জাহাজের জ্বালানি তেলের ‘ভাসমান ডিপো’ কর্ণফুলী নদী
ইরান যুদ্ধের কারণে অস্থির সারা বিশ্বের তেলের বাজার। বাংলাদেশও এ সংকটের বাইরে নয়। পেট্রোলিয়াম জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে অনেকটা নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে বিদেশি জাহাজের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত লো সালফার ফার্নেস অয়েল (এলএসএফও) সরবরাহেও সংকটের অভিযোগ উঠেছে।
তবে জাগো নিউজের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সংকটের অজুহাত সামনে রেখে কর্ণফুলী নদীতে অনেকে অবৈধভাবে ট্যাংকার জাহাজে মেরিন ফুয়েল মজুত শুরু করেছেন। যার প্রমাণও মিলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে সত্য। কিন্তু দেশে এই মুহূর্তে মেরিন ফুয়েলের সংকট নেই।

জাহাজ চলাচলের জন্য ব্যবহৃত জ্বালানি নেওয়াকে বলা হয় ‘বাংকারিং’। আর জাহাজের জ্বালানিকে বলা হয় ‘মেরিন ফুয়েল’। সমুদ্রগামী জাহাজে বাংকারিংয়ে মেরিন ফুয়েল হিসেবে ‘এলএসএফও’ ব্যবহার বাধ্যতামূলক। সংশ্লিষ্ট একাধিকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সমুদ্রগামী জাহাজগুলো ব্যয় সংকোচনের জন্য নিজেদের সুবিধাজনক স্থান থেকে বাংকারিং নেয়। আর বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে আসা ফার্নেস অয়েলকে এলএসএফও উল্লেখ করে বিদেশি জাহাজে বাংকার সরবরাহ দেন অনেকে। যার পুরো প্রক্রিয়াই অবৈধ।
আমরা সব সময় সতর্ক। শুধু মেরিন ফুয়েল নয়, কোনো ধরনের পণ্য অবৈধভাবে মজুতের সুযোগ নেই। আমরা ইতোমধ্যে কোস্টগার্ডকে বিষয়টি জানিয়ে রেখেছি। অবৈধভাবে কোনো জ্বালানি তেল স্টকের ঘটনা ঘটলে কোস্টগার্ড অভিযান চালাবে। আমরা বিষয়টি নিবিড়ভাবে মনিটরিং করছি।-বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন ও বাণিজ্য) মোরশেদ হোসাইন আজাদ
নিয়ম অনুযায়ী সমুদ্রগামী জাহাজ বাংকারিং নেওয়ার জন্য তাদের স্থানীয় শিপিং এজেন্টকে ইনডেন্ট (ক্রয়াদেশ বা চাহিদাপত্র) দেয়। শিপিং এজেন্ট বিপিসির তালিকাভুক্ত বাংকার সরবরাহকারীদের কাছ থেকে এসব জ্বালানি সংগ্রহ করে। বাংকার সরবরাহকারীরা শিপিং এজেন্ট থেকে সংশ্লিষ্ট জাহাজের ইনডেন্ট সংগ্রহ করে কাস্টমসের প্রক্রিয়া শেষ করে বিপিসির তিন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান থেকে (যে কোম্পানি থেকে তালিকাভুক্ত) চাহিদামতো মেরিন ফুয়েল সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট জাহাজে সরবরাহ করে। এখানে বাংকার ব্যবসায়ীর মেরিন ফুয়েল মজুত করার সুযোগ নেই। কিন্তু জাগো নিউজের অনুসন্ধানে দেখা যায়, কর্ণফুলী নদীতে অবৈধভাবে বাংকারিংয়ের মজুত হচ্ছে অনেক জাহাজে।

সরেজমিনে দেখা যায়, শাহ আমানত সেতু সংলগ্ন কর্ণফুলী নদীর মাঝখানে বন্দরের বয়ায় ৯টি অয়েল ট্যাংকার অবস্থান করছে। এর মধ্যে ‘এমটি বেঙ্গল স্পিরিট-১’ লাইটার ট্যাংকার জাহাজটি পরিপূর্ণ তেলবোঝাই। পাশের আরেকটি লাইটারেও স্বল্প পরিমাণে তেল রয়েছে। কথা হলে এমটি বেঙ্গল স্পিরিট-১-এর সুপারভাইজার পরিচয়দানকারী মো. শাকিল বলেন, ‘আমাদের জাহাজে পাঁচশ টন ফার্নেস অয়েল রয়েছে। আমরা জাহাজে বাংকার সাপ্লাই দিই।’
