ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. অর্থনীতি

তেলের মজুত ‘স্বাভাবিক’, পাম্পে ‘নেই’

মো. নাহিদ হাসান | প্রকাশিত: ১১:০৫ এএম, ০২ এপ্রিল ২০২৬

দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে মানুষের আতঙ্ক কাটছে না। সরকার বারবার মজুত স্বাভাবিক বা পর্যাপ্ত মজুত আছে বললেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অধিকাংশ পাম্পে ঝোলানো ‘তেল নেই’ । যে সব পাম্পে তেল আছে সেখানে দীর্ঘ লাইন। এর মধ্যেও চলছে অবৈধ মজুত ও কালোবাজারে তিনগুণ দামে বিক্রি।

সরেজমিনে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অনেক পাম্পে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকারসহ পরিবহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। অনেক চালক অভিযোগ করেছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা মিলছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় তৈরি হচ্ছে বাড়তি ভোগান্তি। উদ্বেগে বাড়ছে মজুতপ্রবণতা। অনেকে চেষ্টা করছেন প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল সংগ্রহের।

পাম্পে দীর্ঘ লাইন

অনেক পাম্পে ঝুলছে এমন ঘোষণা

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই এবং সরবরাহ স্বাভাবিক। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা থাকলেও দেশের মজুত পরিস্থিতি সন্তোষজনক এবং নিয়মিত আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে আমরা ডিপো থেকে যে পরিমাণ তেল পেতাম এবছর মার্চেও আমরা একই পরিমাণ তেল পাচ্ছি। কিন্তু যদি পরবর্তীসময়ে তেল না পাওয়া যায় এই আশঙ্কায় মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত চাহিদা বেড়েছে। ফলে পেট্রোল পাম্পগুলোতে ভিড় দেখা যাচ্ছে। সব ক্ষেত্রে প্রচারণা দরকার যে, সংকট নেই।-বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস ও পেট্রোল পাম্প অনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব মীর আহসানউদ্দিন পারভেজ 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল সংকট সরবরাহের ঘাটতি নয়, বরং বাজারে আতঙ্ক ও অনিয়ন্ত্রিত চাহিদা বৃদ্ধি। ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তারা মনে করেন, সরবরাহ ব্যবস্থা স্বচ্ছ রাখা ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

প্রতি লিটার তেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি!

তেল সংকটের অজুহাতে অবৈধ মজুতদাররা বাড়তি দামে জ্বালানি তেল বিক্রি করছেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ কম থাকার অজুহাতে প্রতি লিটার অকটেন ও পেট্রোল ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকরা নিজেদের প্রয়োজনে তা বাধ্য হয়ে কিনছেন।

কুষ্টিয়ায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ইমন হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘চাকরির প্রয়োজনে আমাকে মোটরসাইকেলে চলাচল করতে হয়। এখানে ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত প্রতি লিটার তেল বিক্রি হচ্ছে, তাও পাওয়া যাচ্ছে না। যাদের কাছে তেলের মজুত আছে তারা স্বীকার করছে না। খুব কাছের মানুষ না হলে তাদের কাছে তেল বিক্রিও করছে না।’

তেল পাচ্ছে না এটাই বড় কথা। আমরা সরকারের দাবি বা বক্তব্য আমরা মেনে নিচ্ছি, কিন্তু মানুষ তো তেল পাচ্ছে না। কালোবাজার সরকার প্রোটেক্ট করতে পারে এবং সরকারের মজুত সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এখানেও বিপিসি, পদ্মা অয়েল, যমুনা অয়েল— এ সব তেল কোম্পানি, পেট্রোল পাম্প সরকারের প্রশাসনের অংশ।-ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা প্রফেসর ড. শামসুল আলম 

ঢাকায় রাইড শেয়ারিং চালক সেলিম বলেন, ‘তেল নিয়ে বিপদে আছি। সরকার বলছে তেলের সংকট নেই, বাস্তবে পাম্পে গেলে তিন ঘণ্টা বসে থাকতে হচ্ছে। সমস্যা কোথায় এটি সরকারকেই খুঁজে বের করতে হবে। আমরা নাগরিক হিসেবে সরকারের কাছেই সমাধান চাই।’

সরকারি হিসাবে বর্তমানে মজুত কত?

গত সোমবার (৩০ মার্চ) জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে ১৭ ফেব্রুয়ারি। সেদিন জ্বালানি তেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেলের মজুত ছিল ২ লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন। ৩০ মার্চ ২০২৬ তারিখে দেশের ডিজেলের মজুত আছে ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৪১ দিনে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন।

পাম্পে প্রতিদিনের চিত্র

পাম্পে প্রতিদিনের চিত্র

তিনি বলেন, আমরা ২০২৫ সালের মার্চ মাসের চাহিদার ভিত্তি ধরে ২০২৬ সালের মার্চ মাসের জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা করেছি। গত বছর মার্চ মাসে ডিজেলের দৈনিক চাহিদা ছিল ১২ হাজার মেট্রিক টন। অকটেন ও পেট্রোলের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৪শ মেট্রিক টন করে। অথচ চলতি বছরে ১ থেকে ২৩ তারিখ পর্যন্ত অকটেন বিক্রি হয়েছে ২৮ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন। প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ২৫৮ মেট্রিক টন। এক্ষেত্রে স্পষ্ট হয় যে বাজারে জ্বালানি প্রবাহ অব্যাহত রয়েছে।

