স্পট মার্কেট থেকে ১৮ লাখ টন ডিজেল কিনছে বিপিসি
যা ডিজেল মজুত আছে তাতে আরও ৭-৮ দিন চলবে/জাগো নিউজ গ্রাফিক্স
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধে প্রকট হচ্ছে জ্বালানি সংকট। এ সংকট মোকাবিলায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। জ্বালানি সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখার জন্য অনেকটা নাকানিচুবানি খেতে হচ্ছে সরকারি সংস্থাটিকে।
একদিকে স্টোরেজ সংকট, অন্যদিকে ক্রুড আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় পরিশোধিত জ্বালানি কিনতে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। তেলের পাম্পগুলোও বিরামহীনভাবে তেল দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। পাম্প মালিকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে এভাবে চলতে থাকলে পাম্প বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। যদিও এমন পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বহু দেশে। তবে সরকার সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছে সংকট মোকাবিলায়। এখন যা মজুত আছে তা দিয়ে আরও এক সপ্তাহের বেশি চলবে।
দেশে চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে অবশেষে স্পট মার্কেট থেকে ডিজেল কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। আমেরিকান নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ নিয়ে প্রাথমিক আলোচনাও হয়েছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ ক্রয় প্রক্রিয়া করা হবে বলে জানিয়েছেন বিপিসি সংশ্লিষ্টরা।
ইতোমধ্যে স্পট মার্কেট থেকে তিন দিনের ব্যবধানে ১৮ লাখ টন ডিজেল কেনার পদক্ষেপ নিয়েছে বিপিসি। এজন্য গুনতে হচ্ছে যুদ্ধ পরিস্থিতির আগের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি অর্থ। সংকট কাটাতে অপেক্ষাকৃত বেশি সালফারযুক্ত কম মানের ডিজেলও সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি স্পর্শকাতর উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি। ফোন রিসিভ করেননি বিপিসির চেয়ারম্যানও।

বিপিসির পরিচালক (অর্থ) ও সরকারের যুগ্ম সচিব নাজনীন পারভীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা স্পট মার্কেটের অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে কেনার কথা বলছি। এ বিষয়ে আমি সরাসরি দেখভাল করি না। এটি দেখেন পরিচালক অপারেশন। তবে সঠিক পরিসংখ্যান আমার জানা নেই।’
আরও পড়ুন
বর্তমান জ্বালানি সংকট সত্তরের দশকের জোড়া আঘাতের চেয়েও গুরুতর
জাহাজের জ্বালানি তেলের ‘ভাসমান ডিপো’ কর্ণফুলী নদী
যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে সারাদেশের পেট্রোল পাম্প
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা ঈদের আগে থেকে রাত চারটা পর্যন্তও কাজ করেছি। রাতদিন কাজ করছি। সংকটকালীন সবাই দেশের জন্য কাজ করছে। আমরাও করছি। কীভাবে তেল আসবে সেটি বড় বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে, সংকট মোকাবিলা করা, দেশকে রক্ষা করা।’
জাগো নিউজের হাতে আসা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঈদের আগের রাতে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বসে বিপিসির ১০২১তম পর্ষদ সভা। সভায় স্পট মার্কেট থেকে ৮ লাখ টন ডিজেল কেনার সিদ্ধান্ত হয়। শুক্রবার রাত ১১টায় বসে ওই সভা।
নথিতে দেখা যায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়েছে। এতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির পাশাপাশি সরবরাহ কমেছে, মূল্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, বেড়েছে জাহাজ ভাড়া ও বিমা খরচ।
