ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

৫০ বছরে ১০৬ জাতের ধান উদ্ভাবন ব্রির

আমিনুল ইসলাম | গাজীপুর | প্রকাশিত: ০৫:৪৪ পিএম, ১৬ ডিসেম্বর ২০২১

দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। স্বাধীনতার ৫০ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি ধানের জাত ও নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনসহ নানা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।

রাজধানী ঢাকা থেকে ৩৬ কিলোমিটার উত্তরে গাজীপুরের জয়দেবপুরে গড়ে উঠেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রি। এখানে ১৯টি একক বিষয়ভিত্তিক গবেষণা বিভাগ কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানে ২০টি উন্নতমানের গবেষণাগার, একটি অত্যাধুনিক জার্মপ্লাজম ব্যাংক, ১০টি গ্রিন হাউজ, ১০টি নেট হাউজ এবং ৭৬ দশমিক ৮৩ একর পরীক্ষণ মাঠ রয়েছে।

এছাড়া দেশের বৈচিত্র্যময় কৃষি পরিবেশ অঞ্চলসমূহে ধান উৎপাদনের সমস্যা ও সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণ ও সে বিষয়ে গবেষণার জন্য দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে ১১টি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন করেছে, যা কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, ফেনীর সোনাগাজী, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, সিরাজগঞ্জ এবং গোপালগঞ্জে অবস্থিত।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত ১০৬টি (৯৯টি ইনব্রিড ও ৭টি হাইব্রিড) উচ্চ ফলনশীল আধুনিক ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। বিখ্যাত কালিজিরা এবং কাটারিভোগ ধান বাংলাদেশের ভৌগলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ধান উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যে স্বনির্ভরতা ও খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে বাংলাদেশের দীর্ঘ সংগ্রাম ও সাফল্যের অংশীদার।

দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনে ৫০ বছর ধরে অসামান্য অবদান রেখে চলছে ব্রি। ১৯৭০-৭১ সালে দেশের সাত কোটি ১২ লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে চালের উৎপাদন ছিল এক কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন মাত্র। খাদ্যের জন্য আমরা ঐতিহাসিকভাবে পরনির্ভরশীল ছিলাম। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত ‘দিন বদলের সরকার’ সার এবং জ্বালানি তেলের দাম কমানো, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষিতে প্রণোদনা প্রদান, সার বিতরণ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, দেশে হাইব্রিড ধানের প্রবর্তন, ব্রি ধান ২৮, ২৯-এর ব্যাপক সম্প্রসারণ, ধানের উন্নত মানের বীজ সরবরাহ, সেচের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থাসহ ইত্যাদি নানামুখী কৃষকবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ফলে ১৯৯৯ সালে দেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। প্রধানমন্ত্রীকে প্রদান করা হয় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) কর্তৃক মর্যাদাপূর্ণ সেরেস পদক। ২০০১ সালের পর দেশ আবার খাদ্য ঘাটতিতে পড়ে।

২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবার যখন দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করেন তখন খাদ্য ঘাটতি ছিল ২৬ লাখ টন। তাই সরকার গঠন করেই তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে। প্রথম ক্যাবিনেট সভায় সারের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যেখানে ৮০ টাকার টিএসপির মূল্য ২২ টাকা ও ৭০ টাকার এমওপির মূল্য ১৫ টাকায় নামিয়ে এনে সুষম সার ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর পদক্ষেপ নেন। এছাড়া কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি প্রদান, ১০ টাকায় কৃষকের জন্য ব্যাংক হিসাব চালুকরণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষিতে প্রণোদনা প্রদান, সার বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাসহ নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তিনি। ফলে ২০১৩ সালে এসে দেশ শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতাই অর্জন করেনি, খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত হয়।

