ভিডিও EN
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

জন্মশাসনে আদর্শ হয়ে উঠেছে পিরোজপুরের কলাখালী গ্রাম

জেলা প্রতিনিধি | পিরোজপুর | প্রকাশিত: ০৭:৫৪ পিএম, ২৪ এপ্রিল ২০১৯

সদর উপজেলার প্রান্তিক গ্রাম কলাখালী। এখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষক ও জেলে হলেও চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দিনমজুর পরিবারও রয়েছে। এক সময় এ গ্রামটিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশি থাকলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ও শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে কমে এসেছে জনসংখ্যা ঊর্ধ্বগতি।

বেশির ভাগ দম্পতির ঘরেই ২ থেকে ৩ সন্তানের বেশি দেখা যায় না। এ গ্রামটির বর্তমান জনসংখ্যা ৪ হাজার ৮৭ জন। এর মধ্যে নারী ২ হাজার ৬ জন। গ্রামটি যে জন্মশাসন, শিশু ও নারীর সু-স্বাস্থ্যের একটি জীবন্ত চিত্র তা বোঝা যায় সম্প্রতি এলাকার কমিউনিটি ক্লিনিকে পরিচালিত স্যাটেলাইট ক্লিনিকের সাপ্তাহিক কার্যক্রম দেখে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী স্বামীর ঘরণী ফাতেমা খানম (২১) তার দুই বছরের মেয়ে শিশু নিয়ে এসেছেন ক্লিনিকে। তিনি প্রথম শিশু জন্মের পরে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের অধীনেই নিয়মিত দাম্পত্য জীবনযাপন করছেন। নিজে যেমন শরীর-স্বাস্থ্য সুস্থ রেখেছেন, সন্তানটিকেও পালন করছেন স্বাস্থ্য সচেতনতার মাঝে।

কথা হয় এ এলাকার নারী ইউপি সদস্য শিউলি বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাঠকর্মী শিরিনা আক্তারের নিষ্ঠা ও নিরবিচ্ছিন্ন পরিশ্রমের ফলে এ গ্রামের দম্পতিগুলো অনেক সচেতন হয়েছে। প্রসূতি মাতা ও নবজাতকের মৃত্যু নেই।

কলাখালী গ্রামের গৃহবধূ লিলি খানম জানান, তার ২ মেয়ে ১ ছেলে হওয়ার পর স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শে বন্ধাত্বকরণ পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। এ পদ্ধতি গ্রহণে তার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। তার আশেপাশের নারীদেরও তিনি এ পদ্ধতি গ্রহণের পরামর্শ দেন।

Pirojpur-Pic

এক সন্তানের জননী মাহফুজা আক্তার (২৬) জানান, তার স্বামী স্থানীয় একটি মাদরাসার শিক্ষক। তাই তিনি চাচ্ছেন পরিবারটি ছোট রাখতে। এ জন্য তিনি স্বাস্থ্য কর্মীর পরামর্শ নিয়েছেন।

স্বাস্থ্যকর্মীরা তার কাছে আসেন কীনা জানতে চাইলে তিনি জানান, মাঝে মাঝে আসেন। গর্ভবতী থাকাকালীন অবস্থায় প্রায়ই আসতেন। প্রসবকালীন সময় তিনি সারাদিন বসে ছিলেন আমার পাশে। তার কাছে আমি অনেক কৃতজ্ঞ।

গ্রামের পরিবার পরিকল্পনা সহকারী শিরিন আক্তার জানান, এ গ্রামে ৬৬০ জন সক্ষম দম্পতি রয়েছে। এদের মধ্যে ৫৩৭ জন দম্পতি পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। এছাড়া বর্তমানে ২৬ জন গর্ভবতী নারী রয়েছেন। এসব নারীকে প্রসব পূর্ব সেবা ও পরামর্শের পাশাপাশি সন্তান নিরাপদে জন্মদানের জন্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতি মাসেই ১০ থেকে ১২ জন গর্ভবতীকে আমরা বিনামূল্যে ডেলিভারি করিয়ে থাকি এবং প্রসব পরবর্তী পরিবার পরিকল্পনার পদ্ধতি দেই।

পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক রেজাউল করিম জানান, নারী-পুরুষের জন্য জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হিসেবে অস্থায়ী ও স্থায়ী পদ্ধতি খাবার বড়ি, ইনজেকশন, কনডম, ভ্যাসকেটমি, এনএসভি, ইমপ্ল্যান্ট ও লাইগেশন সম্মন্ধে আমরা সক্ষম দম্পতিদের পরামর্শ দিয়ে থাকি। তবে এগুলোর মধ্যে খাবার বড়ি ও কনডম ব্যবহারে উদ্বুব্ধ হন বেশিরভাগ দম্পতি। জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে আধুনিক ধারণার অভাব এর মূল কারণ বলে জানান এ পরিদর্শক।

