এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্বাচনের পর কী হবে

ইব্রাহীম হুসাইন অভি
ইব্রাহীম হুসাইন অভি ইব্রাহীম হুসাইন অভি
প্রকাশিত: ০১:০৪ পিএম, ০১ জানুয়ারি ২০২৬

একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর হলে ২০২৬ সালে দেশের ব্যবসায়ী সমাজের আস্থা এবং সামগ্রিক ব্যবসা পরিবেশের উন্নতি হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন

জাগো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ২০২৬ সালে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন থাকতে পারে তার একটি রূপরেখা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিশেষ প্রতিবেদক ইব্রাহীম হুসাইন অভি

২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

বর্তমান প্রবণতা বিবেচনায় একটি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। আমার মনে হয়, রাজনৈতিক দিক থেকে ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক বছর হতে পারে। অর্থনীতি ও রাজনীতি আলাদা হলেও বাস্তবে তারা গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। যদি নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি তুলনামূলকভাবে মসৃণ রাজনৈতিক উত্তরণ ঘটে, তাহলে বর্তমানে যে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে, তা অনেকটাই কেটে যাবে।

এখন বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষায় আছেন, কেউই নতুন করে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে গেলে আস্থা কিছুটা ফিরবে। তবে এর পরেও সবকিছু নির্ভর করবে, নতুন সরকার কীভাবে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা করে তার ওপর।

যদি রাজনৈতিক উত্তরণ মসৃণ হয়, তাহলে অর্থনীতিতে কোন ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে?

এমন পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও মজুরিতে কিছুটা উন্নতি দেখা যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এসব খাতে এক ধরনের স্থবিরতা ছিল। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দিকে যেতে পারে এবং চাকরির বাজারেও ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে সবই নির্ভর করবে নীতিনির্ধারণের ধারাবাহিকতা ও সংস্কারের ওপর।

যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক অর্থনীতি যদি বড় ধরনের কোনো সংকটে না পড়ে, তাহলে শুধু ট্যারিফের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় কোনো বিপর্যয়ের মুখে পড়বে— এমন আশঙ্কা আমি দেখছি না। তার চেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে আমাদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলো

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ট্যারিফ বা শুল্ক বৃদ্ধি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকিতে?

এই ঝুঁকি অবশ্যই থাকবে। এরই মধ্যে এর প্রাথমিক প্রভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি কিছুটা কমেছে এবং ইউরোপীয় বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় মুনাফার মার্জিন চাপে পড়ছে। তবে যেসব দেশ উচ্চ শুল্কের কারণে বাজার হারাবে, সেসব অর্ডার বিকল্প দেশে সরে আসার প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি, এর জন্য সময় লাগে।

আরও পড়ুন
প্রতিবন্ধকতায় ঢাকা পড়ছে খাদ্যপণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা
পাচারের অর্থ উদ্ধারে তৎপরতা থাকলেও দ্রুত ফেরার আশা ক্ষীণ
নির্বাচনি বছরে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি ব্যাংকখাত

এ কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, যা সাধারণত ৪–৫ শতাংশ হতে পারতো, তা সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক অর্থনীতি যদি বড় ধরনের কোনো সংকটে না পড়ে, তাহলে শুধু ট্যারিফের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় কোনো বিপর্যয়ের মুখে পড়বে— এমন আশঙ্কা আমি দেখছি না। তার চেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে আমাদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলো।

অভ্যন্তরীণ কোন কোন সমস্যাকে আপনি সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন?

আমার মতে, তিনটি প্রধান অভ্যন্তরীণ সমস্যা বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। প্রথমটি হলো জ্বালানি সংকট, যা দেশের শিল্প ও দৈনন্দিন জীবনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। দ্বিতীয়টি হলো ব্যাংকখাতের দুরবস্থা, যা অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলেছে। আর তৃতীয়টি হলো রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, যা নীতি নির্ধারণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।

জ্বালানি সরবরাহ, ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনে, তাহলে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমাদের আগে নিজের ‘ঘর’ ঠিক করতে হবে, তবেই বাইরের চাপে টিকতে পারবো

এই তিনটি ক্ষেত্রেই যদি নতুন সরকার কার্যকর সমাধানের পথে এগোতে পারে, জ্বালানি সরবরাহ, ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনে, তাহলে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমাদের আগে নিজের ‘ঘর’ ঠিক করতে হবে, তবেই বাইরের চাপে টিকতে পারবো।

কেউ কেউ বলছেন এটি জলবায়ু পরিবর্তনের মতো— যেখানে ‘অ্যাডাপটেশন’ বা মানিয়ে নেওয়াই মূল কৌশল। আপনি কি একমত?

হ্যাঁ, বিষয়টি অনেকটা সেরকমই। বৈশ্বিক ট্যারিফ বা অর্থনৈতিক অস্থিরতা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই, বরং এগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই বাস্তবসম্মত কৌশল। তবে আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো এতই বড় যে, সেগুলো ঠিক করতে পারলে বাইরের সংকট তুলনামূলকভাবে সহনীয় হয়ে যাবে।

বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি যেখানে মাত্র ৩ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে, সেখানে বাংলাদেশ কি ২০২৬ অর্থবছরে ৪–৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে?

এটি সম্ভব। রেমিট্যান্সের প্রবাহ ইতোমধ্যেই আশাব্যঞ্জক। যেমন নভেম্বর মাসেই প্রায় ২০০ কোটি ডলার এসেছে, তাও কোনো বড় উৎসব ছাড়াই। রপ্তানি খাতে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও মোটের ওপর প্রবৃদ্ধির ধারায় রয়েছে। বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগও এ বছর হয়নি। কৃষিখাতেও আড়াই থেকে সাড়ে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সম্ভব।

একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য ৩–৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অস্বাভাবিক কিছু নয়, যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে। তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। প্রশ্ন কেবল নির্বাচন হবে কি না, সেটি নয়— বরং নির্বাচনের পর কী হবে। তখন যদি অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, তাহলে আবার সবকিছু থমকে যেতে পারে।

একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য ৩–৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অস্বাভাবিক কিছু নয়, যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে। তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। প্রশ্ন কেবল নির্বাচন হবে কি না, সেটি নয়— বরং নির্বাচনের পর কী হবে। তখন যদি অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, তাহলে আবার সবকিছু থমকে যেতে পারে।

নতুন সরকারের জন্য আপনার প্রধান পরামর্শ কী?

প্রথমত, জ্বালানি সংকটের সমাধান করা, যা শিল্প ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকখাতের সংস্কার আনা, যাতে অর্থনৈতিক লেনদেন নিরাপদ ও কার্যকর হয়। তৃতীয়ত, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে মূল ভূমিকা রাখে। চতুর্থত, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, যাতে বিদেশি ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়ে এবং অর্থনীতিতে গতিশীলতা আসে।

যদি নতুন সরকার এই কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করতে সক্ষম হয়, তাহলে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ থাকলেও বাংলাদেশ ধীরে ধীরে স্থিতিশীল ও সুসংগঠিতভাবে এগোতে পারবে।

আইএইচও/এএসএ/এমএফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।