২০০৯-২০ পর্যন্ত ১২ বছরে ব্রি উদ্ভাবিত জাতগুলোর প্রতিটিই বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। খরা, বন্যা ও লবণাক্ততাসহিষ্ণু, জিংকসমৃদ্ধ, প্রিমিয়াম কোয়ালিটি, ডায়াবেটিক রাইসসহ অধিক উচ্চফলনশীল। পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় ব্রি এখন পর্যন্ত ১২টি লবণাক্ততাসহিষ্ণু, তিনটি খরা সহনশীল, তিনটি বন্যা সহনশীল, দুটি জোয়ার-ভাটা সহনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। এসব জাত মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের মোট লবণাক্ত এলাকার প্রায় ৩৫ ভাগ ধান চাষের আওতায় এসেছে এবং এ থেকে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। খরাপ্রবণ এলাকায় খরাসহিষ্ণু জাতগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে ১২ শতাংশ আবাদ এলাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। জলমগ্নতা সহনশীল জাতগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২৬ শতাংশ এলাকা চাষের আওতায় আসায় উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। উপকূলীয় এলাকায় ধানের আবাদ বাড়ানোর জন্য উদ্ভাবিত জোয়ার-ভাটা সহনশীল জাত (ব্রি ধান ৭৬, ৭৭) বাড়ায় প্রায় ৫৭ হাজার হেক্টর জমি এ ধান চাষের আওতায় এসেছে।

২০১৮-১৯ সালে উচ্চফলনশীল ধানের জাতগুলো দেশের শতকরা ৮০ ভাগ জমিতে চাষ করা হয়েছে এবং এ থেকে পাওয়া গেছে দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৯১ ভাগ। ঘাত সহনশীল ও অনুকূল পরিবেশ উপযোগী জাতগুলোর আবাদ সম্প্রসারণের ফলে ২০১০-১৯ পর্যন্ত ছয় লাখ টন হারে উৎপাদন বেড়েছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত রয়েছে।

বিভিন্ন ঘাত সহনশীল জাতসহ দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ব্রি এপর্যন্ত ১০৬টি জাত উদ্ভাবন করেছে। খাদ্যনিরাপত্তাকে টেকসই করার জন্য লোকেশন স্পেসিফিক জাত উদ্ভাবনে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আর খাদ্যনিরাপত্তা বলতে চাল বা ভাতের নিরাপত্তাকে বোঝায়। স্বাধীনতার পর আমাদের দেশের মানুষ মোটা চাল মোটা ভাতে সন্তুষ্ট থাকত। কিন্তু দেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের ফলে এখন মানুষ সরু চাল পছন্দ করছে। আপনারা জানেন অতীতের তীব্র খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশ বর্তমানে উদীয়মান অর্থনীতির নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। এক সময়ের তলাবিহীন ঝুড়ি এখন শক্ত ভিত্তির উদ্বৃত্ত খাদ্যের বাংলাদেশ; ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ এবং গড় ফলনের হিসাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম। এমনকি দেশের চাহিদা মিটিয়ে কিছু চাল বিদেশেও রফতানি করা হয়। এটি আমাদের জাতীয় জীবনে এক অসামান্য অর্জন। খাদ্য উৎপাদনে এ অসামান্য অর্জন সম্ভব হয়েছে প্রধানত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উচ্চফলনশীল ধানের জাত ও আনুষঙ্গিক লাগসই চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কৃষক পর্যায়ে এসব প্রযুক্তি প্রয়োগের ফলে।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) এবং বর্তমান সরকারের ভিশন ২০২১ এবং ২০৪১-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘ব্রি’ এরই মধ্যে রাইস ভিশন-২০৫০ প্রণয়ন করেছে। যা থেকে বর্তমান বৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের জনসংখ্যা সাড়ে ২১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। রাইস ভিশনে বলা হয়েছে, উৎপাদনের গতিশীলতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০, ২০৪১ ও ২০৫০ সালে চালের উৎপাদন হবে যথাক্রমে ৪০, ৪৪ ও ৪৭ মিলিয়ন টন। বিপরীতে ২০৩০, ২০৪১ ও ২০৫০ সালে যথাক্রমে ১৮৬, ২০৩ ও ২১৫ মিলিয়ন লোকের খাদ্য চাহিদা পূরণে চাল প্রয়োজন হবে যথাক্রমে ৩৮ দশমিক ৫, ৪২ দশমিক শূন্য ও ৪৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন। চূড়ান্তভাবে ২৫ কোটি মানুষকে খাওয়ানোর টার্গেট নিয়ে ব্রি বিজ্ঞানীরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। রাইস ভিশন বাস্তবায়নের পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে ‘ব্রি’ একটি স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান তৈরি করেছে।

দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টির অধিকাংশ ক্যালরি, প্রোটিন ও মিনারেল আসে ভাত থেকে। ভাত তাদের কাছে সহজলভ্য। সাধারণ মানুষ দুধ-ডিম ও মাংসসহ অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার কিনতে না পারলেও ভাত নিয়মিত খেতে পারছে। তাই ভাতের মাধ্যমে কীভাবে পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করা যায়, সেই লক্ষ্যে কাজ করছেন আমাদের বিজ্ঞানীরা। চাল ছেঁটে যাতে চালকে অনিরাপদ করতে না হয় সেজন্য ‘ব্রি’ এরই মধ্যে প্রিমিয়াম কোয়ালিটিসম্পন্ন জাত যেমন ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৬৩, ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৮০, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৬, ব্রি ধান৮৮ এবং ‘ব্রি’ ধান৯০ উদ্ভাবন করেছে। এসডিজি সামনে রেখে ‘ব্রি’ বিজ্ঞানীরা এরমধ্যে পাঁচটি জিংকসমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবন করেছে, পাশাপাশি অন্যান্য পুষ্টি উপাদান যেমন প্রোটিন, আয়রন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, গাবা ও বিটা ক্যারোটিন-সমৃদ্ধ জাতসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর ধান উদ্ভাবন করেছে।

কৃষিকে টেকসই ও বহুমাত্রিকীকরণে জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৮-তে কৃষি উন্নয়নে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জাত উদ্ভাবন, রোগবালাই দমন, সার ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। ধানের উৎপাদন ও রোগবালাই দমনে ন্যানো ফার্টিলাইজার ও ন্যানো পেস্টিসাইডের প্রভাব নিয়ে ব্রি’তে গবেষণা চলছে। এছাড়া বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে প্রিসিশন এগ্রিকালচার নিয়েও ব্রি’তে গবেষণা চলমান রয়েছে।

এইচআইইএসের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে মাথাপিছু চালের চাহিদা বছরে জনপ্রতি ১৩৪ কেজি, যা খাদ্যের বহুমুখিতা ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ফল। চালকে প্রধান খাদ্যশস্য বিবেচনায় রাখতে হলে আমাদের কমপক্ষে ৬০-৬৫ শতাংশ ক্যালরি চাল থেকে নিতে হবে। তা না হলে ডায়াবেটিস, স্থূলতাসহ বিভিন্ন লাইফ স্টাইল (জীবনাচরিত) রোগ বেড়ে যাবে। সেই হিসাবে মাথাপিছু চালের ব্যবহার জনপ্রতি ১৩৩ কেজির নিচে আসা উচিত হবে না। অথচ ইদানীং দেখা যাচ্ছে, অনেকে ওজন কমানোর জন্য খাদ্যতালিকা থেকে ভাত বাদ দিয়ে দিচ্ছেন; বিশেষ করে টিনএজ বা অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা। ভাতের পরিবর্তে তারা জাংক বা ফাস্টফুডের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে, যা ভাতের তুলনায় আরও বেশি ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ফলে আমাদের দেশে মাথাপিছু চালের চাহিদা কমলেও সারা বিশ্বে বাড়ছে।

মো. আমিনুল ইসলাম/আরএইচ/এএসএম