহ্মপুত্র নদের এক দ্বীপে শংকর মাধরপুর গ্রাম। রাজিবপুর থানার কোদালকাঠি ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। বীর প্রতীক তারামন বিবির জন্মস্থান এই শংকর মাধবপুর গ্রামে। কোদালকাঠিসহ অন্যান্য যুদ্ধের বর্ণনায়ও এসেছে নামটি। সে স্থানটির দখল এবং পাল্টা দখল নিয়ে অন্তত দু’বার হয়েছে সম্মুখযুদ্ধ।
রাজারহাট ঠাঠমারী বধ্যভূমি : রাজারহাট ঠাঠমারী ব্রিজের কাছে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে পাকসেনাদের সরাসরি যুদ্ধ হয়। প্রচণ্ড লড়াইয়ের সময় পাক সেনারা কৌশলে ইট ভাটাতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। বিরতিহীনভাবে চলে লড়াই। ক্ষণে-ক্ষণে গর্জে ওঠে আগ্নেয়াস্ত্র। উভয়পক্ষে চলে গুলি বিনিময়। সে লড়াইয়ে শহীদ হন ছয়জন মুক্তিসেনা। এরপর ঠাঠমারী এলাকায় পাকসেনারা ক্যাম্প স্থাপন করে। ক্যাম্পে এনে নির্যাতন চালানো হয়। হত্যার পর তাদের রেল লাইনের পাশে গর্ত করে পুঁতে রাখা হয়। স্বাধীনতার পর এ স্থানে তৈরি করা হয়েছে স্মৃতিফলক। কিন্তু অযত্নে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে এই স্মৃতিফলক।
শহীদদের স্বজনসহ মুক্তিযুদ্ধের স্ব-পক্ষের বিভিন্ন সংগঠন গণকবর ও বদ্ধভূমিগুলো সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে আসছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ উদ্যোগ ‘শেকড়’ সভাপতি মনোয়ার হোসেন সিদ্দিকী বলেন, গণকবরগুলো অনেকের অজানা রয়েছে। বিভিন্ন দফতরে গণকবর ও বদ্ধভূমিগুলোকে সংরক্ষণ করে সেখানে স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের আবেদন জানিয়ে আসছি।কিন্তু একটিও আলোর মুখ দেখেনি।
কুড়িগ্রাম মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম টুকু বলেন, দেশের জন্য যারা প্রাণ দিয়ে গেছেন, তাদের স্মৃতি ধরে রাখতে আজও আমরা ব্যর্থ। তবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার দেশের ইতিহাস সংরক্ষণসহ জেলার বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণে পদক্ষেপ নেবে এমনটাই আশা আমাদের।
নাজমুল হোসেন/এআরএস/ওআর/এমএস