এ ফার্নেস অয়েল কোথা থেকে নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারি থেকে তেল আনি। পার্টি থেকেও মাল (ফার্নেস) নিই। আবার পদ্মা অয়েল থেকেও ফার্নেস অয়েল নিই। আমাদের প্রতিষ্ঠানের নাম বাংলাদেশি ট্রেডিং। জাহাজের মালিক কামাল সাহেব।’

জাহাজটির কোয়ার্টার মাস্টার মো. নাজমুল জানালেন আরেক তথ্য। তিনি বলেন, ‘আমরা বাংকার করি। পদ্মা জেটি থেকে তেল নিই। আমরা ২৮ রমজান পদ্মা জেটি থেকে তেল নিয়েছি। আমাদের জাহাজে যখন ওভারলোড হয়ে যায়, তখন তা সি-গালে (ওটি সিগাল) জমা রাখি।’
এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৭ মার্চ পদ্মা অয়েলের পতেঙ্গা মেইন ডিপো থেকে ৫৬৭ দশমিক ১৬২ মেট্রিক টন এলএসএফও সরবরাহ নেয় ‘এমটি বেঙ্গল স্পিরিট-১’। শিপিং এজেন্ট হিসেবে দেখানো হয়েছে নিশাত শিপিং সার্ভিস (প্রা.) লিমিটেডের নাম।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ বাংকার সাপ্লায়ারস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল নিয়ে সারাবিশ্বে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দেশেও সংকট রয়েছে। এখন আমাদের কারও কাছে কোনো মেরিন ফুয়েল নেই।’
তিনি বলেন, ‘মেরিন ফুয়েল স্টক (মজুত) করার সুযোগ নেই। কারণ বিদেশি জাহাজ থেকে ইনডেন্ট পেয়ে কাস্টমসের প্রক্রিয়া শেষ করে বিপিসির মার্কেটিং কোম্পানিগুলো থেকে মেরিন ফুয়েল সংগ্রহ করে সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট জাহাজে সরবরাহ দিতে হয়। এখানে স্টক করার সুযোগ নেই।’

অবৈধভাবে জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে ফার্নেস অয়েলের বাংকারিংয়ের সঙ্গে অনেকে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘সমুদ্রে চলাচলকারী বিদেশি জাহাজগুলোকে এখন আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে লো সালফার ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করতে হয়। বিপিসিই এসব এলএসএফও আমদানি করে। সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে পাওয়া তেল বাংকারিংয়ের জন্য বৈধ নয়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট আরেক ব্যবসায়ী জাগো নিউজকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে সিঙ্গাপুরসহ সব জায়গায় মেরিন ফুয়েলের দাম বেড়ে গেছে। বাংলাদেশে এখনো জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়নি। এতে মেরিন ফুয়েলের দামও বাড়ানো হয়নি। এ কারণে এখন অনেকে মেরিন ফুয়েল স্টক করছে।’
আরও পড়ুন
এলএনজি নিয়ে আপাতত ‘চিন্তা নেই’, ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
বিপিসির মোংলা জেটিতে ভেড়ে না জাহাজ, ফাঁকা তেলের ট্যাংক
স্পট মার্কেট থেকে দুই লাখ টন ডিজেল কিনছে বিপিসি
ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে ফার্নেস অয়েলগুলো লো সালফার কি না পরীক্ষার সুযোগ নেই। অথচ বাংকারিংয়ে এখন অনেক অসাধু ব্যবসায়ী সীতাকুণ্ড থেকে ফার্নেস অয়েল সংগ্রহ করে মেরিন ফুয়েলের সঙ্গে মিশিয়ে বিদেশি জাহাজে সরবরাহ দিচ্ছে। কখনো কোনো দুর্ঘটনা হলে তখন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’
