তেল চুরির ‘মহাপরিকল্পনায়’ জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেই দুই মাসেও
প্রতিবেদন জমার দুই মাসেও ব্যবস্থা নেয়নি বিপিসি/জাগো নিউজ গ্রাফিক্স
যমুনা অয়েল কোম্পানির নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপোতে সোয়া লাখ লিটার ডিজেল উধাও হয়ে যায়। বিপিসির তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রায় দুই মাস আগে প্রতিবেদন জমা দিলেও বিপিসি কিংবা যমুনা অয়েল কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেয়নি। প্রতিবেদনে ক্যালিব্রেশন কোম্পানির মিথ্যা ক্যালিব্রেশন রিপোর্ট দিয়ে তেল চুরির আগাম চেষ্টা, যমুনা অয়েলের সিবিএ নেতার দৌরাত্ম্য, সিডিপিএল প্রকল্পে অটোমেশন প্রক্রিয়ায় জটিলতা, কর্মকর্তাদের গাফিলতি চিত্র এসেছে। এ নিয়ে জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক ইকবাল হোসেনের তিন পর্বের ধারাবাহিকের তৃতীয় পর্ব।
সম্প্রতি যমুনা অয়েল ফতুল্লা ডিপো থেকে সোয়া লাখ লিটার তেল গায়েবের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনা তদন্তে গঠিত বিপিসির কমিটি গত ১১ ডিসেম্বর প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে ২৫টি পর্যবেক্ষণ ও ১৩টি সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে প্রায় দুই মাস সময় পেরিয়ে গেলেও তেল চুরির এ মহাপরিকল্পনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বিপিসির তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ফতুল্লা ডিপোর গেজার (তেল পরিমাপক) ও সিবিএর কার্যকরী সভাপতি জয়নাল আবেদীন টুটুলের ডিপো নিয়ন্ত্রণের তথ্য। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করে, টুটুলকে কেন্দ্র করে ফতুল্লা ডিপোতে একটি চক্র গড়ে উঠেছে, যাদের মাধ্যমে ফতুল্লা ডিপোর বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
আগের দুই পর্ব
অটোমেশন সিস্টেম ‘অকেজো’, ট্যাংকে তেল রেখে চুরির ‘পরিকল্পনা’
ক্যান্টিন বয় থেকে ফতুল্লা ডিপোর নিয়ন্ত্রক ‘ব্রাজিল বাড়ির টুটুল’
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মোহাম্মদ ইকবালকে ইলেকট্রিশিয়ান পদ থেকে গেজার হিসেবে পদায়নে টুটুল সুপারিশ করেন। ডিপোর স্থায়ী, অস্থায়ী ও দৈনিক ভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগ, পদায়ন ও বদলিতে টুটুল সরাসরি সম্পৃক্ত কিংবা প্রভাব বিস্তার করেন।
যমুনা অয়েলের ফতুল্লা ডিপোর ট্যাংকে তেল কম হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে অনেকগুলো বিষয় উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় প্রতিবেদনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো দেখছে।-বিপিসির পরিচালক (অপারেশন্স ও পরিকল্পনা) ড. এ কে এম আজাদুর রহমান
কমিটিকে দেওয়া বক্তব্যে ক্যালিব্রেটর প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কর্ণধার আবুল মনজুর ‘ক্যালিব্রেশন ত্রুটির পেছনে কারও স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে’ বলে উল্লেখ করেন।
ফতুল্লা ডিপোর ট্যাংক-২২ এর রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আরিয়ান ট্রেডিংয়ের নিয়োজিত ক্যালিব্রেটর মেসার্স এস এম নুরুল হকের ম্যানেজার আবদুস সাত্তার তদন্ত কমিটিকে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, খসড়া ক্যালিব্রেশন চার্ট পাঠানোর পর ফতুল্লা ডিপো সুপার এবং বিএসটিআই কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুযায়ী ক্যালিব্রেশন চার্ট সংশোধন করেছেন।
তদন্ত কমিটির ১৩ সুপারিশ
সরবরাহ করা সব পার্সেলের মোট পরিমাণ বিবেচনায় যমুনা অয়েলের লোকসান শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ অন্য দুই কোম্পানি পদ্মা অয়েলের শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং মেঘনা পেট্রোলিয়ামের শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশের তুলনায় বেশি। তিনটি কোম্পানির সরবরাহ করা মোট পরিমাণ বিবেচনায় পাইপলাইনের সামগ্রিক লোকসান শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ কমিটির কাছে অত্যধিক বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ফলে, পরবর্তী পার্সেলগুলোতে প্রোডাক্ট লোকসানের বিষয়ে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পাইপলাইনের নিয়মিত অপারেশন চালু রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করাও জরুরি।
