আলোর পথ দেখাচ্ছে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার
‘রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ’ স্লোগান বাস্তবায়নে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের হস্তশিল্পসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলছেন। `কারাগার মানেই বন্দিদের কারা প্রকোষ্ঠে আটকে রাখা` এ ধারণা পাল্টে দিয়েছে এ কারাগার কর্তৃপক্ষ।
এখানে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও মানসিক বিকাশে উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে বন্দিদের জীবনমান বদলে দেয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ নিয়ে নিপুণ কারিগর হয়ে উঠছেন বন্দিরা। বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বন্দিদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে দেশের অন্যতম প্রাচীন সেবা সংস্থা ঢাকা আহসানিয়া মিশন কর্তৃপক্ষ।
এ কারাগারে লেখাপড়া না জানা বন্দিদের ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি গণশিক্ষা কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। প্রশিক্ষিত এসব বন্দিরা মুক্তি লাভের পর হস্তশিল্প স্থাপনের মাধ্যমে নতুনভাবে কর্মজীবন শুরুর পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনসহ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার সক্ষমতা অর্জন করছেন।
এছাড়াও অনেক চিহ্নিত অপরাধী ও মাদকাসক্ত এ কারাগারে যাওয়ার পর তাদের মানসিক বিকাশে উদ্বুদ্ধকরণ করা হয়। এতে এসব বন্দিরা অন্ধকার মাড়িয়ে কারাগার থেকে সুস্থ জীবনে ফিরে এসে আলোর পথে পা বাড়িয়েছেন।
কারাগার সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লা মহানগরীর ছোটরা এলাকায় ১৭৯২ সালে প্রায় ৬৭ একর জমি অধিগ্রহণ করে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়। দেশের পূর্বাঞ্চলের (চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ) ৪টি কেন্দ্রীয় ও ১১টি জেলা কারাগারের মধ্যে ২২৪ বছরের পুরাতন কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার। এ কারাগারের ধারণক্ষমতা ১ হাজার ৭৪২ জন। বর্তমানে এ কারাগারে গড়ে প্রায় ৩ সহস্রাধিক হাজতি ও কয়েদি অবস্থান করছে।
কারাগারে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ বন্দি থাকলেও সবই চলছে নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যেই। বন্দিদের মধ্যে অদক্ষ নারী-পুরুষদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এসব কাজের মধ্যে বেকারি প্রশিক্ষণ, কুটির শিল্পের প্রশিক্ষণ, তাঁতের কাজ, রান্নার কাজ, ইলেক্ট্রিক ও লন্ড্রির কাজ।
20170424104904.jpg)
বন্দিদের তৈরি আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন বিভিন্ন কুটিরশিল্প এখন শোভা পাচ্ছে দেশের বিভিন্ন সুরুচি সম্পন্ন মানুষের ড্রইং রুমে ও সৌখিন মানুষের সংরক্ষণে। কারাগারের প্রধান ফটকের সামনেই কারা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পরিচালিত কারাপ্রদর্শনী বিক্রয় কেন্দ্রে খুচরা ও পাইকারিভাবে বিক্রিও হচ্ছে এসব পণ্য।
বন্দীরা কারাগারের ভেতর বিভিন্ন খাদ্য ও পণ্য সামগ্রীও তৈরি করছেন যা বন্দি ও কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্বল্পমূল্যে খেতে পারেন। এছাড়া বন্দিদের তৈরি মুড়ি, খইসহ সুস্বাধু খাদ্যপণ্য কারা কেন্টিন থেকে কারাগারের বন্দিদের স্বজন ও বাইরের লোকজনের নিকট বিক্রি করা হয়ে থাকে।
কারাগার থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত একাধিক বন্দির সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, সেখানে মাদকাসক্ত বন্দিদের সংশোধন ও মানসিক বিকাশে উদ্বুদ্ধকরণসহ খাদ্য উপকরণের মান, রান্না করা খাবারের মান, রন্ধন প্রণালী এবং পরিবেশনের দিকে কারা কর্তৃপক্ষের নজরদারি রয়েছে।
কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার নাশির আহমেদ জানান, বন্দিদের সংশোধনের মাধ্যমে তাদের কর্মসৃজন করে গড়ে তুলতে কারা অভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া বন্দীদের মানসিক বিকাশে খেলাধুলাসহ বিনোদনমূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়ে থাকে।’
এ বিষয়ে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহানারা বেগম জানান, বন্দিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার মানসিকতা গড়ে তুলতেই বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এখানে পুরুষ কয়েদিদের পাশাপাশি নারী কয়েদিরাও প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে সমানভাবে হাতের কাজ করে যাচ্ছেন।
প্রশিক্ষিত এসব বন্দিরা মুক্তি লাভের পর সরকারি সহায়তা পেলে বৃহত্তর পরিসরে হস্তশিল্প স্থাপনে নবউদ্যোমে সুন্দর কর্মজীবন শুরুর পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনসহ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
এফএ/জেআই্এম