নতুন বছরে ব্যবসায়ীদের প্রথম প্রত্যাশা নির্বাচিত সরকার

এমদাদুল হক তুহিন
এমদাদুল হক তুহিন এমদাদুল হক তুহিন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৪৫ এএম, ০১ জানুয়ারি ২০২৬

নতুন বছরে নির্বাচিত সরকারই দেশের ব্যবসায়ীদের প্রথম প্রত্যাশা। স্থবির হয়ে পড়া ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোতে নির্বাচনের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবসায়িক প্রতিনিধিত্ব দেখতে চান তারা। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উত্তরণ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সূচকের উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তার প্রত্যাশা করেছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া এআই নীতিমালা প্রণয়নের কথাও বলছেন কেউ কেউ। দেশের বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা নতুন বছরের প্রত্যাশা প্রসঙ্গে এমন অভিমত দিয়েছেন।

দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক। এ খাতের মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০২৬ সালে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। আমরা আশা করছি একটি সুন্দর নির্বাচন হবে। ভালো একটি নির্বাচন হলে ক্রেতাদের আস্থা বাড়বে। পোশাক খাতের সংকটও কাটবে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে সুন্দর নির্বাচনের ওপর। সুন্দর নির্বাচন হলে পোশাক খাত আরও ভালো করবে। আমাদের প্রত্যাশা ২০২৫ সালের চেয়ে ২০২৬ সাল অনেক ভালো যাবে।’

বিজিএমইএ সভাপতির মতো প্রায় অভিন্ন সুরে কথা বলেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদও। জাগো নিউজকে তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘২৬ সালে প্রথম প্রত্যাশা অবশ্যই একটি নির্বাচিত সরকার। বর্তমানে ব্যবসার প্রধান তিন প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ব্যাংকখাতের অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকট। এ বিষয়গুলোর উত্তরণ ঘটানো আমাদের দ্বিতীয় প্রত্যাশা। এর বাইরে নির্বাচিত সরকারের কাছে প্রত্যাশা হচ্ছে- ব্যবসায়ীদের সমস্যা যাতে তারা প্রাধান্য দেয়। আমরা এরইমধ্যে আমাদের শ্বেতপত্র প্রণয়ন করেছি। নতুন সরকারের কাছে তা তুলে ধরবো। এর বাইরে লজিস্টিক, এনবিআরের দুর্নীতি, ট্যাক্স ও ভ্যাটের সমস্যা ও অবকাঠামো- এগুলো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। এগুলো নিয়ে নতুন সরকারকে কাজ করতে হবে।’

আরও পড়ুন
পোশাক ও বস্ত্র খাতে অন্তর্বর্তী সরকার পুরো ব্যর্থ: বিটিএমএ সভাপতি
তারেক রহমানের দেশে ফেরা বিনিয়োগকারীদের একটা কনফিডেন্স বুস্টার
রোজার আগেই চিনির বাজারে সক্রিয় সিন্ডিকেট, বাড়ছে দাম
অবলুপ্তির ৪৭ বছর পর মহালক্ষ্মী ব্যাংকের সম্পদ নিলামে

নতুন বছরে সুষ্ঠু নির্বাচন বড় প্রত্যাশা হিসেবে দেখছেন দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সাবেক পরিচালক ও বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘নতুন বছরে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা সুষ্ঠু নির্বাচন। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সরকার। সেজন্য আমরা অপেক্ষা করছি। এখনকার অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা বিরাজ করছে। সবাই স্থিতিশীলতার জন্য অপেক্ষা করছেন। স্থিতিশীলতা ফিরে পেলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরে আসবে। নির্বাচিত সরকার এলে আগামী বছরের মাঝামাঝি অর্থাৎ নতুন অর্থবছরের শুরু থেকে অর্থনীতি চাঙ্গা হতে শুরু করবে। এত বছর ধরে ব্যবসায় যে দুর্নীতি ছিল, ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সূচকে বাংলাদেশ যে পিছিয়ে ছিল, সেখান থেকে উত্তরণ ঘটবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার জন্য উৎসাহিত হবে, সেটিই আমরা প্রত্যাশা করছি।’

তবে নতুন বছরে খুব বেশি কিছু প্রত্যাশা করছেন না ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহ। তার ভাষায়, ‘আমরা খুব বেশি ভালো কিছু আশা করতে পারছি না। তারপরেও আমাদের আশা নতুন বছরে যদি ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হয়, নতুন সরকার আসে, আমাদের সমস্যাগুলো সমাধান করে, তাহলে চামড়া শিল্পের যে সম্ভাবনা তা কাজে লাগানো যাবে। পোশাকের পরে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় এই শিল্পটি হয়তো ঘুরে দাঁড়াবে।’

সাখাওয়াত উল্লাহ আরও বলেন, ‘আমাদের মূল সমস্যা হচ্ছে সিটিইপি সম্পন্ন করা। পাশাপাশি কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো অসম্পন্ন রয়েছে, সেটি সম্পন্ন করার পরে ব্যবসার যে অবস্থা তা থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব হবে। আমরা ২০২৬ সালে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও চামড়া শিল্পের জন্য নীতি সহায়তা চাই।’

