ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

সন্তান হত্যার বিচার চাওয়াটাই দোষ হলো বাবা-মায়ের?

জেলা প্রতিনিধি | কক্সবাজার | প্রকাশিত: ০৭:৫৮ এএম, ২১ আগস্ট ২০১৭

পাহাড়ঘেরা শষ্য খেতে ভরপুর গ্রাম কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ড বড়বিল। সেই গ্রামের খেটে খাওয়া চাষি মো. ফোরকান (৩৫)। স্ত্রী ছেনুয়ারা ও চার ছেলে নিয়ে তাদের ছিল সুখের সংসার। স্ত্রীর সহযোগিতায় ফোরকান তার বাবার সঙ্গে মৌসুমী কৃষি পণ্যের খেত করে ভালভাবেই চলছিল। এটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

পাহাড়ে অপরাধী চক্রের অপহরণ বাণিজ্যের শিকার হন তিনি। তার অবুঝ দু’শিশু সন্তান হাসান (১১) ও হোসেনকে (৮) অপরাধী চক্র মুক্তিপণের হাতিয়ার করে। তাদের দাবি পরিশোধের আগেই দু’ভাইকে শ্বাসরোধে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। দু’দিন পরে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে দু’ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করে এলাকাবাসী।

পৌনে দুই বছর আগে সংঘঠিত চাঞ্চল্যকর এ হত্যায় মামলা হয়েছে। কিন্তু এর কোনো অগ্রগতি নেই। এলাকাবাসীর সহযোগিতায় বেশ কয়েকজন আটকও হন। সম্প্রতি জামিনে ছাড়া পেয়েছেন এ মামলার কয়েকজন আসামি। তারা এখন মামলা তুলে নিতে চাপ দিচ্ছে। না হলে গোটা পরিবারের অবস্থা হাসান-হোসেনের মতো হলে বলে হুমকি দেয়া হচ্ছে। ভয়ে এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ফোরকানরা।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, ২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি মোহাম্মদ হাসান (১১) ও মোহাম্মদ হোসেন (৮) কে অপহরণ করে একই এলাকার অপহরণ চক্রের মূল হোতা নবীর ছেলে টুইল্যা’র নেতৃত্বে ১০-১৫ জনের একটি চক্র। দু’ভাইকে গভীর বনে নিয়ে গিয়ে রাতে মুঠোফোনে ফোরকানের কাছে ৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। বিষয়টি স্থানীয় পুলিশ জেনে গেলে অপহরণকারীরা হাসান ও হোসেনকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর ‘শিয়া পাহাড়’ নামে একটি পাহাড়ি জঙ্গলে ফেলে চলে যায়। পুলিশ পরে একজনকে আটক করে।

এ ঘটনায় ১৬ জনকে আসামি করে রামু থানায় একটি মামলা করা হয়। এরপর পুলিশ পর্যাক্রমে ১২ জনকে আটক করে আদালতে সোপর্দ করে। কিন্তু, আইনের বিভিন্ন ফাঁক গলে সম্প্রতি ৮ আসামি জামিনে বের হয়েছেন। এরপর তারা ফোরকানকে হুমকি-ধমকি দেয়া শুরু করেন।

ফোরকান বলেন, টুইল্যার নেতৃত্বে স্থানীয় জাহাঙ্গীর, আলমগীর, আব্দুস শুক্কুর, নাজিম উদ্দিন, মিজানুর রহমান, শহীদুল্লাহ ও মজিদসহ ১০-১৫ জন আমার সন্তান হাসান ও হোসেনকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করে। মুক্তিপণের টাকা দিতে পারিনি। এলাকাবাসী ও পুলিশের তৎপরতা দেখে অপহরণকারীরা আমার দু’সন্তানকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। কিন্তু পৌনে ২ বছরে মামলার কূল-কিনারা হয়নি। বরং আসামিরা জামিনে বেরিয়ে আমার পুরো পরিবারকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দিচ্ছে।

হাসান-হোসেনের মা ছেনোয়ারা বেগম বলেন, একদিনেই বুকের দু’ধনকে হারিয়েছি। দুটি বছর বুকে পাথর বেঁধে থেকেছি হত্যাকারীদের বিচারের অপেক্ষায়। কিন্তু বিচার পাওয়া তো দূরের কথা উল্টো এখন বাকিদের জীবন বাঁচাতে এলাকা ও ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আমি আমার দু’সন্তান হত্যাকারীদের বিচার চাই।

বড়বিল ওয়ার্ড আওয়ামীলীগ সভাপতি মো. ইয়াহিয়া চৌধুরী বলেন, কোনো বিরোধছাড়া রোমহর্ষক এরকম হত্যার ঘটনা দেশের আর কোথাও ঘটেছে বলে মনে হয় না। হাসান-হোসেন হত্যার সঠিক বিচার না পেলে শুধু তার পরিবার নয়, গোটা গ্রামবাসী শান্তি পাবে না।

এক নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ফেরদৌস আলী বলেন, টুইল্যা আটক হলেও বাদীর পরিবারকে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে। বিষয়টি আমরা একাধিকবার স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করেছি।

বর্তমান ইউপি সদস্য মো. নুরুল ইসলাম বলেন, অপহরণকারীরা দিনে গা ঢাকা দেয় কিন্তু রাতের বেলা সর্বত্র বিচরণ করে। তারা অপহরণ ছাড়াও এলাকায় একের পর এক অপরাধ করেই যাচ্ছে। স্থানীয়রা তাদের ভয়ে আতঙ্কিত।

বড়বিলে নিকটবর্তী বাইশারি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ এসআই আবু মুছা বলেন, ‘পাহাড়ি এলাকায় এই চক্রটি একের পর এক অপরাধ করে যাচ্ছে। গত কিছু দিন ধরে নিহত হাসান-হোসেনের পরিবারের অভিযোগের পর বড়বিলে পুলিশ টহল জোরদার করা হয়েছে।

রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম লিয়াকত আলী বলেন, আমি সম্প্রতি এ থানায় যোগদান করেছি। নতুন করে হুমকির অভিযোগ পেয়ে ‘স্টাডি’ করে দেখলাম এ মামলায় ইতোমধ্যে পুলিশ ১৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। এদের মধ্যে ১২ জনকে পুলিশ আটক করে। ৮ আসামি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। শুনছি জামিনপ্রাপ্ত আসামি ও পলাতক আসামিরা মিলে নিহত হাসান-হোসেনের পরিবারকে হুমকি দিচ্ছে। তাদের জিডি’র প্রেক্ষিতে পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফরোজুল হক টুটুল বলেন, বিষয়টি মনযোগ সহকারে তদারকি করা হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব এর একটি সুরাহা আসবে বলে মনে করছি।

সায়ীদ আলমগীর/এনএফ/জেআইএম