ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

সিডরে দুই সন্তানকে হারানোর স্মৃতি মনে উঠলেই কেঁদে ওঠেন রহিমা

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) | প্রকাশিত: ১১:১৪ এএম, ১৬ নভেম্বর ২০২১

রাত ৯ টা, চারদিকে অন্ধকার, আকাশে মেঘের গর্জন, পরিবেশটা ভারি ভয়ঙ্কর। কিন্তু তাতে কী উপকূলের মানুষের এ ঝড়-ঝাপটাতেই বসবাস। সেই চিন্তা থেকেই পরিবারের সবাইকে ঘুমানোর ব্যবস্থা করে বিছানার পাশে বসেছিলেন রহিমা। কিন্তু সিডরের তাণ্ডবে হঠাৎ সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। চোখের সামনেই হারিয়েছেন দুই সন্তানকে। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘটা তাণ্ডবের ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সেই স্মৃতি মনে উঠলে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন রহিমা বেগম।

ছল ছল চোখে পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নের উপকূলীয় এলাকার হযরত আলীর স্ত্রী রহিমা বেগম বলেন, চারদিকে যখন বাতাসের তীব্রতা বাড়তে থাকে তখন ঘর থেকে বের হই আমরা। কিন্তু সবাই বের হওয়ার আগেই জোয়ারের পানি উঠে যায় ঘরে। ঘর থেকে উঠানে নামতে না নামতেই পানির উচ্চতা বুক সমান। আমার সাড়ে ৩ বছরের মেয়ে রাজিয়াকে তার বাবার কাঁধে ও সাড়ে ৫ বছরের ছেলে রাসেলকে আমার বড় ছেলে আ. রহিমের কাঁধে তুলে দিয়ে সবাই বেড়িবাঁধের দিকে ছুটতে শুরু করি।

jagonews24

রাহিমা বলেন, বেড়িবাঁধের দিকে যেতে যেতে পানির স্রোত ও উচ্চতা বাড়তে থাকে, আমার ছোট মেয়ে রাজিয়াকে ওর বাবা বলে তুমি তোমার আম্মুর কোলে যাও কিন্তু মেয়ে বলে ‘মার কোলে গেলে মায় পানিতে আমারে ছাইড়া দিবো’। এরপরও জোর করে আমি কোলে নিলেও কিচ্ছুক্ষণ পর আবার ওর বাবার কোলে চলে যায়। আমার বড় ছেলের কাঁধ থেকে রাসেলকে বেড়িবাঁধের দিকে ধাক্কা দিয়ে পাঠালেও আর পৌঁছানো হয়নি। তোকে স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তবে বড় ছেলেটা কোনোমতে বাঁধের রাস্তায় ওঠে। আমি পানিতে নেমে স্বামীর কাছ থেকে বিদায় নিয়েছি। মনে করেছি এই শেষ। যখন স্রোতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তখন তো মনে করছি সাগরের মধ্যে নিয়ে আসছে আমাকে। সেটা যে রাস্তারপাড় তা বুঝতে পারিনি। বাড়ি থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে গিয়া পায়ে মাটি পাওয়ায় একটি বাঁশের বেড়ায় ভর করে রাস্তায় উঠেছি। পরে শুনি আমার মেয়েটাও মারা গেছে। ওই রাতটি এখনো চোখের সামনে ভাসে। সেই রাত মনে হলেই বুকটা ফেটে যায়।

দুই সন্তান হারানো বাবা হযরত আলী বলেন, আমরা পরিবারের ১৪ জন লোক এক জায়গায় ছিলাম। বিভিন্ন জায়গা থেকে ১২ জন জীবিত উঠতে পারলেও আমার সাড়ে তিন বছরের মেয়ে ও সাড়ে ৫ বছরের ছেলেকে আর রাতে খুঁজে পাইনি। আমি মেয়েটাকে এক হাত দিয়ে ধরে রাখছি অন্য হাত দিয়া পানির মধ্যে হাবুডুবু খাইছি এর মধ্যে মেয়েটা যে কখন মারা গেলো তা বলতে পারি না। হঠাৎ চেয়ে দেখি মেয়ের মুখ থেকে পানি পড়ছে নাড়া দিয়ে দেখি মেয়েটা আর বেঁচে নেই। কখন যে মেয়েটা আমার হাত থেকে ছুটে গেলো তা আজও বলতে পারছি না। শেষ রাতের দিকে একটি বাঁশ বাগান থেকে মেয়েটি ও ডোবা থেকে ছেলেকে উদ্ধার করি। বিগত ১৪টি বছর এ দিন আসলে ভয়াবহ স্মৃতি আঁকড়ে ধরে পার করি। এমন দিন যেন কারও জীবনে না আসে।

আসাদুজ্জামান মিরাজ/এসজে/জিকেএস