Pirojpur-Pic

কলাখালী গ্রামের এনজিও কর্মী অনামিকা বিশ্বাসের মতে, শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে কিছু কিছু দম্পতির মধ্যে বিদ্যমান নানা ধরনের কু-সংস্কার বা ভ্রান্তধারণা দূর করা দরকার। গর্ভবতী নারীদের জন্য ধনুষ্টংকারের টিকা নিয়ে এখনও কারও কারও মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে।

তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে জেলার ইন্দুরকানি উপজেলার চরসাউদখালী গ্রামে। এ গ্রামে ৭৫৩ জন অধিবাসির প্রধান পেশা হচ্ছে মৎস্য আহরণ। প্রায় সবাই গরিব, আবাসন প্রকল্প, ভূমিহীনদের জন্য বরাদ্দকৃত জমিতে ঘর তৈরি করে বসবাসসহ সরাসরি বিদ্যুৎ সুবিধা বঞ্চিত এ গ্রামের মানুষ অনেকটাই অশিক্ষা ও পশ্চাদপদ মানসিকতার।

এসব কারণে পরিবার পরিকল্পনার মতো পদ্ধতি গ্রহণের ক্ষেত্রে অনিহা বিদ্যমান। গত ফেব্রুয়ারি মাসে এ গ্রামে মৎস্যজীবী মহিবুলের স্ত্রী আঁখি (২৩) এক মৃত শিশুর জন্ম দেয়। স্থানীয়রা জানান, সঠিক সময়ে হাসপাতালে না যাওয়ায় শিশুটি মারা গেছে। এছাড়া বেশিরভাগ দম্পতির রয়েছে একাধিক সন্তান। কারও কারও রয়েছে ৬ থেকে ৭ সন্তান।

কথা হয় চরসাউদখালী গ্রামের ছয় সন্তানের জননী শারমিন বেগমের (৩৩) সঙ্গে। তিনি জানান, একটি ছেলে সন্তানের জন্য পরপর পাঁচটি মেয়ে সন্তান হয়েছে। পুরুষরা উপার্জনের ক্ষেত্রে মেয়েদের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় স্বামীর ইচ্ছায় এতগুলো সন্তান নিতে হয়েছে। শেষ সন্তানটি ছেলে হওয়ার পর তিন বছর ধরে নতুন গর্ভধারণে স্বামীর তাগিদ নেই বলে স্থায়ী বন্ধাত্বকরণ পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন।

Pirojpur-Pic

এ গ্রামের সাত সন্তানের জননী পারভীন বেগম (৩২) সংসার করছেন ১৮ বছর। বিয়ের পর শারীরিক সমস্যার কারণে পরিবার পরিকল্পনার কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারেননি। তাই একে একে জন্ম দিয়েছেন সাতটি সন্তান। এদের মধ্যে ৪ ছেলে ও ২ মেয়ে বেঁচে আছে।

এ ব্যাপারে এলাকার পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাঠ কর্মী মারুফা জানান, পারভীনের শরীরে হরমন জনিত কিছু জটিলতা থাকায় ওই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। ১৬ বছর বয়সে বাল্য বিবাহের শিকার এ ধরনের মায়েরা এরকম নানান স্বাস্থ্যগত সমস্যায় পড়তেই পারেন। এখন তার বয়স বেড়ে গিয়ে যে কোনো জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের উপযুক্ত হয়েছেন। তৃণমূলে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য সেবার আধুনিক সুযোগ সুবিধা না থাকার কারণে এভাবেই জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় বলে চরসাউদখালীর এ মা একটি দৃষ্টান্ত।

এ চরের দিনমজুর নাসির মাতুব্বর (৪৮) ও গৃহবধূ হালিমা (৩৫) দম্পতির সন্তান সংখ্যা পাঁচ। চারটি ছেলে ও একটি মেয়ে তাদের। সর্বকনিষ্ঠ সন্তানটি পাঁচ বছরের মেয়ে, এখনও স্কুলে যায় না। ছেলেদের মধ্যে বড় জন ঢাকায় গার্মেন্টস কর্মী, দ্বিতীয় জন খেয়ার মাঝি, বাকি দুটি স্কুলে পড়ে। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির সফল বাস্তবায়নের অভাবেই এ দম্পতির বাড়তি সন্তান জন্মদানের এ প্রবণতা চরসাউদখালীতে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রাম কৃষ্ণ দাস জানান, জেলায় ২ লাখ ২ হাজার সক্ষম দম্পতি রয়েছে। এর মধ্যে গর্ভবতী নারী রয়েছেন সাড়ে সাত হাজার। তাদের সেবার জন্য ৪১৬টি স্যাটেলাইট ক্লিনিক থাকার কথা, কিন্তু রয়েছে ২৮০টি। এছাড়া জেলায় ৭৬ জন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা থাকার কথা থাকলেও কর্মরত আছে ৬১ জন। এ সংকটের কারণে বিভাগীয় সেবা প্রদান করা অনেকটাই দূরহ।

এমএএস/জেআইএম

আরও পড়ুন