প্রতি মিনিটে কল পেয়ে অবাক বাদশা
মোবাইলে কথা বলছেন বাদশা মিয়া
‘এত মানুষের ভালোবাসা আমাকে অবাক করেছে। আমাদের চারপাশে এত হৃদয়বান মানুষ আছেন আমার জানা ছিল না। চরম বিপদে আমার পাশে দাঁড়ানো হৃদয়বান মানুষগুলোকে দেখে আমি অভিভূত হয়েছি। এত মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতা পাব ভাবিনি। আমাকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখালেন তারা। তাদের ঋণ আমি এক জীবনে শোধ করতে পারব না। এজন্য আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ।’
ঠিক এভাবেই সবার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কচুয়া ইউনিয়নের চন্দনপাঠ গ্রামের যুবক বাদশা মিয়া। পল্লী বিদ্যুতের কাজ করতে গিয়ে পঙ্গু হওয়ার নির্মম ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আহাজারি করেছিলেন বাদশা। তার সেই আহাজারি হৃদয় ছুঁয়েছে সবার। এরই মধ্যে অনেকে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। সবার ভালোবাসা ও সহযোগিতায় ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন বাদশা।
‘বাদশার আহাজারি’ শিরোনামে গত রোববার (১৬ আগস্ট) জাগো নিউজে একটি মানবিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনের ভিডিও দেখে হৃদয়ে দাগ কাটে সবার। এরপর থেকে তাকে সহযোগিতার জন্য অনেকে হাত বাড়ান। এ পর্যন্ত বাদশার মোবাইল নম্বরে কয়েক হাজার কল এসেছে। ইতোমধ্যে অনেকেই তাকে সহযোগিতা করেছেন। দেশ-বিদেশ থেকে কল দিয়ে অনেকেই বাদশার খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং সহযোগিতা করছেন। এরই মধ্যে বিভিন্নজনের কাছ থেকে এক লাখ টাকা সহযোগিতা পেয়েছেন বাদশা। প্রতি মিনিটে তার কাছে সহযোগিতা পাঠানোর কল আসে।

জাগো নিউজের গাইবান্ধা প্রতিনিধি জাহিদ খন্দকারের সঙ্গে কথা বলছেন বাদশা মিয়া
পাশাপাশি দুই হাত হারানো বাদশা মিয়ার চোখের জল হৃদয় ছুঁয়েছে সুদূর কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশির। সেজন্য অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কৃত্রিম দুটি হাত প্রতিস্থাপন করিয়ে বাদশা মিয়ার মুখে হাসি ফিরিয়ে দিতে চান তিনি। বাদশা যেন আবার কর্মক্ষম হতে পারেন, নিজ হাতে খেতে ও পোশাক পরতে পারেন, সে লক্ষ্যে কৃত্রিম হাত ক্রয় ও প্রতিস্থাপনে অস্ত্রোপচারের সব খরচ একাই বহন করবেন ওই প্রবাসী।
প্রবাসে বসে জাগো নিউজে প্রকাশিত ‘বাদশার আহাজারি’ শীর্ষক প্রতিবেদন পড়ে এবং ভিডিওতে বাদশার মর্মস্পর্শী দুর্ঘটনার বর্ণনা শুনে সেই বাংলাদেশি এই মানবিক উদ্যোগ নেন। এরই অংশ হিসেবে প্রখ্যাত প্লাস্টিক সার্জন ডা. সামন্ত লাল সেনের সঙ্গে বাদশার বড় ভাই মোহাম্মদ আলীর যোগাযোগ করিয়েছেন তিনি।

বাদশা মিয়া বলেন, আমার দুর্দশাগ্রস্ত জীবনের চিত্র তুলে ধরার জন্য প্রথমে জাগো নিউজকে ধন্যবাদ। একই সঙ্গে যারা আমার দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এত মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতা পাব কখনও ভাবতে পারিনি। এত মানুষ আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন তা দেখে অভিভূত হয়েছি। বিভিন্নজনের কাছ থেকে আমার মোবাইল নম্বরে এ পর্যন্ত এক লাখ বিকাশে এসেছে। আরও অনেকে পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমি সবার কাছে ঋণী।
বাদশা মিয়া আরও বলেন, কুড়িগ্রাম থেকে এক ভাই ফোন দিয়ে অটোরিকশা কিনে দিতে চেয়েছেন। অটোরিকশার ভাড়া দিয়ে দৈনিক যা আয় হবে তা দিয়ে সংসার চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তবে এখনও পাইনি। পাশাপাশি চট্টগ্রাম থেকে এক ভাই প্রতি মাসে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। কয়েক হাজার ভাই প্রবাস থেকে ফোন দিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে একজনের সাথে কথা বলা অবস্থায় অপেক্ষায় থাকছে আরও ২০-২৫টি কল। হাত না থাকায় ফোন রিসিভ করতে আমার খুব কষ্ট হয়। এরপরও অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। তবে অনেক ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে পারিনি। এজন্য ক্ষমা চাচ্ছি। সময়মতো ফোন রিসিভ করতে না পারায় কেউ মনে কষ্ট নেবেন না।

বাদশার বাবা মোসলেম উদ্দিন বলেন, এত মানুষের সহযোগিতা ও ভালোবাসা পাব ভাবতে পারিনি আমরা। দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ ফোন দিয়েছেন, খোঁজখবর নিয়েছেন। আমাদের কষ্ট অনেকটা দূর হয়ে গেছে। আমরা সবার কাছে কৃতজ্ঞ। তবে আমার ছেলের এই অবস্থার জন্য যারা দায়ী তাদের বিচার চাই।
সাঘাটা উপজেলার স্কুলশিক্ষক জয়নুল আবেদীন তৌহিদ বলেন, বাদশার দুটি হাত হারানোর কাহিনি জানার পর জেলার বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইতোমধ্যে অনেকে সহযোগিতা করেছেন।
সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর বলেন, বাদশার বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। সংবাদ প্রকাশের পর জেনেছি। বাদশাসহ উপজেলায় যারা বিভিন্ন দুর্ঘটনায় পঙ্গু ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের সহযোগিতা করা হবে।
এএম/পিআর