এ বিষয়ে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন ও বাণিজ্য) মোরশেদ হোসাইন আজাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা সব সময় সতর্ক। শুধু মেরিন ফুয়েল নয়, কোনো ধরনের পণ্য অবৈধভাবে মজুতের সুযোগ নেই। আমরা ইতোমধ্যে কোস্টগার্ডকে বিষয়টি জানিয়ে রেখেছি। অবৈধভাবে কোনো জ্বালানি তেল স্টকের ঘটনা ঘটলে কোস্টগার্ড অভিযান চালাবে। আমরা বিষয়টি নিবিড়ভাবে মনিটরিং করছি।’
বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় জ্বালানির প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে পেট্রোলিয়াম তরল জ্বালানি, গ্যাসীয় জ্বালানি, কয়লা আমদানি করে বাংলাদেশ। তরল পেট্রোলিয়াম পণ্য হিসেবে ক্রুড, ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল, জেট ফুয়েল ও মেরিন ফুয়েল অন্যতম। দেশে ৭২-৭৫ লাখ টন পেট্রোলিয়াম তরল জ্বালানির চাহিদা রয়েছে। এর ৯৮ শতাংশের মতো আমদানি করতে হয়।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ সালফার ফুয়েল অয়েল বাংকারিং সুবিধা ছিল। আন্তর্জাতিক নৌ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) বিশ্বব্যাপী সমুদ্রগামী জাহাজের সালফার নিঃসরণ কমানোর জন্য ৩ দশমিক ৫ শতাংশ সালফার ফুয়েল অয়েলের পরিবর্তে লো সালফার ফুয়েল অয়েল হিসেবে দশমিক ৫ শতাংশ মেরিন ফুয়েল বাংকারিং করার নির্দেশনা দেয়। এ নিয়ে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সরকার গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে লো-সালফার ফুয়েল অয়েল বাংকারিং নীতিমালা করে বিপিসি। এর প্রায় ছয় বছর পর ২০২০ সালে লো-সালফার ফার্নেস অয়েল (মেরিন ফুয়েল) আমদানি শুরু হয়। ২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো আমদানি হওয়া এলএসএফও সরবরাহ দেয় বিপিসি।
ওই দিন পতেঙ্গায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিপিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমান বলেন, ‘চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ঘিরে বছরে প্রায় ৩৬শ জাহাজ আসে। এসব জাহাজে কমপক্ষে দুইশ মেট্রিক টন বাংকার নিলে বছরে প্রায় ৬-৭ লাখ মেট্রিক টন মেরিন ফুয়েলের প্রয়োজন পড়বে। কিন্তু বিপিসি থেকে বাংকারিং নেওয়ার পরিমাণ একেবারে কমে গেছে। আগে কালোবাজারের মাধ্যমে কিছু কিছু বাংকারিং হয়েছে।’
বিপিসির তথ্য বলছে, মেরিন ফুয়েল আমদানি ও সরবরাহ শুরুর পর থেকে বিপিসি ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ২৯ হাজার ৯৬৪ মেট্রিক টন, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ১৬ হাজার ৪৯৯ মেট্রিক টন, ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ৩০ হাজার ৪৬ মেট্রিক টন, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৯৮৬ মেট্রিক টন এবং সবশেষ ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ১৩ হাজার ৯৪২ মেট্রিক টন মেরিন ফুয়েল আমদানি করে।
এমডিআইএইচ/এএসএ