সাঁওতাল পল্লী : এক বছরেও মামলার অগ্রগতি নেই
২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের রংপুর চিনিকলের আওতাধীন সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ইক্ষু খামারের আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিকদের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে তিন সাঁওতাল নিহত এবং পুলিশ ও সাঁওতালসহ আহত হন প্রায় ২০জন। ওই ঘটনায় এক বছরেও সাঁওতালদের দায়ের করা দুটি মামলার তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। দেয়া হয়নি চার্জশিট।
গাইবান্ধা পিবিআই ও গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশ সুত্রে জানা যায়, গত ৬ নভেম্বরের ওই সংঘর্ষের ঘটনায় তিনটি মামলা হয়। এর মধ্যে পুলিশ বাদী হয়ে ৪২ জনের নাম উল্লেখ করে ৩০০ থেকে ৪০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি দেখিয়ে একটি মামলা করে। এ মামলায় চারজন সাঁওতালকে গ্রেফতার করা হলেও পরে তারা জামিনে মুক্ত হন। পরে ১৬ নভেম্বর সাঁওতালদের পক্ষে স্বপন মুরমু বাদী হয়ে ৬০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি দেখিয়ে একটি মামলা করেন। এই ঘটনায় ২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তারাও জামিন পান।
এরপর ২৬ নভেম্বর সাঁওতালদের পক্ষে থোমাস হেমরম বাদী হয়ে গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সাংসদ আবুল কালাম আজাদ ও সাপমারা ইউপি চেয়ারম্যান বুলবুল আহম্মেদসহ ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে অজ্ঞাত দেখিয়ে আরেকটি মামলা করেন। পরবর্তীতে হাইকোর্টের নির্দেশে সাঁওতালদের দায়ের করা দুইটি মামলা গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশ থেকে গাইবান্ধা পিবিআইকে তদন্তভার দেয়া হয়। এই মামলায় তিনজনকে গ্রেফতার করে গাইবান্ধা পিবিআই।

রংপুর চিনিকল, সাঁওতাল ও পুলিশ সুত্রে জানা যায়, ১৯৬২ সালের ৭ জুলাই গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটাবাড়ী ও সাপমারা ইউনিয়নের সাঁওতাল ও বাঙালিদের কাছ থেকে ১৮৪২ দশমিক ৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করে রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ। সেই জমিতেই আখ চাষ শুরু করা হয়। পরে ২০০৪ সালের পর লিজ দিয়ে আখ চাষের পাশাপাশি ধান ও সবজির চাষাবাদ করা হয়।
সাঁওতালদের দাবি, যদি কখনও এসব জমি আখের বদলে অন্য কাজে ব্যবহার করা হয় তবে সেসব জমি সাঁওতালরা ফেরত পাবে।
পরে শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ তুলে জমি ফেরতের দাবিতে ২০০২ সাল থেকে আন্দোলন শুরু করে সাঁওতালরা। পরে ২০১৪ সালে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি করা হয়। সেই কমিটির সভাপতি হন বর্তমান সাপমারা ইউপি চেয়ারম্যান শাকিল আহমেদ বুলবুল। এরপর জমি ফেরতের দাবিতে সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।
এরপর ২০১৬ সালের ১ জুলাই সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ইক্ষু খামারের প্রায় ১০০ একর জমি দখলে নিয়ে শতাধিক সাঁওতাল পরিবার বসতি স্থাপন করে ধান চাষের পাশাপাশি সবজি ও পুকুরে মাছ চাষ এবং গবাদিপশু পালন করতো। এরপর ৬ নভেম্বর সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ইক্ষু খামারের লাগানো আখ কাটতে গেলে শ্রমিকদের বাধা দেয় সাঁওতালরা। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলে সাঁওতালদের সঙ্গে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিকদের সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষে সাঁওতালদের উচ্ছেদ করে ঘরে আগুন লাগানো হয়। সেই সংঘর্ষে তিনজন সাঁওতাল মারা যান ও পুলিশসহ গুরুতর আহত হন প্রায় ২০ জন।
এদিকে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ইক্ষু খামারের জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া সাঁওতালদের পুনর্বাসনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বাস্তবায়নাধীন বোগদহ আশ্রয়ন, ফকিরগঞ্জ আশ্রয়ন ও ফুলহার-১ আশ্রয়ন প্রকল্পের মাটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে শিগগিরই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক ব্যারাক নির্মাণ কাজ শুরু হবে। এসব প্রকল্পে ৩০০টি পরিবার থাকতে পারবে।
সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সহ-সভাপতি ফিলিমন বাস্কে বলেন, শর্ত ভঙ্গ করায় সেসব জমি আমরা ফেরত পাবো। সেই ন্যায্য দাবিতে আমরা আন্দোলন করছি। এ দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই আন্দোলন চলবে।

গাইবান্ধা পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, থোমাস হেমরমের মামলায় এ পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলাটির তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অনেকটা অগ্রগতিও হয়েছে। অভিযোগপত্র দিতে আরও সময় লাগবে। সাঁওতালদের লুট হওয়া কিছু ঢেউটিন ও মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।
গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ জাগো নিউজকে বলেন, সাঁওতালদের এলাকায় পুলিশি টহল ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছে।
গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক গৌতম চন্দ্র পাল জাগো নিউজকে বলেন, উচ্ছেদ হওয়া সাঁওতালদের পুনর্বাসনের জন্য দুইটি আশ্রয়ন প্রকল্পের মাটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া তিনটি গুচ্ছগ্রামের ঘর তৈরি করা হয়েছে। এসব ঘরের নির্মাণ কাজ শেষের দিকে।
রওশন আলম পাপুল/আরএআর/আরআইপি