আরও পড়ুন
জাহাজ থেকে ট্যাংকে যেতেই উধাও ১৪ কোটি টাকার জ্বালানি তেল
পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি বেসরকারিতে দেওয়ার তোড়জোড়
ইআরএল-২ প্রকল্পের ব্যয় কমলো ১২ হাজার কোটি টাকা
একীভূত হচ্ছে মেঘনা-যমুনা, ইআরএলে যাচ্ছে ইএলবিএল-এসএওসিএল
উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ত্রুটিপূর্ণ ক্যালিব্রেশন চার্ট প্রণয়নে জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় মেসার্স এস এম নুরুল হকের কাছ থেকে ক্যালিব্রেশন সেবা গ্রহণ না করার জন্য বিপিসির আওতাধীন কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনার পাশাপাশি বিএসটিআইকে বিষয়টি অবহিত করতে হবে। একই সঙ্গে, ট্যাংক নম্বর-২২ রক্ষণাবেক্ষণে কার্যাদেশ প্রাপ্ত ঠিকাদার মেসার্স আরিয়ান ট্রেডার্সকে কারণ দর্শানো এবং প্রয়োজনে তাদের রিটেনশন মানি বাজেয়াপ্ত করার জন্য যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নির্দেশনা দিতে হবে।
কোম্পানিভিত্তিক লোকসান, অন্য পার্সেলে পাওয়া গেইনের সঙ্গে সমন্বয় করা; প্রথম দুই পার্সেলে লোকসান হওয়া ২ লাখ ৬২ হাজার ৪০৮ লিটার ডিজেল চাপ, তাপমাত্রা ও ঘনত্ব পরিবর্তনজনিত কারণে লাইনপ্যাক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে; মেসার্স এস এম নুরুল হকের প্রতিনিধির সাক্ষ্য-প্রমাণ অনুযায়ী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ট্যাংক-২২ ও ২৩ এর ত্রুটিপূর্ণ ক্যালিব্রেশন চার্ট প্রণয়নের নির্দেশনা ও সঠিক ক্যালিব্রেশন অনুযায়ী ট্যাংক বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ থাকায় ফতুল্লা ডিপো সুপার আসলাম খান আবুল উলায়ীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
এছাড়া আরও সুপারিশ করা হয়:
>>ট্যাংক ক্যালিব্রেশনের কার্যাদেশ দেওয়ার পর যথাযথভাবে তত্ত্বাবধান না করায় যমুনা অয়েলের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) মো. আলমগীর আলমকে সতর্ক করা।
>>ক্যালিব্রেশন চলাকালে বিএসটিআই প্রতিনিধির উপস্থিতি নিশ্চিত করা, ভবিষ্যতে বিপিসির আওতাধীন স্থাপনাগুলোতে ট্যাংক রিক্যালিব্রেশনের ক্ষেত্রে আগের চার্ট থেকে কী কী পরিবর্তন হয়েছে তার তালিকা ও ফ্র্যাকশন টেবিল অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা।
>>পিটিসিপিএলসির কাছে প্রকল্প হস্তান্তরের আগে আবশ্যিকভাবে ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সব যন্ত্রপাতির তালিকা অনুযায়ী কার্যকারিতা ও ক্যালিব্রেশন যাচাই করা।
>>আলাদা কমিটি গঠনের মাধ্যমে সিডিপিএল পাইপলাইনের ট্রান্সপোর্ট লোকসান নির্ধারণ করা।
>>পাইপলাইন কমিশনিংয়ের আগে এ সংক্রান্ত কার্যপদ্ধতি চূড়ান্ত করে কমিশনিং কার্যক্রম শুরু করার বিষয়ে সিডিপিএলকে নির্দেশনা দেওয়া।
>>সিডিপিএল প্রকল্পের মতো এ ধরনের নতুন প্রকল্প পরিচালনার জন্য কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনবল গড়ে তোলা।
>>ফতুল্লা ডিপোর ট্যাংকলরি লোডিং পয়েন্টে বিদ্যমান মিটারগুলোর ক্যালিব্রেশন নিয়মিতভাবে যাচাই ও অকার্যকর মিটারগুলো প্রতিস্থাপনের জন্য যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নির্দেশনা দেওয়া।
>>নিয়মবহির্ভূতভাবে ফতুল্লা ডিপোর বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার ও বদলি, পদায়নে সম্পৃক্ততার প্রমাণ থাকার পরিপ্রেক্ষিতে ডিপোর স্থায়ী গেজার জয়নাল আবেদীন টুটুলসহ স্থায়ী-অস্থায়ী অন্য গেজার ও মিটারম্যানদের আগামী তিন মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে বদলি করে প্রতিস্থাপনের জন্য নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে।
যা বলছে যমুনা অয়েল ও বিপিসি
তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে যমুনা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা এজিএম নিয়ে একটু ব্যস্ত আছি। পরে প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
বিপিসির পরিচালক (অপারেশন্স ও পরিকল্পনা) ড. এ কে এম আজাদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘যমুনা অয়েলের ফতুল্লা ডিপোর ট্যাংকে তেল কম হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে অনেকগুলো বিষয় উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় প্রতিবেদনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো দেখছে।’
এমডিআইএইচ/এএসএ