ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

‘লজ্জায় বলেছিলাম, চা নয় জলপাই গাছ লাগাচ্ছি’

এমদাদুল হক মিলন | প্রকাশিত: ০৪:৪১ পিএম, ০৫ জুন ২০২২

জেলা শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত এক গ্রামের নাম ঝলঝলি। সেই গ্রামের যুবক মো. নজরুল ইসলাম চাকরি ছেড়ে দিনাজপুরের সমতলে চা আবাদ করতে গিয়ে এলাকার মানুষের কাছে হাসির খোরাকে পরিণত হয়েছিলেন। লজ্জায় একপর্যায়ে মানুষকে তিনি বলেছিলেন, চা নয়, জলপাইয়ের গাছ লাগাচ্ছেন।

সেই নজরুল এখন চা পাতা বিক্রি করে বছরে আয় করেন আড়াই লাখ টাকা। আবার তার দেখানো পথে অনেকেই এখন চা বাগান করছেন। চা চাষ ছড়িয়ে পড়ছে দিনাজপুরের বিভিন্ন উপজেলায়। তবে ধানের জমিতে এই চা চাষকে উৎসাহিত করতে চায় না দিনাজপুরের কৃষি বিভাগ।

বীরগঞ্জ উপজেলার ২নং পলাশবাড়ী ইউনিয়নের ঝলঝলি গ্রামের নজরুল ইসলাম ২০১৪ সালে এনজিওর চাকরি ছেড়ে এসে বাবার এক একর জমিতে চা চাষ শুরু করেন। সফলতাও পেয়েছেন আশাতীত। সেসময় জমি প্রস্তুত করে চারা রোপণে তার খরচ হয়েছিল ৬০ হাজার টাকা। পরের বছর থেকেই শুরু হয় চা পাতা বিক্রি। তবে ২০১৭ সালে পঞ্চগড়ে নর্থবেঙ্গল চা কারখানায় ৩৫ টাকা কেজি দরে প্রথম ২৯ হাজার টাকার চা পাতা বিক্রি করেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। এখন সেই বাগান থেকে বছরে সাতবার চা পাতা বিক্রি করেন নজরুল। খরচ বাদ দিয়ে আয় করেন বছরে আড়াই লাখ টাকা।

সমতলে প্রথম চা বাগান করতে গিয়ে যে যুবককে সবাই পাগল বলেছিলেন, সেই যুবকের দেখাদেখি কেবল পলাশবাড়ী ইউনিয়নেই এখন ১০টি চায়ের বাগান গড়ে উঠেছে।

‘লজ্জায় বলেছিলাম, চা নয় জলপাই গাছ লাগাচ্ছি’

চা চাষি নজরুল ইসলাম জানান, বীরগঞ্জ উপজেলায় পঞ্চগড়স্থ বাংলাদেশ চা বোর্ডের নর্দান বাংলাদেশ প্রকল্পের ক্ষুদ্র পর্যায়ে চা চাষে কর্মশালার মাধ্যমে উৎসাহিত হয়ে আরও কয়েকজন চা চাষ শুরু করেছেন। এরই মধ্যে ২৩ জন চাষি ৪২ দশমিক ২৪ একর জমিতে চা চাষ করছেন। বীরগঞ্জ ছাড়াও দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ, কাহারোল, বিরামপুর ও খানসামা উপজেলায় চা চাষ হচ্ছে।

দিনাজপুরের প্রথম চা চাষি নজরুল ইসলাম ২০০২ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি স্থানীয় একটি নন-এমপিও স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। বেতন-ভাতা না পেয়ে পরে ইএসডিও নামে একটি এনজিওতে চাকরি শুরু করেন। সেখান থেকে পরে ব্র্যাকে চাকরি পান। তবে বাবা-মায়ের পিড়াপিড়িতে চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসেন। এরপর বাবার এক একর জমিতে চা চাষ শুরু করেন তিনি।

নজরুল বলেন, পঞ্চগড় থেকে চারা সংগ্রহ করে যখন জমিতে চারা রোপণ করছিলাম, তখন আমাকে দেখে এলাকার সবাই হাসাহাসি করতো। আমাকে পাগল হিসেবে আখ্যায়িত করতো। রাস্তায় আমাকে দেখে অনেকে বলতো, ওই দেখ পাগলটা যাচ্ছে। সেসময় চায়ের চারা ও জলপাইয়ের চারা এরকম হওয়ায় লজ্জায় এলাকার মানুষকে বলতাম, চা নয় আমি জলপাইয়ের চারা লাগাচ্ছি।

‘লজ্জায় বলেছিলাম, চা নয় জলপাই গাছ লাগাচ্ছি’

তিনি বলেন, চা গাছ ৯ ইঞ্চি হয়ে উঠলে প্রথম একবার ছেঁটে ফেলতে হয়। চা গাছ ছেঁটে ফেলতে দেখে অনেকেই আমাকে শুনিয়ে বলতো, পুরোটাই পাগল হয়ে গেছে। সেই আমি এখন ওই চা বাগান থেকে খরচ বাদ দিয়ে বছরে আড়াই লাখ টাকা আয় করি।

নজরুল ইসলাম কৃষকদের উদ্দেশে বলেন, চা চাষে ঝুঁকি কম। ধান, গম, ভুট্টা, টমেটোসহ সব কৃষিতে ঝুঁকি রয়েছে। তা ছাড়া কোনো ফসলই বছরে সাতবার ফলন দেয় না, কিন্তু চা পাতা বছরে কমপক্ষে সাতবার তোলা যায়। তাই নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিমুক্ত করতে সব কৃষকের কিছু কিছু জমিতে চা চাষ করা উচিত। যাতে করে কৃষক সারাবছর অভাবের মধ্যে না পড়েন।

তিনি বলেন, চা পাতার দাম কমে গেছে। যে চা-পাতা আগে ৩৫ টাকা কেজি বিক্রি হতো তা এখন ১২ থেকে ১৪ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদন বেড়েছে কিন্তু লাভ বাড়েনি। পাতা আগের দামে বিক্রি হলে এই চা বাগান থেকেই বছরে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা আয় হতো।

‘লজ্জায় বলেছিলাম, চা নয় জলপাই গাছ লাগাচ্ছি’

নজরুল ইসলাম বলেন, হিমালয়ের পাদদেশে দিনাজপুরের অবস্থান হওয়ায় এ এলাকায় চা চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এ অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া উপযুক্ত থাকায় চা ভালো উৎপাদন হওয়া সম্ভব। চা গাছে নিবিড় পরিচর্যা, পরিমিত পানি সেচ ও অন্যান্য যত্ন নিতে হয়।

আগামী দিনে আরও নতুন চা বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে নজরুল ইসলামের। তিনি এলাকায় গড়ে তুলেছেন পলাশবাড়ী ঝলঝলি বহুমুখী সমবায় সমিতি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই ইউনিয়নের আব্দুল মজিদ, রফিকুল ইসলাম, নুরুজ্জামানসহ ১০ জন চাষি চা চাষ করছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মনজুরুল হক বলেন, জেলায় কী পরিমাণ চা চাষ হয় তা আমাদের জানা নেই। আমরা এই জেলায় চা চাষকে উৎসাহিত করি না।

এমআরআর/জেআইএম