বিপিসির তালিকাভুক্ত সরবরাহকারীদের অনেকে এপ্রিল মাসের কিছু পার্সেল সরবরাহে অপারগতা প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক আদালতে আরবিট্রেশন মামলার সুযোগ নিতে অনেকে চুক্তি থাকলেও ‘ফোর্স মেজার’ ঘোষণা করেছে। এতে সরবরাহ চেইন ঠিক রাখতে স্পট মার্কেট থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ডিজেল কিনতে অনেকটা বাধ্য হচ্ছে বিপিসি।
নথি বলছে, তিন প্রতিষ্ঠান থেকে ৮ লাখ টন ডিজেল কেনা হবে। তিন প্রতিষ্ঠান থেকেই প্ল্যাট রেটে (জাহাজীকরণের দুদিন আগে ও দুদিন পরেরসহ পাঁচদিনের গড় আন্তর্জাতিক মূল্য) ডিজেল কেনার বিষয়ে একমত হয় বিপিসি। মন্ত্রণালয়ও বিষয়টিতে সম্মত বলে জানা যায়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসি থেকে ১ লাখ টন ডিজেল কেনা হবে। সবশেষ ১৯ মার্চ প্ল্যাট রেটে ব্যারেল প্রতি ২২১ ডলার ৮৯ সেন্টে ক্রয় প্রস্তাব করা হয়। এতে ওই ১ লাখ টন ডিজেল কিনতে ২ হাজার ৩৩ কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে।
আরেক প্রতিষ্ঠান এপি এনার্জি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড থেকে ৫ লাখ টন ডিজেল কেনার সিদ্ধান্ত নেয় বিপিসি। ১০ পিপিএম থেকে ৫৯০ পিপিএম মাত্রার ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটি লোডিং থেকে আরব গাল্ফের প্ল্যাট রেট অনুসারে দর প্রস্তাব করে। এতে ১৯ মার্চ তারিখে আরব গাল্ফের প্ল্যাট রেট অনুসারে ২২১ ডলার ৭৭ সেন্ট দর নির্ধারণ করা হয়। এতে বাংলাদেশ টাকায় ১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে।
হংকংয়ের প্রতিষ্ঠান সুপারস্টার ইন্টারন্যাশনাল (গ্রুপ) লিমিটেড থেকে দুই লাখ টন ডিজেল কেনার সিদ্ধান্ত হয়। এজন্য ব্যারেলপ্রতি ২১৩ ডলার ৪১ সেন্ট হিসেবে ৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানতে পেরেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
রোববার (২২ মার্চ) বিকেল ৩টায় বসে ১০২২তম বোর্ড মিটিং। এতে দুবাইভিত্তিক ‘ডিবিএস ট্রেডিং হাউজ ফেজকো’ নামে এক প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ লাখ টন ডিজেল কেনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয় বিপিসি।
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল এ জলপথকে বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয়। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক চতুর্থাংশ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বড় অংশ হরমুজ প্রণালি হয়েই পরিবাহিত হয়। প্রধান রপ্তানিকারক সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ইরাক ও ইরানের মতো তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো এই জলপথ ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ করে। দৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেলের মতো অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
যুদ্ধের শুরুতে এ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে ইরান। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বি হতে থাকে। এ জলপথ বন্ধ হওয়ার আশংকায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও এলপিজি নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়।

যদিও বিপিসি বলছে, বাংলাদেশে আমদানি করা পরিশোধিত জ্বালানির বেশিরভাগ আসে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও চায়নার প্রতিষ্ঠান থেকে। এসব থেকে বাংলাদেশে আসতে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হয় না। তবে জিটুজি পদ্ধতিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা ক্রুড অয়েলের পুরোটাই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে আসে।