আরও পড়ুন
কম দামে সুতা রপ্তানি করে ভারত আগ্রাসন চালাচ্ছে: রাজীব হায়দার
ছয় মাসে তিন বিলিয়ন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক
‘দেশের টেক্সটাইল খাত আইসিইউতে চলে গেছে’
পর্যায়ক্রমে টাকা ফেরত পাবেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারী

প্রত্যাশার বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি আমিনুল হাকিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০২৬ সালে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। কারণ ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হবে। রাজনৈতিক সরকার না থাকার কারণে একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীসহ সরকারের অনেক সিদ্ধান্তই পেন্ডিং। সবাই সিদ্ধান্তহীন ছিল। টেলিকম খাতের অনেক আইনেও সংস্কার হয়েছে। আমরা মনে করি, ১২ ফেব্রুয়ারির পর সব কিছু সেটেল ডাউন হয়ে যাবে। তখন একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ থাকবে। টেলিকম সেক্টরের সঙ্গে আমরা যারা জড়িত তারাও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারবো ও নতুন বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে পারবো।’

এ প্রসঙ্গে দেশের আইসিটি খাতের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘২০২৬ সালে নতুন সরকার যেহেতু আসবে, নতুন সরকারের কাছ থেকে আমরা আগের মতো ফাঁপা বুলি শুনতে চাই না। আগের সরকারের মতো ফাঁপা বুলি, স্বপ্ন দেখানো, বেলুন ফুলানো- এগুলো না করে প্রকৃতপক্ষে দেশের আইসিটি খাতের যে অবস্থা, অনেক কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আমরা চাই এটি আগে বিশ্লেষণ করা হোক। সরকারের যা করার থাকবে তা করবে।’

নতুন বছরে ইন্টারনেট ও মোবাইল হ্যান্ডসেটের দাম কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম মাশরুর আরও বলেন, ‘বড় কথা হচ্ছে, ২০২৬ সালে ইন্টারনেটের দাম কমাতে হবে। কারণ এখনো আমাদের দেশের ইন্টারনেটের দাম বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে বেশি। স্মার্টফোনের দামও কমাতে হবে। অতিরিক্ত করের জন্যই এ দুটি পণ্যের দাম বেশি। সরকারকে এই কর কমাতে হবে।’

আইসিটি খাতের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনের দাবি জানিয়ে বেসিসের সাবেক এই সভাপতি বলেন, ‘বিভিন্ন ট্রেড বডি সরকার গত এক দেড় বছর ধরে আমলাদের দিয়ে যাচ্ছে, এই সংগঠনগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব আমলামুক্ত করতে হবে। নির্বাচনের পরই সংগঠনগুলোতে দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে। কারণ আমলারা ক্ষমতা উপভোগ করছে, তারা নিজেদের স্বার্থে নির্বাচন দিচ্ছে না। আর কিছু সংখ্যক ব্যবসায়ীও নির্বাচন হওয়ার পথে অন্তরায়। সংগঠনগুলোতে ব্যবসায়ী নেতৃত্ব না থাকায় গত এক দেড় বছরে আইসিটি খাতের উন্নয়ন পলিসিতে যেসব সহায়তা দরকার ছিল তার কোনো কাজই হয়নি।’

আরও পড়ুন
৫০ টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গেছে: বিটিএমএ সভাপতি
আয়কর রিটার্ন দাখিলে সময় বাড়লো আরও এক মাস
রিহ্যাব ফেয়ারে ৩০১ কোটির ফ্ল্যাট, প্লট ও বাণিজ্যিক স্পেস বিক্রি
এসএমই খাতে ঋণ কমছে, সর্বোচ্চ সীমা বাড়ালো কেন্দ্রীয় ব্যাংক

সংগঠনগুলোতে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি না থাকায় স্থবিরতা বিরাজ করছে বলে মনে করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতিও। এ বিষয়ে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘এখন অর্ধেকেরও বেশি ব্যবসায়ী সংগঠন ও চেম্বার বন্ধ অবস্থায়। যেগুলো সীমিত পরিসরে চলছে, সেই সংগঠনগুলোর নেতারও- একটি অদৃশ্য শক্তির ভয়ে ভীত হয়ে কথা বলার সাহস পাচ্ছেন না। এফবিসিসিআই’র বিরাজনীতিকরণ করতে গিয়ে প্রত্যেকটি চেম্বারের নির্বাচন তারা বন্ধ করে দিয়েছেন। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে কিছু সংস্কার ও পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকার নিজের পায়েই কুড়াল মেরেছে। এ কারণে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে না।’

নতুন বছর ও নতুন সরকারের কাছে দেশের আইসিটি খাতের জন্য একটি এআই নীতিমালা চান বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর। তিনি বলেন, ‘অর্থনীতি চাঙ্গা হলে মানুষ আইসিটিতে বিনিয়োগ করা শুরু করবে। কারণ আইসিটি খাতে মনোযোগ দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। এখন নতুন নতুন যে প্রযুক্তি আসছে বিশেষ করে এআই প্রযুক্তি সেখানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নতুন বছরে নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে একটি এআই নীতিমালা প্রণয়ন করা। এছাড়া নতুন যে টেলিকম নীতিমালা হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা।’

ইএইচটি/এমএমএআর/এমএফএ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।