ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

মুড়ির শব্দে জীবনের ছন্দ জড়িয়ে বারতোপা

শ্রীপুর (গাজীপুর) | প্রকাশিত: ০৭:১১ পিএম, ১৩ মে ২০১৮

গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম বারতোপা। আসছে পবিত্র রমজান মাস, সিয়াম সাধনার এমাসকে ঘিরেই ব্যস্ততা বেড়ে গিয়েছে ওই গ্রামের মানুষদের। সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারের অতি প্রয়োজনীয় মুড়িকে ঘিরেই চলছে এ প্রকারের ব্যস্ততা। প্রাচীন আমলের পদ্ধতি অনুসরণ করে হাতের তৈরি এ মুড়ির বাজারের ব্যাপক চাহিদা থাকায় নানান প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে এখনও টিকে রয়েছে গাজীপুরের শ্রীপুরের বারতোপা গ্রামের হাতে ভাঁজা মুড়ি। স্থানীয় বাজারগুলোতে চাহিদা মিটিয়ে বারতোপা গ্রামের এ হাতে ভাজা মুড়ি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে।

রোববার দুপুর সাড়ে বারোটা সরেজমিনে দেখা গেছে, বারতোপা গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে মুড়িকে ঘিরেই ব্যস্ততা। কেউ লাকড়ি কুড়াচ্ছেন, কেউ সড়কে মুড়ির চাল শুকাচ্ছেন, কেউবা বিশেষ ধরণের মাটির তৈরি চুলায় খোলায় চালে উত্তাপ দিচ্ছেন। গরম বালুর পরশে তা মুড়মুড় করে ফুটে তৈরি হচ্ছে সুস্বাধু মুড়ি। প্রতিটি বাড়িতে মুড়ির তৈরির শব্দ যেন জীবনের ছন্দ জড়িয়ে আছে তাদের।

সারা বছর এই গ্রামের মানুষ বিভিন্ন ধরনের কাজে ব্যস্ত থাকলেও রমজান আসার পুর্বেই নারী ও পুরুষরা মুড়ির তৈরির কাজে লেগে যান। ক্রেতাদের বিষমুক্ত মুড়ি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জীবন ও জীবিকার তাগিদে তারা এ পেশায় জড়ান। নারীরা চাল শুকানো থেকে ভাঁজার কাজ করে থাকেন। আর পুরুষরা সেসব বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে দেন। পুরুষরাও নারীদের এ কাজে সহায়তা করে থাকেন। সনাতন প্রক্রিয়ায় হাতে মুড়ি ভাজা যেন তাদের জীবনেরও একটা অনুষঙ্গ। হাতে ভাজা মুড়ির বিশেষ বিশেষণ হচ্ছে, এতে রাসায়নিক উপাদানের কোনো প্রয়োগ করা হয় না। চালে সামান্য লবন পানি মিশিয়ে তা ভেজে গরম বালুতে ছেড়ে দেয়া হয়। আর এতেই মুহুর্তের মধ্যেই তৈরি হয়ে যায় সাদামুড়ি।

বারতোপা গ্রামের গৃহবধু জমিলা খাতুন তিনি জানান, তারা বংশানুক্রমিকভাবে মুড়ির তৈরির মাধ্যমে জীবিকা চালিয়ে আসছেন। কিন্তু যান্ত্রিক সভ্যতার এ যুগে তাদের সনাতনী এ পদ্ধতি এখন প্রায় অচল। তবে তাদের তৈরি মুড়িতে কোনো বিষাক্ত কিছু না থাকায় সচেতন লোকদের মধ্যে বিক্রি করা যায়। বাজারে যেখানে সাধারণ মুড়ি ৬০ টাকা কেজিতে পাওয়া যায়, সেখানে তাদের হাতে তৈরি মুড়ি বিক্রি হয় ১০০ টাকায়।

ওই এলাকার আব্দুস সাত্তার বলেন, নানা কারণে এ গ্রামের অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান মুড়ি উৎপাদনে আসায় এখন আর টিকতে পারছি না। তবে পেশার মায়ায় এখনও কোনোভাবে টিকে রয়েছি। পূর্বপুরুষেরাও এ মুড়ি ভাজার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এখন মুড়ি ভাজার শব্দের মাঝে তাদের খুঁজে পাই।

গৃহবধূ কমলা আক্তার জানান, এখানেও রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের আনাগোনা। গ্রামের অনেকেই হতদরিদ্র বিধায় যাদের পুঁজি নেই তারা অনেকেই মহাজনদের সঙ্গে মুড়ি ভাজার চুক্তি করেন। মহাজনরা শুধু ধানের যোগান দিয়ে থাকেন বাকি সব উপকরণ মুড়ি তৈরির কারিগরদের দিতে হয়। ছয় মন ধানের মুড়ি ভেজে পান মাত্র তিন হাজার টাকা।

সত্তোরোর্ধ আয়েশা আক্তারের অভিমত, বাজারে বড় ও ধবধবে মুড়ির চাহিদা বেশি। তাই অনেকে লবনের বদলে ইউরিয়া ও হাইড্রোজ মিশিয়ে মুড়ি ভেজে থাকেন। ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে হাতে ভাজা মুড়ির স্বাদ। তবে তাদের তৈরি মুড়িতে কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয় না। তবে কারখানায় উৎপাদিত মুড়িতে রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় বলে দাবি তার।

শ্রীপুর মিজানুর রহমান মহিলা কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান ইকবালের মতে, বর্তমান বাজারে যে ধবধবে সাদা মুড়ি পাওয়া যায় তার অধিকাংশতেই রাসায়নিকের মিশ্রণ রয়েছে। যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। তবে সনাতন পদ্ধতিতে হাতে ভাজা মুড়িতে তেমন বিষের প্রয়োগ না থাকায় সচেতন মানুষের মধ্যে এর ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বারতোপা বাজারের মুড়ির আড়ৎদার মহর আলীর বলেন, বছর পাঁচেক আগেও এ গ্রামের শতাধিক পরিবারের অন্যতম জীবিকা ছিল মুড়ির তৈরিকে কেন্দ্র করে। সময়ের বিবর্তনে এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। তিনি বিভিন্নভাবে মুড়ির কারিগরদের সহায়তা করে থাকেন। আগে সারাবছর এ গ্রামে মুড়ি তৈরি হলেও এখন শুধু রমজান মাসকে ঘিরেই তা তৈরি হয়। হাতে ভাজা মুড়িতে প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায় বিধায় এসব মুড়ির চাহিদা বেশি। তবে হাতে মুড়ি তৈরিতে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় প্রতি কেজি একশ টাকা দরে বিক্রি করতে হয়। আর তিনি গ্রাম ঘুরে সংগৃহীত মুড়ি রাজধানীর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠান তারা।

শিহাব খান/আরএ/পিআর

আরও পড়ুন