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশে আনার জন্য এক লাখ টন ক্রুড অয়েল লোড করতে গিয়ে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে আটকে আছে নর্ডিক পোলাক নামে ট্যাংকার ভ্যাসেল। পাশাপাশি আগামী ৩১ মার্চ আমিরাতের জেবেলদানা অথবা ফুজাইরা বন্দরে এক লাখ টন অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড লোডের জন্য যাওয়ার কথা রয়েছে ‘ওমেরা গ্যালাক্সি’ নামে আরেকটি ট্যাংকার ভ্যাসেলের। তবে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে জাহাজ মালিকরা জাহাজ পাঠাতে রাজি হচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির এক কর্মকর্তা।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। দেশেরও জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে এমন আশংকায় যানবাহন চালক থেকে শুরু করে ডিলার ডিস্ট্রিবিউটররা জ্বালানির মজুত করছেন। এতে হঠাৎ করে বিপিসিতে ডিজেল, অকটেন বিক্রি অতিরিক্ত হারে বেড়ে গেছে। ফলে দ্রুত কমছে মজুত। এতে দেশে সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখতে স্পট মার্কেট থেকে ডিজেল কেনার পদক্ষেপ নেয় বিপিসি।
এর আগে আমেরিকান প্রতিষ্ঠান ‘এ অ্যান্ড এ এনার্জি অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এলএলসি’ এবং দুবাইভিত্তিক ‘পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন’ নামে দুই প্রতিষ্ঠান থেকে তিন লাখ টন ডিজেল কেনার বিষয়ে অনুমোদন দেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও শর্ত মোতাবেক প্রতিষ্ঠান দুটি পারফরম্যান্স গ্যারান্টি (পিজি) জমা না দেওয়ায় এখনো এলসি খুলতে পারছে না বিপিসি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিপিসির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা সামগ্রিক বিষয়গুলো জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেছেন। তাদের মধ্যে একজন বলেন, ‘বিপিসি ২০ মার্চের বোর্ড সভায় স্পট মার্কেট থেকে ৮ লাখ টন এবং ২২ মার্চের বোর্ড সভায় ১০ লাখ টন ডিজেল কেনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
তাদের একজন বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে প্রতি ব্যারেল ডিজেল ২১৫ থেকে ২২১ ডলার। স্পট মার্কেট থেকে অনেকে ফিক্সড (আগাম নির্ধারিত) দরে ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব করেছে। কিন্তু এখন আমেরিকা এবং ইরান শুধু আলোচনার টেবিলে বসলেই দাম একেবারে কমে যাবে। যুদ্ধ থেমে গেলে আগের দরে চলে আসতে পারে। যুদ্ধ শুরুর আগেও ১০০ ডলারের নিচে ছিল ডিজেলের দাম। এখন দ্বিগুণের চেয়ে বেড়েছে।
বিপিসি প্ল্যাট রেট যেটি হিসাব করছে, সেটি যখন তেল সরবরাহ করবে এবং লোড হবে তখনকার রেটে দাম পরিশোধ করতে হবে। এখন প্রাথমিক প্রস্তাব করতে এখনকার দর প্রস্তাব করা হয়েছে। ভবিষ্যতে প্ল্যাটস রেট কমলে ব্যয় কমবে, প্ল্যাটস রেট বাড়লে ব্যয় বাড়বে।’
বেশি সালফারের ডিজেল কেনার বিষয়ে আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হয়েছে। যাদের মজুত আছে আন্তর্জাতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে মজুত তেল বাজারে ছাড়বে। সংকট মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও অপেক্ষাকৃত বেশি সালফারের ডিজেল বাজারজাতকরণে সম্মত হয়েছেন।’
এ বিষয়ে জানতে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের দাপ্তরিক মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে ক্ষুদেবার্তা দিলেও সাড়া মেলেনি।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ মার্চ তারিখে বিপিসিতে ডিজেলের মজুত ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬২২ টন। এতে ১২ দিনের ডিজেল রয়েছে বলে বিপিসি দাবি করে। তবে ২০ মার্চের পর কোনো পার্সেল না আসায় ২০ মার্চের প্রারম্ভিক মজুত থেকে ডেট স্টক (১০ শতাংশ) এবং ২০ মার্চ ও ২৩ মার্চ সরবরাহকৃত ডিজেল বাদ দিলে মজুত বর্তমানে ৭-৮ দিনের মধ্যে চলে এসেছে।
এমডিআইএইচ/এএসএ