ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুন: খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন

সায়ীদ আলমগীর | কক্সবাজার | প্রকাশিত: ০৫:৪৯ পিএম, ১০ জানুয়ারি ২০২২

ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়েছে কক্সবাজারের উখিয়ার ১৬ নম্বর শফিউল্লাহকাটা রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের বসতবাড়ি, লার্নিং সেন্টার, শিশু পার্কসহ ৬ শতাধিক স্থাপনা। সব কিছু হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিন কাটছে আড়াই হাজারের বেশি রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের। তবে দ্রুত রোহিঙ্গাদের শেল্টার নির্মাণসহ সমস্যা লাঘবে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) শাহ রেজওয়ান হায়াত।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্ত ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন। অতিরিক্ত প্রত্যাবাসন কমিশনারকে প্রধান করে গঠন করা কমিটিতে ৮ এবিপিএন, ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা ও সিআইসিকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। প্রতিবেদনের পর ক্ষতিগ্রস্ত বসতি ও ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ জানানো হবে বলে উল্লেখ করেন কমিশনার।

সূত্র জানায়, আগুন লাগার পর কোনোমতে পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদ আশ্রয় গিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছেন রোহিঙ্গারা। বসতি ছাই হওয়ার পাশাপাশি পুড়ে গেছে কাপড়চোপড়, আসবাবপত্র ও খাদ্যসামগ্রী। পুড়ে যাওয়া বসতিতে খুঁজে বেড়াচ্ছেন কিছু পাওয়া যায় কি না। কিন্তু আগুন কেড়ে নিয়েছে তাদের সব সম্বল। শুধু দাঁড়িয়ে আছে বসতির পিলারগুলো। সোমবার সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও এনজিও প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

jagonews24অগ্নিকাণ্ডে ছয় শতাধিক স্থাপনা পুড়ে ভস্মীভূত হয়েছে/ছবি: জাগো নিউজ

৮ নম্বর এপিবিএনের অধিনায়ক পুলিশ সুপার শিহাব কায়সার খান জানিয়েছেন, শফিউল্লাহকাটা পুলিশ ক্যাম্প-১৬-এর আওতাধীন এফডিএমএন ক্যাম্প-১৬-এর বি-১ ব্লকের রোহিঙ্গা ইলিয়াস মাঝি ও আবুল সৈয়দ মাঝির ঘরে রান্না করার সময় চুলার আগুন বেড়ায় লেগে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। সাড়ে ৫টায় আগুন লাগার খবর পেয়ে উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া ও কক্সবাজার সদর হতে ফায়ার সার্ভিসের ৮টি ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনের লেলিহান শিখায় বসতঘর, ফায়ার ড্রাম, ওয়াটার ট্যাংক, কিচেন আইটেম, গ্যাস সিলিন্ডার, ফ্লোর ম্যাট, লার্নিং সেন্টার, শিশু পার্কসহ ছয় শতাধিক স্থাপনা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এতে আনুমানিক অর্ধশত কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, আগুনে পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা ও ডজনাধিক স্থানীয় বাসিন্দার ঘর পুড়েছে। আগুন না ছড়াতে বা নেভাতে গিয়ে ভাঙচুর হয়েছে শতাধিক ঘর। বি-১ ব্লক, বি-২ ব্লক, বি-৩ ব্লক ও সি-৩ ক্যাম্পে এই ঘরগুলো ক্ষয়ক্ষতি হয়। ভুক্তভোগীদের ক্যাম্প-১৬-এর অন্তর্ভুক্ত সব লার্নিং সেন্টার, মাদরাসা ও মক্তব, ওমেন ফ্রেন্ডলি স্পেস, আত্মীয়স্বজন ও পার্শ্ববর্তী ক্যাম্পে রাতে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। ক্ষতিগ্রস্তদের রাতে শুকনো খাবার দিয়ে সহযোগিতা করছে এনজিও সংস্থা ব্র্যাক ও রিক। সকালে খাবার সরবরাহ করেছে এনজিও সংস্থা এমএসআই।

jagonews24আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া বসতিবাড়িতে সম্বল কিছু পাওয়া যায় কি না খুঁজছেন অনেকে/ছবি: জাগো নিউজ

ক্যাম্পে কাজ করা তুরস্কের টিকা এনজিও’র কো-অর্ডিনেটর মো. ফারুক জানিয়েছেন, তাদের পরিচালিত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের জন্য স্থাপিত একমাত্র শিশু পার্ক, ত্রাণ বিতরণ-কেন্দ্র, অফিস কক্ষ ও স্থাপনা পুড়ে গেছে। পুড়ে যাওয়া বসতবাড়িগুলো টিকা ও আফাদ এনজিওর দেওয়া বলে উল্লেখ করেন তিনি।

উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে রোহিঙ্গা নিবাসের পাশাপাশি পুড়েছে স্থানীয় ডজনাধিক বসতিও। একে তো প্রচণ্ড শীত পড়ছে। তার ওপর বসতি হারিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে দিন কাটছে ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা ও স্থানীয় পরিবারগুলোর। শীতের কাপড়, খাদ্য ও পানির সংকটে চরম কষ্টে রয়েছেন তারা।

jagonews24দ্রুত রোহিঙ্গাদের শেল্টার নির্মাণসহ সমস্যা লাঘবে কাজ করছে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন/ছবি: জাগো নিউজ

আইওএম-এর ন্যাশনাল কমিউনিকেশন অফিসার তারেক মাহমুদ বলেন, কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা নিরীক্ষা করা হচ্ছে। তা ঠিক করার পর সমন্বয় করে দ্রুত সমস্যার সমাধান করা হবে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শামছুদ্দৌজা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইউএনএইচসিআর-এর পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে তাবু। রাতের আশ্রয় তৈরির কাজ করছে ক্ষতিগ্রস্ত অনেকে।

jagonews24ক্ষতিগ্রস্তদের খাবার দিয়ে সহযোগিতা করছে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো/ছবি: জাগো নিউজ

রোববার (৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যার আগে ৮ এপিবিএনের আওতাধীন রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১৬ শফিউল্লাহকাটা বি ও সি ব্লকে আগুন লাগে। মুহূর্তে আগুনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়ে আগুনে পুড়ে যায় প্রায় ৬০০ স্থাপনা। আগুন লাগার খবর পেয়ে এপিবিএনের কন্ট্রোল রুম থেকে উখিয়া-টেকনাফ ও কক্সবাজারের ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ১৪ এপিবিএন অধিনায়ক মো. নাইমুল হক অর্ধশত অফিসার ও ফোর্সসহ ঘটনাস্থল এসে আগুন নেভাতে সহায়তা করেন।

গত এক বছরে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এখন পর্যন্ত তিনটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। গত বছরের ২২ মার্চ রাতে উখিয়ার ৮ ও ৯ নম্বর ক্যাম্পে ভয়াবহ আগুনে বহু বসতি পুড়ে যায় এবং ১১ জন নিহত হয়েছিলেন। গত ২ জানুয়ারি অগ্নিকাণ্ডে আইওএম পরিচালিত একটি করোনা হাসপাতাল ও তার পাশের কয়েকটি বসতি পুড়ে যায়।

এআরএ/এএসএম