সংসদে মন্ত্রী বলেন, আমাদের মোট ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৩ শতাংশ ডিজেল, যার সরবরাহ স্বাভাবিক অর্থাৎ মোট ব্যবহৃত জ্বালানির ৬ শতাংশ অকটেন এবং ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ পেট্রোলের জন্য ফিলিং স্টেশনের দীর্ঘ লাইন জ্বালানির ব্যবস্থাপনার সঠিক চিত্র প্রতিফলন করে না।

যারা অবৈধ মজুত করছে তাদের আইনের আওতায় এনে আরও কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে, যাতে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। কারণ, এখন আমরা একটা সংকটের মধ্যে আছি। অবৈধ মজুত এই সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটা সিরিয়াস বড় অপরাধ।-জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) জ্বালানি তেলের মোট মজুতের পরিমাণ এক লাখ ৯২ হাজার ৯১৯ টন। এর মধ্যে ডিজেল এক লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ টন, অকটেন ৭ হাজার ৯৪০ টন, পেট্রোল ১১ হাজার ৪৩১ টন এবং জেট ফুয়েল ৪৪ হাজার ৬০৯ টন।

এক মাসে প্রায় ৩ লাখ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গত ৩ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য মোট তিন হাজার ৫৫৯টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ১২শ ৪৪টি মামলা করা হয়েছে। ৮৪ লাখ ৫১ হাজার টাকা অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ১৯ জনকে।

এসময়ে পরিচালিত অভিযানে ২ লাখ ৭ হাজার ৩৬৫ লিটার ডিজেল, ২৮ হাজার ৯৩৮ লিটার অকটেন, ৬০ হাজার ২ লিটার পেট্রোলসহ সর্বমোট ২ লাখ ৯৬ হাজার ৩০৫ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে।

পাম্প

সরকারের অভিযান

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস ও পেট্রোল পাম্প অনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব মীর আহসানউদ্দিন পারভেজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০২৫ সালের মার্চ মাসে আমরা ডিপো থেকে যে পরিমাণ তেল পেতাম এবছর মার্চেও আমরা একই পরিমাণ তেল পাচ্ছি। কিন্তু যদি পরবর্তীসময়ে তেল না পাওয়া যায় এই আশঙ্কায় মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত চাহিদা বেড়েছে। ফলে পেট্রোল পাম্পগুলোতে ভিড় দেখা যাচ্ছে। সব ক্ষেত্রে প্রচারণা দরকার যে, সংকট নেই। বিষয়টা আমরা ধৈর্যের সঙ্গে দেখি।’

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা প্রফেসর ড. শামসুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘তেল পাচ্ছে না এটাই বড় কথা। আমরা সরকারের দাবি বা বক্তব্য আমরা মেনে নিচ্ছি, কিন্তু মানুষ তো তেল পাচ্ছে না। কালোবাজার সরকার প্রোটেক্ট করতে পারে এবং সরকারের মজুত সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এখানেও বিপিসি, পদ্মা অয়েল, যমুনা অয়েল— এ সব তেল কোম্পানি, পেট্রোল পাম্প সরকারের প্রশাসনের অংশ।’

আরও পড়ুন

৮ এপ্রিল শেষ হতে পারে ক্রুডের মজুত, বন্ধের হুমকিতে ইস্টার্ন রিফাইনারি
‘তেল নাই’ লেখা পাম্পে মিললো ২৮ হাজার লিটার জ্বালানি তেল
দেশে জ্বালানি সংকট নেই, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের সোর্সে নজর দিচ্ছে সরকার

তেলের কালোবাজার নিয়ন্ত্রণ, সরকারের তেল সাশ্রয়ী করা পদক্ষেপ, অভিযান চালিয়ে তেল উদ্ধারের প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর এবং অক্ষম বলে মনে করেন তিনি।

ড. শামসুল আলম বলেন, ‘এই চক্র সরকারকে জিম্মি করে ফেলেছে। তেল সরবরাহ বিপর্যয়ের যে প্রশ্নটা উঠেছে এবং জনগণ যে তেল পাচ্ছে না, সংকট মোকাবিলা করতে, কালোবাজার নিয়ন্ত্রণ করতে বা ডিস্ট্রিবিউশনে স্বচ্ছতা আনতে সরকার ফেল করছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অদক্ষতা-অযোগ্যতাই বড় ফ্যাক্টর।’

তিনি বলেন, ‘সরকার তার প্রশাসনকে যোগ্য ব্যক্তিদের দ্বারা চালাতে পারছে না। এখন পর্যন্ত বিবেচনা করতে পারছে না যে এর খেসারত সরকারকে কীভাবে দিতে হচ্ছে। তাদের অযোগ্যতাকে এখন সামনে আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই অযোগ্যতার মাশুল শুধু ভোক্তারা নয়, সরকারও দিচ্ছে।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারকে অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। আইনটা অবশ্য এত কঠোর না। শাস্তিগুলো খুবই কম কম। কিন্তু সংকটের সময়ে তো এটা অন্যরকম। একেবারে আমাদের আইনটা সংকটের জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ না।’

তিনি বলেন, ‘যারা অবৈধ মজুত করছে তাদের আইনের আওতায় এনে আরও কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে, যাতে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। কারণ, এখন আমরা একটা সংকটের মধ্যে আছি। অবৈধ মজুত এই সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটা সিরিয়াস বড় অপরাধ।’

এনএস/এএসএ