২০২৬ সালে ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে বড় এজেন্ডা হয়ে দাঁড়াবে
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান
২০২৬ সাল সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলছে। গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে বছরটি ইতিবাচক সূচনায় শুরু হওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও, একই সঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণজনিত বাস্তবতা সামনে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক উন্নয়ন সংক্রান্ত বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্বস্তি আনতে পারে অর্থনীতিতে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এ মন্তব্য করেন।
২০২৬ সালকে আপনি কীভাবে দেখছেন, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে?
২০২৬ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। দেশটি একটি গণতান্ত্রিক ট্রানজিশনের মধ্য দিয়ে যাবে, যা একদিকে ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে। দীর্ঘদিন ধরে যে অনিশ্চয়তা ছিল—বিশেষ করে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে—তা কিছুটা কাটতে পারে। যদি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় তাহলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সাপ্লাই চেইন রেসপন্স এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মতো বড় বড় ইস্যুতে অগ্রগতি সম্ভব হবে।
সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তবে সরকার যদি এগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন না করে এবং আরও স্ট্যান্ডার্ডাইজ না করে, তাহলে অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়তে পারে। এখানে কোনো শৈথিল্য দেখালে আমরা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবো, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়
নতুন সরকার গঠনের পর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কোন ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?
নতুন সরকার গঠিত হলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। কারণ, তখন নির্বাচনকেন্দ্রিক চাপ কমে আসবে। এটি একটি সম্ভাবনাময় দিক। তবে একই সঙ্গে কিছু পুরোনো চ্যালেঞ্জ থেকেই যাবে—যেমন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো, ব্যবসার খরচ কমানো ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা।
আরও পড়ুন
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্বাচনের পর কী হবে
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত
নতুন বছরে ব্যবসায়ীদের প্রথম প্রত্যাশা নির্বাচিত সরকার
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন সামনে রেখে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী?
নভেম্বর ২০২৬-এ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বাংলাদেশের জন্য এবং অর্থনীতির একটি বড় মাইলফলক। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, ট্রাম্পের সম্ভাব্য ট্যারিফ নীতি, জিও-ইকোনমিক ও জিও-স্ট্র্যাটেজিক চাপ। উত্তরণের ফলে আমরা অনেক দেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার হারাবো। যার কারণে আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে আসবে। এসব মোকাবিলার জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। পাশাপাশি আমাদের জন্য আঞ্চলিক যে সুযোগগুলো আছে, সেগুলোও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।
ব্যাংকিং সেক্টর সংস্কার নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
দেশের অর্থনীতির জন্য ২০২৬ সালে ব্যাংকিংখাত সবচেয়ে বড় এজেন্ডা হয়ে দাঁড়াবে। সুদের হার, বিনিয়োগ—সবকিছুই এর সঙ্গে যুক্ত। সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তবে সরকার যদি এগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন না করে এবং আরও স্ট্যান্ডার্ডাইজ না করে, তাহলে অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়তে পারে। এখানে কোনো শৈথিল্য দেখালে আমরা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবো, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর আমাদের মার্কেট অ্যাকসেস কন্ডিশন বদলাবে। বিশেষ করে শুল্ক সুবিধা ও বাণিজ্যিক ছাড় ধীরে ধীরে প্রত্যাহারের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের নীতি রপ্তানি খাতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে
ট্রাম্পের সম্ভাব্য ট্যারিফ নীতি বাংলাদেশের জন্য কতটা চ্যালেঞ্জিং?
ট্রাম্প শুল্ক দেশের রপ্তানির জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে—এটি এখন আর অনুমানের বিষয় নয়। গত কয়েক মাসের রপ্তানি আয়ের পরিসংখ্যানেই এর প্রভাব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর আমাদের মার্কেট অ্যাকসেস কন্ডিশন বদলাবে। বিশেষ করে শুল্ক সুবিধা ও বাণিজ্যিক ছাড় ধীরে ধীরে প্রত্যাহারের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের নীতি রপ্তানি খাতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তাই আমাদের এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস বাড়াতে হবে। এন্টারপ্রাইজ লেভেলে স্কিল ও প্রোডাক্টিভিটি বৃদ্ধি, কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা এবং পলিসি লেভেলে সহায়ক পরিবেশ তৈরি—দুই দিকেই কাজ করতে হবে।
নীতিগত পর্যায়ে কোন ধরনের পদক্ষেপ জরুরি?
বিজনেস এনভায়রনমেন্ট সহজ করতে সিঙ্গেল উইন্ডো আরও বিস্তৃত করা, লজিস্টিকস পলিসি বাস্তবায়ন, নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মনিটারি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও ট্রেড পলিসির মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে, যাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাজার ও পণ্যের বহুমুখীকরণ কতটা জরুরি?
যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার হলেও আমরা এর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়া, পূর্ব এশিয়া ও আসিয়ানে আমাদের রপ্তানি মাত্র ১২ শতাংশ। তাই প্রোডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন, এফডিআই আকর্ষণ, দেশীয় বিনিয়োগকারীদের ইনসেনটিভ ও ব্যবসার খরচ কমানোর মাধ্যমে আঞ্চলিক বাজারে জোর দিতে হবে। এতে ভবিষ্যৎ ঝুঁকির প্রভাব কমানো সম্ভব হবে।
আইএইচও/এএসএ/এমএফএ/এএসএম